ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

ইতিহাসের পাতায় শান্ত

শাকিল আহমেদ মিরাজ

প্রকাশিত: ০০:৫৬, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

ইতিহাসের পাতায় শান্ত

শান্ত

নাজমুল হোসেন শান্তর ক্ষেত্রেও কিন্তু একই জিনিস (লিটনের মতো ট্রল) হয়েছে। বিশ্বকাপে দেখেন (২০২২ টি২০), শান্ত কিন্তু প্রায় দুই শ রান করে এসেছে। পরে আবার স্ট্রাগল করেছে, এখন আবার রান করছে। ওকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে। ও লম্বা রেসের ঘোড়া, আমার বিশ্বাস অনেক দূর যাবে।’ গত বিপিএলে সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে সর্বোচ্চ ৫১৬ রান করা প্রিয় সতীর্থ নিয়ে বলছিলেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। নাজমুল হোসেন শান্তকে আসলেই অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে।

সাবেক কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর প্রিয় ছাত্র, নির্বাচকদের চোখের মণি, লর্ড, এমনি সব শব্দবানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলের শিকার হতে হয়েছে। টি২০র আগ্রাসন, ইন্টেন্ট, ও এপ্রোচ কিছুই ছিল না বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। তবে সেসবে কান না দিয়ে ধারাবাহিক রান করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন বাঁহাতি এ ব্যাটার। সিলেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গড়েছেন নতুন এক ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নেতৃত্বের অভিষেকেই হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ চারে খেলেছেন ১০৫ রানের মনোমুদ্ধকর এক ইনিংস। শান্তর ইতিহাস গড়ার ম্যাচে ঘরের মাঠে কিউইদের বিপক্ষে টাইগাররাও পেয়েছে স্মরণীয় এক জয়। 
টেস্ট ইতিহাসে ৩৫১ জন অধিনায়ক সেঞ্চুরি করেছেন। সবমিলিয়ে তারা সেঞ্চুরি করেছেন ৬৯৯টি। কিন্তু নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচেই মাত্র ৩২ জন তিন অঙ্কের দেখা পেয়েছেন। শান্ত তাদেরই একজন। টাইগার ক্রিকেটে প্রথম। আগের ১২ জন টেস্ট অধিনায়ক নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে শতক হাঁকাতে পারেননি। টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচে আগের সর্বোচ্চ ছিল সাকিব আল হাসানের ৯৬, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে, ২০০৯ সালে, গ্রানাডায়। টেস্টে নিজের শেষ ৪ ইনিংসের তিনটিতেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন শান্ত। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ যে টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ গত জুনে, সেই ম্যাচের উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন ২৫ বছর বয়সী বাঁহাতি এ টপঅর্ডার ব্যাটার।

২৪ টেস্টের ক্যারিয়ারে মাত্র ৪৬ ইনিংসে এটি তার পঞ্চম সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটার টেস্টে এত কম ইনিংস খেলে ৫টি সেঞ্চুরি করতে পারেননি। সাকিব ৬৬ টেস্টে ও মাহমুদুল্লাহ ৫০ টেস্টে করেছেন ৫ সেঞ্চুরি। শান্তর খুব কাছেই আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল, তিনি ৬১ টেস্টে করেছেন ৬ সেঞ্চুরি। শান্ত হয়তো তাকেও পেছনে ফেলবেন অচিরেই। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার ছিলেন উইলিয়াম মারডক। ১৮৮০ সালে কেনিংটন ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এ অস্ট্রেলিয়ান দ্বিতীয় ইনিংসে করেন অপরাজিত ১৫৩ রান।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজে সাকিবের অনুপস্থিতিতে টেস্টে নেতৃত্ব দেন লিটন। কিন্তু তিনি মোটেই রাজি ছিলেন না। অনেকটা জোর করেই অধিনায়ক করা হয়েছিল। শান্ত সেখানে ব্যতিক্রম। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে এক ম্যাচে (ওয়ানডে) নেতৃত্ব দেন, বিশ্বকাপে সাকিবের অনুপস্থিতে দুই ম্যাচে। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জানিয়েছেন, প্রয়োজনে সব ফরম্যাটে অধিনায়ক হতে প্রস্তুত। একজন পারফর্মার যখন নিজে থেকে নেতৃত্বের জন্য আগ্রহ দেখান তখন সেটা দলের জন্যেই ভালো। ওয়ানডেতেও অধিনায়কত্বের অভিষেক ম্যাচে রেকর্ড করেছিলেন শান্ত।

সেটিও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সাদা বলের খেলায় বাংলাদেশীদের মধ্যে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক ম্যাচে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। মিরপুরে গত ২৬ সেপ্টেম্বর কিউইদের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে ৭৬ রান করেছিলেন। ভেঙে দিয়েছিলেন আমিনুল ইসলামের রেকর্ড। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক ওয়ানডেতে ৭০ রানের ইনিংস  খেলেছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
বিশ্বকাপের চরম ব্যর্থতার পর দেশের ক্রিকেটে যে অস্থিরতা ছিল, তাতে এই টেস্ট সিরিজে দল মুখ থুবড়ে পড়লেও খুব বিস্ময়কর কিছু হতো না। কিন্তু সিলেট টেস্টে গোটা দল ছিল বেশ উজ্জীবিত।

লড়িয়ে মানসিকতার প্রতিফলন পড়েছে তাদের পারফর্মেন্সে। দলট ছিল এককাট্টা। মাঠে সবাই বেশ সম্পৃক্ত। এই যে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও দলটা এ রকম লড়িয়ে পারফর্মেন্স ও শরীরী ভাষা মেলে ধরে, সেই কৃতিত্ব তো অধিনায়ককে দিতেই হয়। এমনিতে এই টেস্ট বা সিরিজ থেকে অধিনায়ক হিসেবে শান্তর হারানোর কিছু ছিল না। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তিনি, তরুণ একজন। দলের বা দেশের সাম্প্রতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। এই অবস্থায় যদি দল ভালো না করত বা অধিনায়ক হিসেবে তিনি ছাপ রাখতে না পারতেন, তাহলে তাকে দায় দেওয়া বা কাঠগড়ায় তোলার মতো কোনো ব্যাপার হয়তো হতো না। তবে হারানোর না থাকলেও তার পাওয়ার ছিল অনেক কিছু। তার জন্য এটা এ রকম ছিল নিজের নেতৃত্বগুণ মেলে ধরার মঞ্চ। পরবর্তী অধিনায়ক হিসেবে তার পোশাকি মহড়াও।

সেই মহড়াতেই শান্ত এতটাই অসাধারণ পারফর্ম করলেন যে, এখন মূল দায়িত্ব পাওয়াটা কেবলই মনে হচ্ছে সময়ের ব্যাপার! যতটুকু প্রাপ্তির ছিল, পেলেন তিনি সবটুকুই। টস ভাগ্যকে পাশে পেয়ে টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তার পথচলা শুরু। তবে প্রথম দিনটি ব্যাট হাতে তার ভালো কাটেনি। তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে বেশ আগ্রাসী ব্যাটিং করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ফুল টস বলে দৃষ্টিকটু এক শটে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন ব্যক্তিগত ৩৬ রানে। তবে মুগ্ধতা ছড়ানোর শুরু দ্বিতীয় দিন থেকে, যখন তার নেতৃত্বের অন-ফিল্ড পরীক্ষার শুরু। 
বোলিং পরিবর্তনগুলোয় ছিলেন বেশ নিখুঁত। দ্বিতীয় দিনে অধিনায়কের চারটি বোলিং পরিবর্তনে প্রথম ওভারেই ধরা দেয় উইকেট। পার্ট টাইম স্পিনার মুমিনুল হককেও যেভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন, তা ছিল দোখার মতো। দ্বিতীয় দিনে মুমিনুলের প্রথম ওভারেই গ্লেন ফিলিপসের বিদায়ে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জুটি ভেঙেছেন। পরদিন কাইল জেমিসন ও টিম সাউদির জুটি এক ঘণ্টা কাটিয়ে দেন নির্বিঘেœ। পানি পানের বিরতির পরই শান্ত আক্রমণে আনেন মুমিনুলকে। এবার তার প্রথম ওভারেই আসে দুটি উইকেট! মুমিনুল দিনের খেলা শেষে জানান, বাইরে থেকে পাওয়া নির্দেশনায় নয়, শান্তর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তেই পরিবর্তনগুলো হয়েছে।

ফিল্ডিং সাজানোতেও শান্ত বেশির ভাগ সময় ছিলেন আগ্রাসী। দেখা যায় কিছু নতুনত্বও। দুই ইনিংসেই উদ্ভাবনী বেশ কিছু দিক চোখে পড়েছে তার মাঠ সাজানোয়। বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে নাঈম হাসানের বলে কেন উইলয়ামসন যেখানে ক্যাচ দিয়েছিলেন তাইজুল ইসলামকে এবং শেষ দিকে নাঈমের বলেই যেখানে তাইজুলের হাতে ধরা পড়েন ড্যারিল মিচেল, দুটিই একটু অপ্রথাগত পজিশন। যার অর্থ, পরিষ্কার পরিকল্পনা ছিল শান্তর ছিল। সব মিলিয়ে মাঠে ছিলেন দারুণ তৎপর ও সক্রিয়।

×