২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বর্ষা এলে কদর বাড়ে- জীবিকার উৎস


বর্ষা এলে কদর বাড়ে- জীবিকার উৎস

খোকন আহম্মেদ হীরা ॥ বর্ষা মৌসুম। এ সময় নৌকা দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে চলাচলের অন্যতম প্রধান বাহন হয়ে দাঁড়ায়। পণ্য পরিবহনেও এর জুড়ি নেই। আর নদীতে মাছ শিকারের কথা বলতে গেলে তো প্রথমেই আসবে নৌকার নাম। নৌকায় জাল, চাঁই (মাছ ধরার ফাঁদ) অথবা বড়শি নিয়ে মৎস্য শিকারে ছুটে চলেন জেলেরা। বর্ষা এলেই দক্ষিণ অঞ্চলে জমে ওঠে নৌকা ও চাঁইয়ের হাট। বর্ষা মৌসুমে চাঁই ও নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী। নৌকার জন্য বিখ্যাত বরিশালের স্বরূপকাঠী উপজেলা। বরিশাল ও ঝালকাঠীর বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগঞ্জেও তৈরি করা হয় নৌকা। জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্বরূপকাঠীর আটঘর, কুড়িয়ানা, ইন্দেরহাট, আগৈলঝাড়ার সাহেবেরহাট ও গৌরনদী মাহিলাড়ায় বসে নৌকার হাট। এসব উপজেলায় বিভিন্ন প্রজাতির শাকসবজি ও তরিতরকারিসহ পেয়ারা এবং লেবুর ব্যাপক ফলন হয়। এসব কৃষিপণ্য বাজারে আনার জন্য নদী পার হতে নৌকার বিকল্প নেই। কুরিয়ানা বাজারে প্রতিদিন গড়ে ৫ শতাধিক নৌকা বিক্রি হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই বিভিন্ন স্থানে চলছে নৌকা বানানোর ধুম। আগৈলঝাড়ার বারপাইকা, দুশুমি, রামানন্দেরআঁক, স্বরূপকাঠী, বানারীপাড়া উপজেলার ইন্দেরহাট, ইলুহার, আতাকোঠালী ও বৈঠাকাটা গ্রামের বহু পরিবার নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। স্বরূপকাঠী থেকে কাঠ এনে নৌকা তৈরি করে তারা। চাম্বল কাঠ দিয়ে ডিঙ্গি ও ছোট আকারের পিনিশ নৌকা তৈরি করে। আর রেইনট্রি কাঠ দিয়ে তৈরি হয় তুলনামূলক কমদামী নৌকা। হরবিলাশ ঘরামী নামে এক নৌকা বিক্রেতা জানান, বর্ষার সময় চলাচলের জন্য কমদামী নৌকা বেশি বিক্রি হয়।

অপরদিকে মাছ ধরার চাঁই তৈরির জন্য বিখ্যাত আগৈলঝাড়ার মোহনকাঠী গ্রাম। প্রায় দু’শ’ বছর ধরে এ গ্রামে চাঁই তৈরি হয়ে আসছে। বংশ পরম্পরায় গ্রামটির অন্তত চার শ’ পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে চাঁই তৈরি করে। পুরুষরা বর্ষা মৌসুমের ছয় মাস চাঁই তৈরি ও শুকনো মৌসুমে দিনমজুরের কাজ করেন। মোহনকাঠী গ্রামের তৈরি করা চাঁই বিক্রি হয় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে। গ্রামটির নাম মোহনকাঠী হলেও চাঁই তৈরি করতে গিয়ে গ্রামের নাম হয়েছে ‘আগৈলঝাড়ার চাঁই পল্লী। নানাবিধ সমস্যার মধ্যে বংশ পরম্পরায় এ গ্রামের বাসিন্দারা চাঁই তৈরির পেশাকে ধরে রেখেছে। চাঁই তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ, বেত ও লতার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অর্থাভাবে মহাজন ও বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাঁই বানাচ্ছে। গ্রামের প্রতি ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি চাঁই তৈরির কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করে থাকেন। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পরিবারের সকলের ব্যস্ততা বাড়ে।

হরলাল বৈদ্য, নলিনী বৈরাগীসহ অনেকেই জানান, দু’শ’ টাকার তল্লা বাঁশ ও কৈয়া লতা দিয়ে একেকজন শ্রমিক পাঁচ দিনে এককুড়ি চাঁই তৈরি করতে পারেন। মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নেয়ার ফলে তাদের কাছে প্রতি কুড়ি চাঁই পাইকারি হিসেবে বিক্রি করতে হয় ১২শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা। কিন্তু বাজারে এর দাম দুই হাজার থেকে ২৫শ’ টাকা। এ গ্রামের তৈরি চাঁই স্থানীয় মাহিলাড়া, পয়সারহাট, সাহেবেরহাট, ধামুরাসহ বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠী, ভোলা, ঘাঘর, শশীকর, নবগ্রাম, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়।