নাহিদ
ঢাকায় পা রেখেই মিরপুরের পিচ দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন পাকিস্তান কোচ মাইক হেসন। বলেছিলেন,‘বাংলাদেশকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে আগের দুই সফরে হারের বদলা নিতে প্রস্তুত ছেলেরা’। এই ছেলেরা? প্রশ্নটা উঠতেই পারে। বুধবার প্রথম ওয়ানডেতে তারা একাদশ সাজায় চার অভিষিক্ত ক্রিকেটার নিয়ে। কিউই মাস্টার মাইন্ডের অহঙ্কারের দাঁতভাঙ্গা জবাবই দিয়েছে টাইগাররা। যেখানে নেতৃত্বে থাকলেন নাহিদ রানা। ডানহাতি এ স্পিডস্টারের আগুন বোলিংয়ে ৩০.৪ ওভারে ১১৪ রানে অলআউট পাকিস্তান! বাংলাদেশের বিপক্ষে যা তাদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বনি¤œ।
৭ ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে নাহিদের ৫ উইকেট পাকিদের বিপক্ষে দেশের জার্সিতে কোনো বোলারের সেরা বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড। ৮ উইকেটের দাপুটে জয়ে অবধারিত ম্যাচসেরা নাহিদ। পরে তানজিদ হাসান তামিমের (৪২ বলে অপরাতি ৬৭) আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ১৫.১ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় টাইগাররা। তিন ওয়ানডের সিরিজে এগিয়ে ১-০ ব্যবধানে। দ্বিতীয় ম্যাচ শুক্রবার।
৫/২৪Ñ পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই বাংাদেশের সেরা বোলিং। আগের সেরা ছিল মুস্তাফিজুর রহমানের ৫/৭৫, ২০১৯ সালে, লর্ডসে। ১১৪/১০ ওয়ানডেতে এটাই বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের সবচেয়ে কম রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ড। এর আগে নর্দাম্পটনে ১৯৯৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে ১৬১ রানে অলআউট করেছিল টাইগাররা। তিন মাস পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর প্রায় পাঁচ মাস পর ওয়ানডে খেলতে নেমে এদিন টস জিতে ফিল্ডিং নেন অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ। পাকিস্তানের অনভিজ্ঞ এই ব্যাটিং লাইন আপে সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন মোহাম্মাদ রিজওয়ান। তার জন্যই সেরা ডেলিভারিটি জমা রাখেন নাহিদ।
গতিময় আউট সুইঙ্গার ছুঁয়ে যায় রিজওয়ানের ব্যাটের কানা, উইকেটের পেছনে ভালো ক্যাচ নেন লিটন। ১০০ ওয়ানডে খেলা পাকিস্তানের সময়ের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষ-ব্যাটারের কাছে যেন সেটির কোনো জবাবই ছিল না। পরের ওভারে আবার শর্ট বলে সালমান আলি আগাকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন তিনি ৫ উইকেট। টানা ছয় ওভারে ছয় উইকেটও হতে পারত তার। ম্যাচে তার সবচেয়ে গতিময় ডেলিভারিটি (১৪৮.৬) ছোবল দেয় ফাহিম আশরাফের প্যাডে। আম্পায়ার আউট দেননি, বাংলাদেশ রিভিউ নেয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়, আউট ছিলেন ফাহিম। প্রথম ৯ ওভারে রান ছিল ৩৫, উইকেট পড়েনি একটিও। সুযোগও সেভাবে তৈরি হয়নি। পরের ১০ ওভার শেষে পাকিস্তানের রান ৭০। কিন্তু ততক্ষণে নেই ৬ উইকেট।
গতিই নাহিদের আসল অস্ত্র। ঘরোয়া ক্রিকেটের পথ পাড়ি দিয়ে টেস্টে দলে তিনি নিয়মিত মুখ। ওয়ানডে আর টি২০ পা রেখেছেন আগেই। কিন্তু থিতু হতে পারেননি। সেই তিনি সাদা বলের ক্রিকেটেও জাত চেনালেন। আগের ৫ ওয়ানডেতে তাঁর উইকেট ছিল পাঁচটি, সর্বোচ্চ ২ উইকেট পেয়েছিলেন অভিষেক ওয়ানডেতে। এবার এক ম্যাচেই নিলেন ৫ উইকেট, সেটিও আবার নিজের প্রথম পাঁচ ওভারের প্রতি ওভারে একটি করে! নাহিদ পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের চমকে দিয়েছেন বাউন্সারে, কখনো তারা বিধ্বস্ত হয়েছেন শুধু তার গতিতে, কখনো আবার পা দিয়েছেন নাহিদের পাতা ফাঁদে।
তাতে পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডার তো ধসে গেছেই, নাহিদ দিলেন একটা বার্তাও। সাদা বলের ক্রিকেটেও এখন থেকে নিয়মিতই তাঁর কথা ভাবতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট। ব্যাটিং লাইন আপে চার অভিষিক্তকে নিয়ে একাদশ সাজায় পাকিস্তান। তাদের দুজন সাহিবজাদা ফারহান ও মাজ সাদাকাত স্থিতধী শুরু এনে দেন দলকে। প্রথম ৯ ওভারে উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এরপর নাহিদের হাতে বল তুলে দেন মিরাজ। ওভারের চতুর্থ বলে আলগা ডেলিভারিতে চার হজম করেন তিনি। ওভারের শেষ বলে ধরা দেয় উইকেট। সেই বলও মারার মতোই ছিল। কিন্তু গতির কারণেই পয়েন্টে ধরা পড়েন সাহিবজাদা (৩৮ বলে ২৭)। সেই শুরু।
আরেক অভিষিক্ত শামিল হোসেন উইকেট হারান গতি সামলাতে না পেরেই। শুরু থেকে সাবলিল থাকা সাদাকাত (১৮) বিদায় নেন শর্ট বলের তোপে। টানা সাত ওভার বোলিং করে বিশ্রামে যান নাহিদ। এরপর আর বোলিং পাননি। ততক্ষণে অভিষিক্ত আব্দুল সামাদকে শূন্য রানে ফেরান মিরাজ। পরে হুসাইন তালাত ও শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফেরান তিনি এক ওভারেই। পাকিস্তানের নবম উইকেটের পতন হয় ৮২ রানে। শেষ জুটিতে লড়াই করে ৩২ রান যোগ করেন ফাহিম আশরাফ, সেখানে আবরার আহমেদের অবদান ১০ বলে শূন্য। ৩৭ রান করা ফাহিমকে ফিরিয়েই পাকিস্তানের ইনিংস শেষ করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন রান এই ১১৪।
আগের সর্বনিম্ন ছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেই স্মরণীয় ম্যাচে ১৬১। রান তাড়ায় সাইফ হাসান (৪) দ্রুত আউট হলেও তানজিদ হাসানের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের রান কাড়তে থাকে তরতরিয়ে। তিনে নেমে দারুণ সঙ্গ দেন নাজমুল হোসেন শান্তও। ৩২ বলে ফিফটি করা শান্ত শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫ ছক্কায় ৪২ বলে ৬৭ রান করে। জয়ের কাছে গিয়ে আউট হন শান্ত (৩৩ বলে ২৭)। লিটন কুমার দাসকে নিয়ে কাজ শেষ করেন তানজিদ। ২০৯ বল রেখে জয় পায় বাংলাদেশ। এর চেয়ে বেশি বল বাকি রেখে জয় আছে তাদের স্রেফ দুটি- ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২২১ বল রেখে জয়, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৯ বল আগেই জয়।
প্যানেল হু








