ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী

খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন শীঘ্রই ॥ ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:২৯, ২৬ জুন ২০২৪

খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন শীঘ্রই ॥ ফখরুল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

প্রধানমন্ত্রীর কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন করা হলেও সরকার খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য শীঘ্রই আবার আন্দোলন শুরু করবে বিএনপি।
ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দেশটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতাসমূহ দেশের স্বার্থ বিরোধী। তাই এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে বিএনপি। তিনি বলেন, সম্প্রতি শেখ হাসিনার ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে ২টি চুক্তি, ৫টি নতুন সমঝোতা ও ৩টি চুক্তি নবায়নসহ ১০টি চুক্তি-সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ায় সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সম্পাদিত চুক্তিগুলোতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। চুক্তিগুলো বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী হওয়ায় বিএনপি এই চুক্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করছে।  
ফখরুল বলেন, আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিএনপির সৃষ্টি হয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে। বিএনপি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে আমরা ২৮ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করব। এরপর আমরা প্রয়োজন হলে যে কর্মসূচি নেব সেটা জানানো হবে। তবে এ আন্দোলন ভারতের বিরুদ্ধে নয়, সরকারের বিরুদ্ধে। 
ফখরুল বলেন, হৃৎপি-ে পেস মেকার বসানোর পরে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থ্ াস্থিতিশীল। সোমবারই তাঁকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। তবে ওই কেবিনে ‘সিসিইউ’র ফ্যাসিলিটিজগুলো আছে। তিনি বলেন, এ সরকারের মূল লক্ষ্য খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া। সে কারণেই তাঁকে মামলায় সাজা দিয়েছে, কিন্তু এ মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রথমে তাঁর সাজার মেয়াদ ছিল কম। পরে  হাইকোর্টে সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। 
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, এটা বেআইনি ও সংবিধান বিরোধী। সরকার তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করা হয় একইসঙ্গে তাঁর মুক্তির আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়া ২ বছর একটা পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে ছিলেন। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারবার চেষ্টা করার পরও সেখানে ভালো চিকিৎসক পাঠানো হয়নি। বহু চেষ্টার পর যখন তাঁকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো সেখানেও তিনি সুষ্ঠু চিকিৎসা পাননি। এরপর তাঁকে গুলশানের বাসা ফিরোজায় নিয়ে আসা হলো, সেটাও আবার শর্তসাপেক্ষে। শর্ত ছিল, তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না এবং দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে। গুলশানের বাসায় আসার পর তাঁর ধরা পড়ল লিভার সিরোসিস, এটা ছোটখাটো রোগ নয়, ‘মেজর ডিজিজ’। তখন ডাক্তাররা আমাদেরকে বলেছিলেন যে, লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন ছাড়া তার কোনো পথ নেই। আর এটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সুচিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে আমরা কম চেষ্টা করিনি। আমরা এখন পর্যন্ত যেটুকু করেছি সেটুকু তার পরিবার এবং দলের চেষ্টাতেই হয়েছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের নিয়ে এসেছি। তারা যে চিকিৎসা করেছেন সেই চিকিৎসায় তিনি এখন পর্যন্ত টিকে আছেন। এটা কোনো সমাধান নয়। একমাত্র সমাধান হচ্ছে তার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা। তার যে অনেকগুলো অসুখ আছে, সেই অসুখের জন্য তাকে এমন চিকিৎসা সেন্টারে পাঠাতে হবে যেখানে তার সঠিক চিকিৎসা হবে। অন্যান্য অসুখ কনট্রোল করে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে।

এজন্যই আমরা বারবার বলছি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কারণে খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। শেষে যখন আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছে সেটা প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাখ্যান করেছেন। শুধু তাই নয়, আমরা বিভিন্ন মিশনের কাছেও চিঠি দিয়েছিলাম। তারা বারবার চেষ্টা করেছেন। একপর্যায়ে তারা বলেছেন যে, সরি। 
মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা। ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে আগে তাঁকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হলো এবং কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর থেকে তিনি যাতে মুক্তি না পান, সে চেষ্টা চলছে এখন পর্যন্ত।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, আমাদের কথা পরিষ্কার, আমাদের আন্দোলন ভারতের বিরুদ্ধে নয়, এটা সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ, সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে ভারতকে রিচ করতে বা তাদের কাছ থেকে দাবিগুলো আদায় করে নিয়ে আসতে। সরকার অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা না পেয়ে চুক্তি সই করতে চাচ্ছে। তিস্তার পানি আমাদের সবচেয়ে আগে দরকার কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের কাজ করতে চায় সরকার। কারণ, প্রকল্প হলে অনেক টাকা। সেই টাকাই সরকারের আসল উদ্দেশ্য।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, পত্রিকায় দেখলাম, পরিষ্কার করেই মমতা ব্যানার্জি বলে দিয়েছেন যে, পশ্চিমবাংলাকে বাদ দিয়ে তিস্তা প্রকল্প করা যাবে না, তারা করতে দেবে না। এজন্য তো অবশ্যই চাপ প্রয়োগ করা দরকার। ফারাক্কা তো একদিনে হয়নি, যতটুকু পাওয়া গেছে সেটা আন্দোলন করেই পাওয়া গেছে। ফারাক্কার ইস্যুটি দেশে-বিদেশে-জাতিসংঘে তোলা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে (অভিন্ন নদী-তিস্তার পানির হিস্যা) জাতিসংঘে উত্থাপন করেনি। আমরা অভিন্ন নদীর পানি পাচ্ছি না।

এটাতে সমগ্র দেশের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে তাদের জীবন-জীবিকা থেকে। তাদের সবকিছু নির্ভর করে এসব নদীর ওপর। কোটি কোটি মানুষ পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-তিস্তা এসব নদীর অববাহিকায় বাস করে। তাদের মাছ ধরা, পানি আনা সবকিছু নির্ভর করে এই নদীগুলোর ওপর। সেখানে এসব নদীর হিস্যার ব্যাপারে কোনো কথাই নাই। এটা থেকে বোঝা যায়, আসলে এই সরকার দেশপ্রেমিক সরকার নয়, দেশবিরোধী একটা সরকার।
ফখরুল বলেন, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, সীমান্ত হত্যা, কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ভারতের রেল যোগাযোগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগের সমঝোতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতা, ওষুধ সংক্রান্ত সমঝোতা, বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতের অবাধ চলাচল এবং ভারতের ইনস্পেস ও বাংলাদেশের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা, সমুদ্র বিষয়ক গবেষণায় দুই দেশের সমঝোতাগুলোতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়েছে। ভারতকে সকলপ্রকার সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ আদায় করতে শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটা ম্যান্ডেট বিহীন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির বহির্প্রকাশ। এই সরকার পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার থেকে আমরা সরে যাইনি। আমরা কোনো আন্দোলন থেকে সরে যাইনি। বিএনপি গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে যে আন্দোলন করেছে, এই আন্দোলনগুলোকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে কয়েকশ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, এই আন্দোলনে ২২ থেকে ২৩ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, ৬০ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, ২৭ হাজার লোককে দুইদিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  এই সরকারের নিবর্তনমূলক, নির্যাতনমূলক নীতির কারণেই হয়তোবা আন্দোলনে সাফল্য আসেনি এখন পর্যন্ত।

কিন্তু কোনোদিনই ন্যায়ের পথে আন্দোলন ব্যর্থ হয় না, আমাদের আন্দোলনে অবশ্যই সাফল্য আসবে। আমরা কখনো ওই আন্দোলন থেকে সরে যাইনি।
ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়া হচ্ছেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তাকে মুক্ত করার অর্থ প্রাথমিকভাবে গণতন্ত্র মুক্ত করার মতোই। নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন থেকে আমরা সরে যাইনি, এটা বাস্তবতা। ‘সি ইজ সিম্বল অব ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ তাই গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে আলাদা করে দেখা যাবে না।

×