মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

প্রবাসীদের আয় বিনিয়োগের যথাযথ পরিকল্পনা নেই ॥ অনুৎপাদনে রেমিটেন্স

প্রকাশিত : ৬ জুলাই ২০১৫
  • ৭৮ শতাংশ অর্থ যাচ্ছে জমি কেনায় খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্য কেনায় ব্যয় হয় ৩৯ শতাংশ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণে টাকা পাঠাচ্ছেন দেশে। তাদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে অর্জিত রেমিটেন্স দেশের সার্বিক উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখতে পারছে- এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব টাকা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। যেটুকু বিনিয়োগ হচ্ছে সেটিও অনুৎপাদনশীল খাতে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে অন্য কথা। সংস্থাটির মতে, দেশের অর্থনৈতিক অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে রেমিটেন্স। অন্যদিকে প্রবাসী আয়ের ব্যবহার খুঁজে বের করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এ প্রেক্ষিতে আগামী পাঁচ বছরে প্রবাসী আয় সঠিক বিনিয়োগে আনতে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বে নিয়োজিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সিনিয়র সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ প্রকৃত খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনে প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এই পরিকল্পনায়। তিনি বলেন, প্রবাস আয়ের প্রবাহ বা এর ব্যবহারের ওপর এ যাবত কোন উল্লেখযোগ্য নীতিনির্ধারনী কাঠামো প্রণীত হয়নি। কিন্তু প্রবাস আয় ব্যবহারের সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যই পারে উদ্ভাবনশীল বিশ্ব পরিবেশে প্রবাস আয়ের সর্বোচ্চ প্রবাহ নিশ্চিত এবং দেশে এর ব্যবহারকে ফলপ্রসূ নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে সহায়তা করতে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবাস আয় দেশের অর্থনীতিতে নানাভাবে অবদান রাখছে। সংস্থাটি এর আগে প্রবাস আয়কে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম দুটো চালিকাশক্তির মধ্যে একটি হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে, প্রবাস আয় ভবিষ্যতেও অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, প্রবাসী আয় দিয়ে যদি জমি কেনা হয়, তাহলে সেটিও তো বিনিয়োগ। কেননা ওই জমি তো আর দেশের বাইরে যায় না। আবার যার কাছ থেকে জমি কেনা হয় তিনি ওই টাকা দিয়ে কী করেন সেটি আমরা জানি না। সুতরাং তিনি যদি ভোগ করেন তাহলেও তো দেশেই থাকে। প্রবাসী আয় যদি ভোগ-বিলাসেও ব্যয় হয় তাহলেও দেশে চাহিদা তৈরি হয়, ফলে উৎপাদন বাড়ে আর উৎপাদন বাড়লে জিডিপিতে অবদান যোগ হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রবাসীরা যে আয় করেন তার একটি অংশ বিদেশেই থাকা ও খাওয়ার জন্য ব্যয় করেন। একটি অংশ দেশে বাবা-মা ও পরিবারের জন্য পাঠান, অন্য একটি অংশ তাঁরা বিদেশেই সঞ্চয় করেন। সরকারের উচিত হবে ওই অংশটি যাতে প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করেন সেজন্য বন্ড ইস্যু করাসহ নানাভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় (রেমিটেন্স) প্রথমবারের মতো দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। সদ্যসমাপ্ত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে এক হাজার ৫৩০ কোটি ডলারের বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। স্বাধীনতার ৪২ বছরে এটাই বছরে প্রবাসীদের পাঠানো সর্বোচ্চ রেমিটেন্স। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোন অর্থবছরে এত পরিমাণ রেমিটেন্স আসেনি। গত তিন অর্থবছরেই ১৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে অবস্থান করে প্রবাসীদের আয়। জনশক্তি রফতানি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ায় এর প্রবাহ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিটেন্স বিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের শেষ দিন ৩০ জুন পর্যন্ত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৩০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। কিন্তু এ অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে বা অর্থনীতিতে যে পরিমাণ অবদান রাখার কথা তা রাখতে পারছে কি-না। এসব ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের অধিকাংশই বিনিয়োগ হচ্ছে জমি ক্রয়ে। এই আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলো এক বছরে (২০১৩ সালে) বিভিন্ন খাতে যে পরিমাণ গৃহে ব্যবহার্য টেকসই জিনিসপত্র এবং এ জাতীয় উপাদান ক্রয়ে ব্যয় করে তার মধ্যে ৭৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ টাকা জমি ক্রয়ে ব্যবহার হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে এ হার আরও বেশি। রবিশাল, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে জমি ক্রয়ে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ টাকা ব্যয় করা হয়। তবে চট্টগ্রাম বিভাগের সর্বনি¤œ ৫৬ দশমিক ০৫ এবং এর পরেই রয়েছে সিলেট বিভাগে ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ টাকা জমি ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রবাস আয় বিষয়ক জরিপ-২০১৩ এর ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগে গড় প্রবাস আয় সর্বোচ্চ। গত এক বছরে (২০১২ সালে) পরিবারভিত্তিক প্রবাস আয়ের গড় পরিমাণ ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ হয়েছে দুই লাখ ১৯ হাজার ৭৪০ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম বিভাগ দুই লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ টাকা। অন্যদিকে সর্বনিম্ন গড় প্রবাস আয় রাজশাহী বিভাগে এক লাখ ৬৭ হাজার ৭০০ টাকা। প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা জনপ্রিয়। মোট প্রবাস আয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ দশমিক ৩২ শতাংশ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। এরপর হুন্ডির মাধমে আসে ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে দেশে আসছে ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যদ্রব্য ও খাদ্যদ্রব্য ছাড়া অন্য সামগ্রীতে প্রায় সমান হারে প্রবাস আয় ব্যবহার হচ্ছে। পরিবারগুলো গত এক বছরে ব্যয় করেছে পরিবারগুলোর মোট প্রবাসী আয়ের ৩৯ শতাংশ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবাসী আয়প্রাপ্ত পরিবারগুলোর অবস্থা অন্য পরিবারগুলোর চেয়ে ভাল। প্রবাস আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলো ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি পান করে, ৮২ শতাংশ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করে। সাধারণ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৭৯ এবং ৬২ শতাংশ। বলা হয়েছে, বিদেশে কর্মরতদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতর সংখ্যা খুবই কম। মোট প্রবাসীদের মধ্যে ৬২ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত। ২ দশমিক ৪১ শতাংশ এমবিবিএস কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীধারী বলা হয়েছে। কিন্তু প্রবাস আয়ের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত ও পর্যাপ্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে (প্রতিবেদনকালীন) প্রায় ৮৬ লাখ বাংলাদেশী বিদেশে কর্মরত আছেন। দেশের মোট শ্রমশক্তিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় অতিরিক্ত দুই লাখ যুবশক্তি যোগ হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত এই দুই লাখ জনশক্তির সকলের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশে সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লোক বিদেশে যাচ্ছেন এবং এ ধারা অদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সিনিয়র সদস্য ড. শামসুল আলম জানান, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকারের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্য প্রতিফলিত হবে, আর তা অর্জনের জন্য বিকল্প কী কী কৌশল অনুসরণ করা হবে তা উল্লেখ থাকবে। এতে লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী ধরনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, সরকারী ব্যয়, সরকারী-বেসরকারী খাতের ভূমিকা, প্রবাসী আয়কে কিভাবে কাজে লাগানো যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো প্রয়োজন হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও থাকবে।

প্রকাশিত : ৬ জুলাই ২০১৫

০৬/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: