ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

মোঃ মামুন রশীদ

পেসার গড়ার নতুন কারিগর ওয়ালশ

প্রকাশিত: ০৬:৩০, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

পেসার গড়ার নতুন কারিগর ওয়ালশ

যখন দলে এসেছিলেন পেয়েছিলেন কিংবদন্তি সব ভয়ঙ্কর পেসারদের। ম্যালকম মার্শাল, জোয়েল গার্নার ও মাইকেল হোল্ডিংরা তখন বিশ্ব ক্রিকেট কাঁপিয়ে চলেছেন। তবে তারা সবাই ছিলেন সিনিয়র ক্রিকেটার। যখন কার্টলি এ্যামব্রোসকে পেলেন যেন সবচেয়ে পরম বন্ধুকেই পেয়ে গেলেন কোর্টনি ওয়ালশ। কারণ দীর্ঘকায় এ পেসার ছিলেন ওয়ালশের জন্য অনুপ্রেরণা। দুজনের জুটিটাও বেশ ভালভাবেই মিলেছিল। পরবর্তীতে ওয়ালস-এ্যামব্রোস জুটি হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম ভয়ানক পেস জুটি। সেই এ্যামব্রোসকে খুঁজতে এবার বাংলাদেশে এসেছেন ৫৩ বছর বয়সী সাবেক এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। তিন বছর কাজ করার চুক্তি। তবে পেশাগত দিক থেকে কোচ পদবি থাকলেও ওয়ালশ চান ক্রিকেটারদের বন্ধু হতে এবং নিজেকে পরামর্শক হিসেবে বাবার মতো আচরণই দেখাতে চান তিনি। এর চেয়ে বড় কথা তিনি বাংলাদেশ দল থেকে বের করে আনতে চান এ্যামব্রোসের মতো কোন পেসারকে। উদ্দেশ্য, নিজের মতো করেও কাউকে গড়ার। কারণ তিনি চান তার পরামর্শে বাংলাদেশ ক্রিকেট আরও উন্নত অবস্থানে নিয়ে যেতে এবং র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি ঘটাতে। তবে শর্ত একটাই- ক্রিকেটারদের অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম, ফিটনেসের পরিচর্যা করে সেটা ঠিক রাখা, কাজে আত্মনিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে সবচেয়ে মনোযোগী হতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ থেকে এ্যামব্রোস-ওয়ালশ জুটি পাওয়া সম্ভব হবে। কোচের দায়িত্ব এটাই প্রথম। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সবসময়ই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে কারণে সারাবিশ্বেই ক্রিকেটারদের পেছনে ছুটেছেন সবসময়। একইসঙ্গে যাদের সম্ভব হয়েছে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু মাঠে কার্যকর ভূমিকায় থাকতে চেয়েছিলেন ওয়ালশ। চেয়েছিলেন তার নিজের মতো করে এ যুগের কোন পেসারকে গড়ে তুলতে। সেই স্বপ্নটা এবার বাংলাদেশের দায়িত্ব পেয়ে পূর্ণ হয়েছে। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ১৭ বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন ওয়ালশ। ১৯৮৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছেন তিনি। ২২ টেস্টে দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। সবমিলিয়ে ১৩২ টেস্ট খেলেছেন ২৪.৪৪ গড়ে শিকার করেন ৫১৯ উইকেট। তিনিই বিশ্বের প্রথম বোলার যিনি ৫০০ উইকেটের মালিক হন (ওয়ানডে বা টেস্ট)। ২০০০ সালে কপিল দেবের সর্বাধিক টেস্ট উইকেট শিকারের রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়ে সর্বকালের সেরা হয়ে যান তিনি। এই উইকেটগুলোর অধিকাংশই তিনি এ্যামব্রোসের সঙ্গে জুটি গড়ে কয়েক বছরে শিকার করেছেন। এ্যামব্রোস-ওয়ালশ জুটি ৪২১ উইকেট শিকার করেছে মাত্র ৪৯ টেস্টে। তবে পরবর্তীতে ওয়ালশের রেকর্ড ভেঙ্গে দেন অস্ট্রেলিয়ান লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন। তাঁকেও ছাড়িয়ে যান শ্রীলঙ্কার অফস্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন। আর ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০৫ ম্যাচ খেলে ২২৭ উইকেট শিকার করেছেন ৩০.৪৭ গড়ে। ওয়ালশের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ইকোনমি। দারুণ কিপটে বোলার ছিলেন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন ২.৫৩ এবং ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৩.৮৩ ইকোনমি রেট নিয়ে। আর সে কারণেই তিনি মূলত মনোযোগ দিচ্ছেন বাংলাদেশী পেসারদের বেসিক বিষয়গুলোর ওপর। সঠিক লেন্থ, স্পট বোলিং, বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের জন্য ইয়র্কার এবং ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য সঠিক লেন্থ এমন বিষয়গুলো তিনি প্রথম দিনেই দেখে নিয়েছেন বাংলাদেশী পেসারদের সঙ্গে কাজে নেমে। শনিবার রাতে বাংলাদেশে আসার পর সোমবার সকাল থেকেই নেমে পড়েন ওয়ালশ। এ সময় তিনি সবার সঙ্গে পরিচিতি পর্বটা সেরেছেন। কে কোন ধরনের বোলার এবং কেমন বোলিং করেন সেটা পর্যবেক্ষণ করেছেন। রান আপ, বল গ্রিপ করা, বল ফেলার ধরন, ফুটস্টেপ ইত্যাদি খুব মনোযোগ দিয়ে পরখ করেছেন। তেমন পরামর্শই দেননি কাউকে। কিন্তু পরবর্তীতে কাজটা ব্যাপক হারেই শুরু হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি একজন এ্যামব্রোস বের করতে চান এবং নিজের মতো একজনকে তৈরি করতে চান। যদিও বাংলাদেশের পেসারদের অনেকেই বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভাল করছেন। তাদের ভালভাবেই চেনা আছে ওয়ালশের। কিন্তু সেসব নাম তিনি আগেভাগেই বলতেও নারাজ ছিলেন। এসব নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যদি দ্বিতীয় কোন এ্যামব্রোস পাই বাংলাদেশ থেকে আমি খুবই খুশি হব। তিনি আসার পর দুজন মিলে আমরা বিশ্বসেরা স্ট্রাইকিং জুটি গড়ে তুলেছিলাম। আমি যদি এ বিষয়টা বাংলাদেশের দুজন ফাস্ট বোলারের মধ্যে আনতে পারি আমি খুবই সন্তুষ্ট হব। আমি কাউকে নাম দিয়ে চিনতে চাই না। মাঝে মাঝে আমি অনেকের নাম নিয়েছি এবং দেখা গেছে সে টানা দুই/তিন ম্যাচে কোন নৈপুণ্যই দেখাতে পারেনি। আমি বাংলাদেশের কিছু তরুণ ফাস্ট বোলারদের নিয়ে বেশ উত্তেজিত। তারা অনেক উন্নতি করেছে এবং আমি যদি তাদের আরও কিছুটা সহায়তা করতে পারি সেটাই হবে চাবিকাঠি।’ যে কোন সাফল্য পাওয়ার জন্য দরকার প্রচেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি এবং সেইসঙ্গে কঠোর পরিশ্রম। আর সেদিকেই বেশি মনোযোগ ওয়ালশের। আর উপমহাদেশে অনেক ভাল পেসার তৈরি হলেও পরবর্তীতে হারিয়ে যায়। সেটা কি কারণে হয় ওই ব্যাপারটির দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেবেন তিনি। এ বিষয়ে ওয়ালশ বলেছেন, ‘অনেক ভাল মানের বোলার আছে। কিন্তু দেখতে হবে তাদের কিভাবে পরিচর্যা করা হয় এবং কতদিন স্থায়ী হয়। আমি আসলে সেজন্যই এখানে এসেছি। সবাইকে বলা হবে কাজের চাপগুলোর সঙ্গে মানিয়ে ওঠার জন্য ঠিকভাবে পরিচর্যা চালিয়ে যেতে এবং একইসঙ্গে ফর্মেও থাকতে হবে। আমি খুবই মনোযোগী ফিটনেসের পর্যায়টা সঠিক অবস্থায় রাখার ব্যাপারে। এটা শুধু কঠোর পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ এবং সবসময় সেরাটা চাওয়ার মাধ্যমেই আসতে পারে। আমি ধারাবাহিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের জন্যই ক্ষুধার্ত থাকব।’ কিন্তু এই কাজগুলো একজন কোচ হিসেবে করতে চান না। ওয়ালশ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি বন্ধু হতে এসেছেন। আর আন্তর্জাতিক কোন দলের হয়ে কাজ করার যে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল সেটা পূরণ হয়েছে। প্রধান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহের সঙ্গে মিলে কাজ করে বাংলাদেশ দলকে আরও উঁচুপর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। এ কারণে বাবার মতো পরামর্শক হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিজের জানা বিষয়গুলো জানিয়ে সহায়তা দিতে চান তিনি। এ বিষয়ে ওয়ালশ বলেন, ‘আমি আমার জানার বিষয়গুলো তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জেনে আমি বের করার চেষ্টায় থাকব যে তারা কিভাবে নিজেদের খেলার উন্নতি ঘটাতে চায়। আমি নিজেকে খুব বেশি পরিমাণে কোচ হিসেবে দেখতে চাই না, আমি নিজেকে একজন বিজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে দেখতে চাই। আমি তাদের সঙ্গে কোচ হিসেবে কাজ করব এবং অবশ্যই একজন বাবার মতো পরামর্শক হিসেবে।’ ওয়ালশ তার মিশন শুরু করে দিয়েছেন। তবে এই একদিনের কাজ শেষেই এখন প্রায় দুই সপ্তাহের ছুটিতে যাবেন তিনি। এরপরও শুরু হবে ওয়ালশের কাজ। প্রথমদিনেই বন্ধুপ্রতিম ওয়ালশের কাজে মুগ্ধ হয়েছেন দেশের পেসাররা। ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্বের চুক্তিতে বাংলাদেশকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারেন এ ক্যারিবিয়ান পেসার তা সময়ই বলে দেবে।