ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের জয় ১৫০ রানে

তাইজুলের বিধ্বংসী বোলিংয়ে উড়ে গেল কিউইরা

মো. মামুন রশীদ

প্রকাশিত: ২২:৫০, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

তাইজুলের বিধ্বংসী বোলিংয়ে উড়ে গেল কিউইরা

সিলেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা

নিজেদের মাঠে অবিস্মরণীয় কিছু জয় আছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের টেস্টে হারিয়েছে পয়মন্ত ভেন্যু মিরপুরে। জয় আছে চট্টগ্রামেও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় আসেনি ঘরের মাঠে। অবশেষে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ সিলেটে এসে কাক্সিক্ষত জয়টা পেয়েছে টাইগাররা। 
যদিও ২০১৮ সালে এখানে একমাত্র টেস্ট খেলে দুর্বলতর জিম্বাবুয়ের কাছে ১৫১ রানের হার দেখে স্বাগতিকরা। সেই ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়েও দলকে জেতাতে পারেননি বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। একই ভেন্যুতে ৫ বছর পর শক্তিধর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশের পক্ষে ঝলকিত পারফর্ম্যান্সটা দেখালেন তিনিই। তার ১০ উইকেট শিকারের সুবাদে কিউইদের ১৫০ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শুভ সূচনা করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় এসেছে চরম টার্নিং ও অসমান বাউন্সের উইকেটে।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তেমনটা ছিল না। এরপরও ব্যতিক্রম তাইজুল ঠিকই ঘূর্ণি ছোবলে দুই ইনিংসে ৪ ও ৬ উইকেট নিয়েছেন। ১৮১ রানেই গুটিয়ে গেছে কিউইদের দ্বিতীয় ইনিংস। ঘরের মাটিতে প্রথমবার টেস্টে কিউইদের হারানোর নায়ক তাইজুল হয়েছেন ম্যাচসেরা। গত বছর মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। তারপর থেকেই দলটির আত্মবিশ^াস বেড়েছে টেস্টে ভালো কিছু করার। কারণ নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জেতা উপমহাদেশের যে কোনো দলের জন্য দুরুহ ব্যাপার এবং বিরল ঘটনা। সেখানে টেস্ট ক্রিকেটে এখনো নিয়মিতভাবে খাবি থেকে থাকা টাইগাররা তাদের হারানোর পর আত্মশক্তি বেড়েছে ক্রিকেটারদের।

তাই নিউজিল্যান্ডের মতো টেস্ট পরাশক্তিকে এবার ঘরের মাঠে পেয়ে জয়ের প্রত্যয় সবার মধ্যেই। ক্রিকেটাররা চেয়েছেন সম্প্রতি এশিয়া কাপ ও বিশ^কাপে দলের ভরাডুবির পর টেস্ট জিতে বেদনাটা ভুলতে। সেটি বাস্তব করার জন্য সিলেটে টেস্ট শুরুর প্রথম দিন থেকেই যেন ভঙ্গুর দলে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ব্যাট হাতে এবং পরে বল হাতে তাইজুল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন পূর্ণ শক্তির নিউজিল্যান্ডকে। টেস্টের প্রতিটা দিনই বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণে থেকেছে এই টেস্টের।

চতুর্থ দিনশেষে তাইজুলের ঘূর্ণিতে বিপর্যস্ত নিউজিল্যান্ড ৩৩২ রানের টার্গেটে ৭ উইকেটে ১১৩ রানে পরাজয়ের প্রহর গুনতে থাকে। ততক্ষণে তাইজুল ৪টি উইকেট শিকার করেছেন। প্রথম ইনিংসেও কিউই ব্যাটারদের মূল হন্তারক তাইজুল ৩৯ ওভারে ৯ মেডেন দিয়ে ১০৯ রানে ৪ উইকেট নেন। তাই মাত্র ৭ রানের লিড নিতে পেরেছে কিউইরা। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে তারই ঘূর্ণিতে আবার বেসামাল হয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের শঙ্কায় ডুবেছে সফরকারী দল।

এই ম্যাচে স্পিনাররা সহায়তা পাবেন সেটি অনেকটাই জানা ছিল উভয় দলের। তাই কিউইরা ২ পেসার এবং স্বীকৃত দুই স্পিনার ইশ সোধি ও এজাজ প্যাটেলকে নিয়ে সাজিয়েছে একাদশ। বাংলাদেশ শুধু একজন পেসার ও ৩ জন জেনুইন স্পিনার নিয়ে একাদশ গড়ে। প্রথম ইনিংসে কিউইদের অনিয়মিত স্পিনার গ্লেন ফিলিপস ৪টি ও বাংলাদেশের মুমিনুল হক ৩টি উইকেট নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট নেন আরে ইনিংসে ২ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি স্পিনার এজচাজ। লেগস্পিনার সোধি ১ ও ২ উইকেট নিতে পেরেছেন। দুই ইনিংসে বাংলাদেশের দুই অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ ১টি করে এবং নাঈম হাসান প্রথম ইনিংসে ১টি ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২টি উইকেট নেন। অর্থাৎ স্পিনাররা যে সিলেটে ভয়ানক কিছু করেছেন সেটিও নয়।

ব্যাটারদের জন্য যথেষ্ট সুবিধা ছিল বলেই এই প্রথম নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উভয় ইনিংসে ৩ শতাধিক রান করতে পেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ব্যতিক্রম তাইজুল ঠিকই ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছেন। পঞ্চম দিনে অবশ্য ড্যারিল মিচেল দারুণভাবে শুরু করেন। তাকে তাইজুলের দুর্দান্ত ক্যাচেই সাজঘরে ফিরতে হয় নাঈমের বলে। ফলে ৩০ রানের জুটি ভাঙে। এরপর সোধি ও টিম সাউদি প্রতিরোধ গড়েন এবং ৪৬ রানের জুটি গড়েন। লাঞ্চ বিরতির কাছাকাছি গিয়ে জোড়া আঘাত হেনেছেন তাইজুল। সাউদি ২৪ বলে ১ চার, ২ ছক্কায় ৩৪ ও সোধি ৯১ বলে ২ চারে ২২ রানে সাজঘরে ফেরেন। ৩১.১ ওভারে ৮ মেডেনে ৭৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন তাইজুল। ১৮১ রানে থামে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস। ম্যাচে তাইজুলের বোলিং ৭০.১-১৭-১৮৪-১০। 
ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ১০ উইকেট নিয়েছেন তিনি ৪৩তম টেস্টে। বাংলাদেশের পক্ষে আর দুইজন- সাকিব আল হাসান ৬৬ টেস্টে ও মিরাজ ৪০ টেস্টে ২ বার ১০ উইকেট নিয়েছেন। ১২ বার ইনিংসে ৫ ও ১২ বার ৪ উইকেট নিয়েছেন তাইজুল। সাকিব ১৯ বার ৫টি ও ১০ বার ৪টি এবং মিরাজ ৯ বার ৫টি ও ৬ বার ৪ উইকেট নিতে পেরেছেন। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার ৯ বছর পর আবার ম্যাচসেরা হয়েছেন তাইজুল। তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘দেশের হয়ে কিছু করতে পারাটা সন্তুষ্টির। ১০ উইকেট নিতে পেরে আমার মনোবল বেড়েছে। জয় পাওয়া নিশ্চিতভাবেই দলের আত্মবিশ^াস বাড়িয়ে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যাবে।’

×