২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আত্মসমর্পণের সেই টেবিল আর ছড়ি চেয়ার


মোরসালিন মিজান ॥ এইটুকুন টেবিল। অতি সাধারণ দেখতে। এতই সাধারণ যে, ব্যবহার শেষে এটির কথা কেউ আর মনে রাখেননি। খোলা আকাশের নিচে সারারাত পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। সকালে এক সাধারণ তরুণ ভাগ্যিস কুড়িয়ে ঘরে তোলে। আর তাতেই রক্ষা। টেবিল নয় শুধু, রক্ষা পায় বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস! হ্যাঁ, এ টেবিলেই আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল নিয়াজী। বাঙালী বুঝে পেয়েছিল স্বাধীন ভূখ-। ইতিহাসের অমূল্য স্মারক এই টেবিল এখন জাতীয় জাদুঘরে। তার আগে বাঙালীর গৌরবের স্মৃতিচিহ্ন অনেকদিন সাধারণ ছাত্রের পড়ার টেবিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদ্ধারে সময় লাগে এক বছরের বেশি সময়! দীর্ঘ ৪৪ বছর পর নিশ্চিত হওয়া যায়, সেদিন রেসকোর্স ময়দানে টেবিল থাকলেও কোন চেয়ার ছিল না। বিকল্প চেয়ার হিসেবে নিয়াজী সেদিন তার ছড়ি-চেয়ার ব্যবহার করেছিলেন। বহুকাল পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব অজানা তথ্য।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে আসে ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিজয় অর্জন করে বাঙালী। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর নাক কেটে নেয়া হয়। আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী নেকড়ে সেজে আসেন পরাজয়ের দলিলে সই করতে। ততক্ষণে সেখানে এনে রাখা হয় ছোট্ট একটি টেবিল। টেবিলের এক প্রান্তে বসেন নিয়াজী, অন্য প্রান্তে জগজিৎ সিং অরোরা। ঠিক ৪টা ৩১ মিনিটে সই হয় দলিলে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যে টেবিলে রচিত হয় গৌরবগাথা সেটি ঢাকা ক্লাবের সম্পত্তি। গত ২০১১ সালে ঢাকা ক্লাবের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে একটি প্রকাশনা বের করা হয়। সেখানে টেবিলটি ক্লাবের জানিয়ে এর সাবেক সভাপতি সাদাত হোসেন সেলিম লেখেনÑ ‘টুডেস সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ওয়াজ ক্লাব প্রোপার্টি হোয়েন বঙ্গবন্ধু ডেলিভার্ড হিজ হিস্টোরিক স্পিচ দেয়ার অন মার্চ সেভেন, নাইনটিন সেভেনটিওয়ান এ্যান্ড ইট ওয়াজ দেয়ার অন এ টেবিল বরোড ফ্রম দ্য ক্লাব দ্যাট দ্য কমান্ডার অব দ্য অক্যুপেশন ফোর্সেস সাইনড দ্য ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার অন ডিসেম্বর সিক্সটিন, নাইনটিন সেভেনটিওয়ান।’ এডিটরিয়াল নোট পড়েও অভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে লেখা হয়Ñ ‘নাইন মান্থস লেটার, দ্য হিস্টোরিক সারেন্ডার অব দ্য পাকিস্তান ফোর্সেস টুক প্লেস অন দ্য গ্রাউন্ডস অব দ্য ঢাকা ক্লাব জিমখানা রেসিস। দ্য টেবিল অন হুইচ দ্য ডকুমেন্ট অব সারেন্ডার ওয়াজ সাইনড ওয়াজ ব্রট ফ্রম দ্য ক্লাব।’ ইতিহাসবিদদের মতে, আজকের শিশুপার্কের জায়গাটিতেই আয়োজন করা হয় ঐতিহাসিক দলিল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের। ঢাকা ক্লাবের খুব সন্নিকটে হওয়ায় এখান থেকেই নেয়া হয় টেবিলটি। পরদিন আত্মসমর্পণের যত খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশিত হয় সবখানেই টেবিলটি দৃশ্যমান হয়। কিন্তু পত্রিকার সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা গেলেও বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আত্মসমর্পণের একদিন পর যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল অনন্য সাধারণ এই স্মৃতিচিহ্ন।

এতবড় গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন! কোথায় হারালো? শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। জানা যায়, জাতীয় জাদুঘরের তৎকালীন পরিচালক ফিরোজ মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সংগ্রহে তখন হন্যে। টেবিলের সন্ধানে সম্ভাব্য সব জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। তবু হদিস মিলছে না। কেন? কোথায় হারিয়েছিল টেবিল? এ বিষয়ে জানতে সম্প্রতি দীর্ঘ কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জনকণ্ঠকে বিশিষ্ট এই জাদুঘরবিদ জানান, একাত্তরে তিনি ঢাকায় ছিলেন। আত্মসমর্পণের পরদিন সকালেই ছুটে যান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ওখানে গিয়ে বেশ কয়েকজন ভারতীয় সৈন্যকে দেখতে পান। তারা আত্মসমর্পণের সময় উপস্থিত ছিলেন। ড. ফিরোজ তাঁদের কাছে জানতে চান, যে টেবিলে দলিল সই হয়েছে সেটি কোথায়? তাঁরা কিছু জানাতে পারেন না। পরামর্শ দেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে খোঁজ নিতে। পরদিন এক বন্ধুসহ সেখানে গিয়ে হাজির হন তিনি। নিজের পরিচয় দিয়ে টেবিলটিসহ আরও কিছু নিদর্শন সংগ্রহের আগ্রহের কথা জানান। কিন্তু তখন তাঁর কাছে কোন পরিচয়পত্র ছিল না। এ কারণ দেখিয়ে ক্যান্টনমেন্ট কোন সহায়তা করতে রাজি হয়নি। বরং সেখানে তাঁর অবস্থান নিরাপদ নাও হতে পারে বলে জানিয়ে দেন একজন বাঙালী অফিসার। এ অবস্থায় বিফল মনোরথে ফিরে আসেন ফিরোজ মাহমুদ।

তবে ক্ষ্যান্ত দেননি। ডিসেম্বরের শেষদিকে জাদুঘরের পক্ষ থেকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন জাদুঘরে প্রদান করার আহ্বান জানান জনগণের কাছে। বেশ কিছুদিন ধরে চলে বিজ্ঞাপন। তখন জাদুঘরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র কয়েকজন। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ফিরোজ মাহমুদ নিজে সংগ্রহে নামেন। কামানের গোলা, গুলির খোসা ইত্যাদি সংগ্রহ করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। শিক্ষক ক্লাব থেকে একটি নিদর্শন সংগ্রহ করছিলেন তিনি। ঠিক তখন মহাআনন্দের খবরটি আসে। সে সময়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে চোখ কেমন জ্বল জ্বল করে ওঠে ড. ফিরাজ মাহমুদের। তিনি বলেন, জাদুঘরের এক কর্মচারী হঠাৎ বাইরে থেকে দৌড়ে শিক্ষক ক্লাবে প্রবেশ করেন। তিনি খবর দেন, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের টেবিলটির হদিস পাওয়া গেছে! পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কো-অপারেটিভ স্টোর। সেখানে আছে টেবিলটি। তথ্য পাওয়ামাত্রই দ্রুত বেরিয়ে পড়ি আমি। তারপর অপলক চোখ। স্টোরের পাশেই ছোট্ট একটি থাকার ঘর। সেখানে গিয়ে সত্যি সত্যি টেবিলটি দেখতে পাই। এর ওপর বই-পুস্তক রাখা। ছবির দেখার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় টেবিলটি! ততক্ষণে জানা হয়, কক্ষটিতে বাস করে স্টোরের সেলস এ্যাসিস্ট্যান্ট মোঃ ইসমত। ২০ কী ২১ বছরের তরুণ। কাজের পাশাপাশি কোন একটি কলেজে পড়াশোনা করে। টেবিলটি সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার সঙ্গে কথা বলি আমি। জানতে চাই টেবিলটি সে কোথায় পেয়েছে? উত্তরে চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসে।

ইসমতকে উদ্ধৃত করে ফিরোজ মাহমুদ জানান, ১৬ ডিসেম্বর বন্ধু আবদুল বারেকসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিল ইসমত। বারেক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বেয়ারা। কিন্তু বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত মানুষের ভিড় আর নিরাপত্তা বেষ্টনীর কারণে মূল অনুষ্ঠানের কাছে তারা যেতে পারেনি। আত্মসমর্পণ দলিলে নিয়াজীর সই করার দৃশ্য দেখা হয় না তাদের। কিন্তু কৌতূহল অটুট ছিল। তাই পরদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আবার সেখানে যায় দু’জন। তখন কেউ সেখানে ছিলেন না। জনশূন্য মাঠে হঠাৎ তারা খেয়াল করে অদূরেই একটি টেবিল পড়ে আছে। পরিত্যক্ত ভেবে সেটি সঙ্গে করে ঘরের দিকে রওনা দেয় ইসমত। এরপর থেকে এটি হয় তার পড়ার টেবিল!

ফিরোজ মাহমুদ বলেন, আমি প্রথমে টেবিলটার গুরুত্ব তাকে বুঝতে দিইনি। কৌশলগত কারণেই বলিনি যে, এটা ইতিহাসের অংশ। জাতির সম্পদ। বরং রাখঢাক করে বলি, আমি জাদুঘর থেকে এসেছি। এটা আসলে জাদুঘরের টেবিল। আমাদের এটা তুমি ফেরত দিয়ে দাও। সে টেবিল দিতে রাজি হয় না। বেশি পীড়াপীড়িতে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করতে পারে আশঙ্কায় সেদিন আর কথা বাড়াইনি। আমি চলে আসি।

ফিরোজ মাহমুদ জানান, টেবিল উদ্ধারের জন্য পরদিন ইসমতের কাছে দুই কর্মচারীকে পাঠান তিনি। তারা একটু চাপ দেয়ার মতো করেই বলেন, এটা জাদুঘরের টেবিল। দিয়ে দিতে হবে। আরও অনেকভাবে বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছেলেটিকে টেবিল দিতে রাজি করানো যায় না। তৃতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে ফিরোজ মাহমুদ দ্বারস্থ হন কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রমজান আলী সরদারের। গণিত শিক্ষকের সাহায্য চান তিনি। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে ইসমতকে ডেকে টেবিলটি জাদুঘরে দিয়ে দিতে বলেন ওই শিক্ষক। ইসমত তাঁর কথাও অমান্য করে। এবার সে বলে, এটা আমার পড়ার টেবিল। এটা দেয়া যাবে না। তখন তাকে আরও ভাল দেখে একটি টেবিল কিনে দেয়ার প্রস্তাব দেন ড. ফিরোজ। তাতেও রাজি হয় না ইসমত। বলে, আচ্ছা আমি ভেবে দেখি।

এ অবস্থায় জাদুঘর পরিচালক সাহায্যের জন্য যান স্টোর ম্যানেজার ফজলুল করিমের কাছে। ম্যানেজার বেশ চাপ দেন টেবিলটি দিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু চাপ যত বাড়ে টেবিলটির প্রতি ততই যেন আগ্রহী হয়ে ওঠে তার কর্মচারী। এবার সে পরীক্ষার অজুহাত দাঁড় করায়। বলে, পরীক্ষা সামনে। শেষ হলে দেব।

এভাবে প্রায় এক বছর পার হয়ে যায়। কিন্তু ফিরোজ মাহমুদ নাছোড়বান্দা। ১৯৭৩ সালের ১২ মে বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজনের ঘোষণা দেয় ঢাকা জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগৃহীত নিদর্শন দেখাতে এই আয়োজন। এতে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের টেবিলটি রাখা হবে বলে ঘোষণা দিয়ে দেন তিনি। প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। তাঁর ছবিসংবলিত হ্যান্ডবিল ছাপে জাদুঘর এবং সেই হ্যান্ডবিল ইসমতকে দেখিয়ে বলা হয়, অনেক বড় বড় মানুষজন প্রদর্শনী দেখতে আসবেন। এরা যদি এসে টেবিল দেখতে না পান তাহলে অসুবিধা হবে তোমার। সোজা পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। অনুনয়-বিনয়ে কাজ না হলেও এবার নরম হয় ছেলেটি। তাকে জানানো হয়, প্রদর্শনীর দিন সকালে টেবিল নিতে আসবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। তখন না বলা চলবে না।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে জাদুঘর পরিচালক বলেন, বিকেলে প্রদর্শনী। সকালে আমি গেলাম ইসমতের ওখানে। টেবিল দিতে রাজি হলো ইসমত। কিন্তু তার চোখ-মুখে বেদনার ছাপ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মন খারাপ তোমার? আমি তোমাকে একটা খুব সুন্দর দেখে টেবিল কিনে দিই? উত্তরে সে বলে, না। কোনকিছুর বিনিময়ে আমি টেবিলটি দেব না। আমি এমনি দিয়ে দিলাম। আশ্বস্ত হয়ে প্রথমবারের মতো টেবিলের গুরুত্ব ইসমতের কাছে ব্যাখ্যা করেন ইতিহাসবিদ। বলেন, এটা এখন আর শুধু একটি টেবিল নয়। জাতির সম্পদ। জাদুঘরে রাখা হলে সবাই দেখতে পাবে। ইতিহাসটি জানতে পারবে এবং এর সঙ্গে তোমার নামটিও জুড়ে গেল। প্রদানকারী হিসেবে তোমার নাম লেখা থাকবে সব জায়গায়। তবে এই কথার মানে ইসমত বুঝেছিল কি-না বোঝা যায়নি। এ অবস্থায় দুই কর্মচারী টেবিল মাথায় তুলে নিয়ে হাঁটা দেন জাদুঘরের দিকে। তাদের অনুসরণ করেন ড. ফিরোজ মাহমুদ। এভাবে এক বছরেরও বেশি সময় পর ১৯৭৩ সালের ১২ মে জাদুঘরে আসে ইতিহাসের অমূল্য উপাদান। ড. ফিরোজ জানান, প্রদর্শনীতে ইসমতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সে আসেনি। হয়ত সে অভিমান করেছিল। হয়ত বিসর্জনের ব্যথা তাকে পেয়ে বসেছিল।

বর্তমানে টেবিলটি প্রদর্শিত হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরের ৩৮ নম্বর গ্যালারিতে। স্বচ্ছ কাঁচের ঘর বানিয়ে তার ভেতরে রাখা হয়েছ টেবিলটি। নিচে লাল-সবুজের কার্পেট পাতা। তারপর সুন্দর সরু পায়ে ইতিহাসটি দাঁড়িয়ে! সেগুন কাঠে তৈরি টেবিলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ ফিট, উচ্চতা ৩ ফিট, প্রস্থ ২ ফিট। এর গায়ে বিশেষ কোন কারুকাজ নেই। চার কোনায় ঢেউয়ের মতো ডিজাইন করা। হালকা হলুদ রংয়ের বার্নিশ। পুরনো বার্নিশ। কোথাও কোথাও রং উঠে গেছে। আছে মোমের দাগ। বলপয়েন্টে ঘষে দু-তিনটি নামও লেখা। তারপরও সরল সৌন্দর্য আর আভিজাত্য দারুণ চোখে পড়ে। কৌতূহল নিয়ে দেখেন জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীরা।

টেবিল হলো। কিন্তু চেয়ার? সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলিল সইয়ের সময় যে চেয়ার দুটিতে নিয়াজী ও অরোরা বসেছিলেন সেই চেয়ারগুলো কোথায়? না, অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ৪৪ বছর এভাবে পার হয়েছে। আর তারপর অতি সম্প্রতি জানা যায়, চেয়ার আদতে ছিলই না সেখানে! তাহলে দুই স্বাক্ষরকারী বসেছিলেন কিসের উপর? উত্তর দেন ড. ফিরোজ মাহমুদ। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমি টেবিল খোঁজার সময়ই চেয়ারগুলো খুঁজেজি। যারা টেবিল নিয়েছিল তাদের বার বার জিজ্ঞেস করেছি চেয়ারের কথা। ওরা বলেছে, চেয়ার দেখেনি। অন্য কোথাও পাইনি চেয়ারের তথ্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা একটি পুরনো পত্রিকার কপি আমার চোখ খুলে দেয়। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত বুখেরকু জার্নালে লেখা হয়, ‘নিয়াজী, সিটেড অন এ শুটিং স্টিক বিকজ নো ওয়ান হ্যাড প্রোভাইডেড হিম উইথ এ চেয়ার, টার্নড দ্য সাইনড পেপারস ওভার টু জেনারেল অরোরা। দ্যান হি সারেন্ডারড হিজ কালারস এ্যান্ড রিভলবার।’ ফিরোজ মাহমুদ বলেন, এটা পড়ার পর আমি নিশ্চিত হই যে, নিয়াজী চেয়ারের পরিবর্তে নিজের ছড়ি-চেয়ার ব্যবহার করেছিলেন। একই ঘটনা অরোরার বেলায়ও ঘটেছিল বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা ক্লাবও শুধু টেবিল দেয়ার কথা জানিয়েছে। তারা চেয়ার দেয়ার কোন তথ্য দেয়নি। এ থেকেও বোঝা যায় রেসকোর্সে সেদিন কোন চেয়ার ছিল না।

তথ্যটি আরও নিশ্চিত হতে ছড়ি-চেয়ার সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হলে জানা যায়, বিশেষ এ ছড়ি চেয়ারের ব্যবহার আছে সেনাবাহিনীতে। এর নাম ক্যাম্প টুল। যুদ্ধকালীন বা বাইরে কোথাও গেলে জেনারেলরা এটি সঙ্গে রাখেন। ছড়ির উপরিভাগ দু’দিকে খুলে নেয়া যায়। নিচের দিকে পুরোটা দেবে না যায়Ñ এমন ব্যবস্থা থাকে। এ সুযোগ কাজে লাগান অরোরা ও নিয়াজী। তথ্যটি নিশ্চিত হওয়ার পর চেয়ার খোঁজার পালা শেষ হলো বলেই মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষকরা।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: