অমর একুশে বইমেলায় বুধবার আসা উল্লেখযোগ্য চারটি বইয়ের মোড়ক
সময়ের স্রোতধারায় অমর একুশে বইমেলায় বেড়েছে পাঠক সমাগম। আর সেসব গ্রন্থানুরাগীর মন রাঙাতে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সহ¯্রাধিক নতুন বই। সেই সুবাদে প্রকাশিত হয়েছে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনী, ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, গবেষণাধর্মীসহ বিচিত্র ধারার বই। মেলা প্রাঙ্গণের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলে শোভা পাচ্ছে বিবিধবিষয়ক বই। সেখান থেকে আপন মননের উপযোগী বই সংগ্রহ করছেন বইমেপ্রীরা। তবে বিক্রির বিবেচনায় সবকিছুকে ছাপিয়ে বরাবরের মতোই পাঠকের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে উপন্যাস।
যাপিত জীবনচিত্র থেকে রোমান্স, রহস্যময় কাহিনী কিংবা থ্রিলার, গোয়েন্দা থেকে ইতিহাস ও রাজনীতিনির্ভর বয়ানে রচিত উপন্যাসে সেজেছে মেলার গ্রন্থসম্ভার। শুধু কি তাই! পৌরাণিক কাহিনীনির্ভর বয়ানের সমান্তরালে সমাজ ও জীবনের অপ্রকাশিত অধ্যায়ও উঠে এসেছে কোনো কোনো উপন্যাসে। সেই সুবাদে বুধবার প্রাণের মেলার ১৪তম দিনে প্রকাশিত হয়েছে ১৯১টি উপন্যাস।
ঘটোৎকচ শিরোনামের পৌরাণিক কাহিনীনির্ভর উপন্যাসে ভর করে পাঠককে কাছে টানছেন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস। মহাভারতের উপেক্ষিত এক চরিত্র পা-বদের প্রথম সন্তান ঘটোৎকচকে ঘিরে আবর্তিত কাহিনীর উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। উপন্যাস কেন পাঠকের চাহিদার শীর্ষে থাকেÑএ প্রশ্নের জবাবে পাঠকপ্রিয় এই কথাশিল্পী জনকণ্ঠকে বলেন, মানুষ যখন আদিম যুগে যাযাবর জীবন যাপন করত তখন থেকেই গল্প শুনতে পছন্দ করত। সেই যাযাবর জীবনে মানুষ যখন কোথাও থিতু হয়ে বসত বা স্থানান্তরিত হতো তখন তারা কবিতার বদলে গল্প শুনতে পছন্দ করত।
গল্পের ভেতর লুকিয়ে থাকা সুখ-দুঃখসহ চলতি জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাদের আলোড়িত করত। সেই বাস্তবতায় উপন্যাসের গহিনে মিশে থাকে বিস্তৃত গল্পের প্রেক্ষাপট কিংবা রাজনীতি, সমাজ বাস্তবতা ও জীবনের রংমাখা গল্পে বোনা বিশাল ক্যানভাস। একসময় রাজা-বাদশাদের নিয়ে গল্প লেখা হতো। পরবর্তীতে সেই ধারাটা বদলে গিয়ে সাধারণের যাপিত জীবনচিত্র উঠে এসেছে উপন্যাসের ভাঁজে ভাঁজে। সেই ধারায় একসময় পরিবর্তিত হয়ে উপন্যাস আশ্রিত গল্পে উঠে এসেছে রাজনীতি, পুরাণ, থ্রিলারসহ বিবিধ বিষয়।
মূলত বিস্তৃত পরিসরে গল্প শোনার প্রতি অনুরাগ থেকেই পাঠকদের চাহিদার শীর্ষে থাকে উপন্যাস। তবে বুধবার পর্যন্ত মেলায় প্রকাশিত ১৯২টি উপন্যাসের মধ্যে অধিকাংশই পাঠককে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে । অন্তর্গত বিষয়, ভাষার উপস্থাপনা, লেখনীর আঙ্গিক মিলিয়ে পাঠককে কাছে টানছে বেশ কিছু উপন্যাস। পাঠকসমাদৃত তেমনই কিছু উপন্যাসের তথ্য মেলে ধরা হলো এ লেখায়।
কবি প্রকাশনী থেকে এসেছে মোস্তাক আহমদের উপন্যাস ‘স¤্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’। এরশাদের স্বৈরশাসন আমলে সুবিধাভোগী কয়েকজন কবি এবং তৎকালীন অস্থির সময়ের আখ্যান উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। প্রকাশনা সংস্থা অন্বেষা থেকে প্রকাশিত মোস্তাক শরীফের লেখা ‘সুলতান’ শিরোনামের ঐতিহাসিক উপন্যাসটি ভালো চলছে। স্পেনের শেষ মুসলিম শাসক বোয়াবাদিলের জীবন ও শাসনকাল আবর্তিত হয়েছে এ উপন্যাসের কাহিনী। আদর্শ থেকে প্রকাশিত মুরাদ কিবরিয়ার লেখা ‘ক্যাফে রেভল্যুশন’ উপন্যাসটি দৃষ্টি কেড়েছে পাঠকের। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংঘাতময় ঘটনা নিয়ে ওয়াসি আহমেদ রচিত ‘কার্পাস মহল’ কাছে টানছে উপন্যাসটি পাঠককে। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। একই প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে বুড়িগঙ্গার তীরে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনাবহুল অধ্যায় নিয়ে মাজহার সরকার রচিত উপন্যাস ‘আতঙ্কের গোলাপ’।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত কিংকর আহসানের ‘মেঘডুবি’ উপন্যাসটি চলছে ভালো । পাঠকের সাড়া পেয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের লেখক উপল মুখোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘ঔরঙ্গজেব আলমগীরৎ। প্রথমা থেকে প্রকাশিত মাসউদ আহমদ রচিত ‘লাবণ্যর মুখ’ শিরোনামের উপন্যাসটিরও রয়েছে পাঠক চাহিদা। একই প্রকাশনী থেকে এসেছে হাসনাত আবদুল হাই রচিত গুরুত্বপূর্ণ আরেক উপন্যাস ‘শেকস্পিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি’। সময় প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে দীপু মাহমুদের উপন্যাস ‘ব্রেকআপ’। একই প্রকাশিনী থেকে আসা মোস্তফা কামালের ‘বিষাদ বসুধা’ দ্বিতীয় খ- এবং পার্থ প্রতিম দে রচিত ‘তিলকণিকা’ উপন্যাস দুটি নিয়েও রয়েছে পাঠকের আগ্রহ।
অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘মুখোশ পরা মানুষ’। এ বইটিও ভালো চলছে। অনন্যা থেকে প্রকাশিত মহিউদ্দিন আহমদের লেখা রাজনীতিনির্ভর ‘শেখ মুজিবের লাল ঘোড়া’ উপন্যাসটিও কাছে টানছে উপন্যাসপ্রেমীদের। একই প্রকাশনী থেকে বের হওয়া মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘তোমার আমার রিসার্চ সেন্টার’ উপন্যাসটির প্রতিও রয়েছে বইপোকাদের বিশেষ আগ্রহ। চন্দ্রছাপ থেকে প্রকাশিত সেলিনা জুসির লেখা ‘অন্তরে অনুভবে’ উপন্যাসটিও সাদরে গ্রহণ করেছেন বইপ্রেমীরা। অন্যধারা প্রকাশনী এনেছে সময়ের তুমুল জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠী’।
এদিনের নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী এদিন প্রকাশিত হয়েছে ১১৩টি নতুন বই।
মেলামঞ্চের আয়োজন ॥ এদিন বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : এম শমসের আলী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। সভাপতিত্ব করেন আরশাদ মোমেন।
বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ড. শমশের আলী ছিলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও শিক্ষাজগতে একজন নক্ষত্র। তিনি গবেষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁর গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তির মাধ্যমে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষত পারমাণবিক ভৌতবিজ্ঞানে তাঁর মৌলিক গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিম-লেও সমাদৃত হয়েছিল। বিশ্বের স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালসমূহে তাঁর অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের গ-ি পেরিয়ে এশিয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন বিজ্ঞান একাডেমি ও সংস্থার সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অধ্যাপক শমশের আলী শুধুই গবেষক ও প্রশাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞান-চিন্তাবিদ। তাঁর আগ্রহের বৃহৎ ক্ষেত্রজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের মাঝে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলা। একজন শিক্ষক, প্রশাসক ও বিজ্ঞানসংগ্রামী হিসেবে তিনি যেভাবে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন, তাতে বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার ভিত মজবুত হয়েছে।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি হাসান হাফিজ, কবি শাহীন রেজা এবং কবি মাসুদুল হক।
বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন কামাল মিনা, এ বি এম সোহেল রশিদ, শায়লা আহমেদ। সংগীত পরিবেশন করেন সাইদুর রহমান বয়াতি, অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, জি এম জাকির হোসেন, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ শাহীনুর ইসলাম, বাউল সুভাষ বিশ^াস, মিন্টু বাউল, নিশাত আনজুম সাকি ও এস এম শামীম আক্তার।
আজকের মেলা : আজ বৃহস্পতিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায়। চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : মুস্তাফা জামান আব্বাসী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শারমিনী আব্বাসী। আলোচনায় অংশ নেবেন আশরাফুজ্জামান বাবু। সভাপতিত্ব করবেন ওয়াকিল আহমদ। বিকেল চারটায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্যানেল হু








