ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদ্ধতিগত উন্নয়ন

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২১:৪১, ১৪ জুন ২০২৪

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদ্ধতিগত উন্নয়ন

.

নতুন সরকারে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আবুল হাসান মাহমুদ আলী সম্প্রতি বাজেট ঘোষণাপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত প্রশ্নে কিছুটা জেরবার হয়ে কখনো বিরক্ত, কখনো কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন এমন সংবাদ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর সময়ের দুয়েকটি ছবি দেখলে যে-কেউই বুঝবে, অভিব্যক্তিতে অহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পররাষ্ট্র ক্যাডার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৪-১৮) হওয়া হাস্যোজ্জ্বল মানুষটিকে সামনাসামনি দেখে কথা বলে কখনোই অধৈর্য্য-অসহিষ্ণু মনে হয়নি। তার ওপর তিনি দীর্ঘ সময় কূটনীতিকের জীবন কাটিয়েছেন। নিজে একজন অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে মনে হয়েছে, আমাদের ধীরস্থির অর্থমন্ত্রী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ, রিজার্ভ সংকট এবং সামগ্রিকভাবে চাপে থাকা সামষ্টিক অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়ে নিজেও কিছুটা চাপে পড়ে গেছেন। তাঁর এই চাপে পড়াটা স্বাভাবিক, সাংবাদিকদের অবুঝ প্রশ্নে কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়। অর্থনীতি শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করা অর্থমন্ত্রী অতীতের অর্থমন্ত্রীদের চেয়ে অর্থনীতি নিশ্চয়ই একটু বেশিই ভালো জানেন। মূল্যস্ফীতি কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েও বাঘা হিসাববিদ বিগত অর্থমন্ত্রী আর বাঘা বাঘা আমলা গভর্নররা যখন কিছু করতে পারলেন না, তখন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন অর্থনীতির শিক্ষক কূটনীতিককে। তাকে একটু সময় না দিয়েই মূল্যস্ফীতির কমানোর জন্য চাপাচাপি করা বিরক্তি উদ্রেককারী তো বটেই। সে যাই হোক, মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না তা নিয়ে অর্থনীতি শাস্ত্রের মানুষ হওয়ায় কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ কারণে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি লক্ষণীয়ভাবে কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সময় মূল্যস্ফীতির হার শতাংশের ঘরেই ওঠানামা করেছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছেমে মাসে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আবার দুই অঙ্কের ঘরে আরও ওপরের দিকে উঠে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ হয়েছে, যা এপ্রিলে ছিল ১০ দশমিক ২২ শতাংশ।

চার মাস পর গত এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের ঘরে ওঠে; পরের মাসে তা আরও বাড়ল।   অন্যদিকে মে মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারও কিছুটা বেড়ে দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে, যা এপ্রিলে ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। ধনী-গরিবনির্বিশেষে সবার ওপর মূল্যস্ফীতি এক ধরনের বাধ্যতামূলক কর, যা গরিব মধ্যবিত্তদের  জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা দুই বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় এবং শহরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে তল্পিতল্পাসহ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন, সাথে করে মূল্যস্ফীতির প্রভাবও নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে, গ্রামাঞ্চলেও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও লাভ হয়নি বরং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নতুন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি ব্যাংকের  খেলাপি ঋণের সমস্যার কথা শুনতে শুনতে একটু যদি বিরক্ত হয়েই পড়েন, তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। অর্থমন্ত্রী মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে অনেকে বলছেন, আগের অর্থমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি। দীর্ঘ সময়েও নৗতিনির্ধরাকদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন না ঘটার কারণ কী, তা বুঝতে কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতি বলতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়। যেমন ধরুন, ১টি কলমের দাম ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ছিল টাকা, যার দাম ২০২৪ সালের জানুয়ারি হয়েছে টাকা। এক্ষেত্রে বলা যায়, বছরে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে সব জিনিসের দাম তো একই হারে বাড়ে না।  সে কারণে বিভিন্ন জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির তথ্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে গড় করে মূল্যস্ফীতি বের করা হয়। মূল্যস্ফীতি সাধারণত খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এই দুইভাবে ভাগ করা হয়। কয়েকভাবে মূল্যস্ফীতি বের করা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মূল্য কী ছিল আর ২০২৪ সলের জানুয়ারি কী মূল্য আছে, এই দুইয়ের শতকরা ব্যবধান। আরেকটি হচ্ছে, একবছরে জিনিসপত্রের গড় মূল্য আর পরের বছরের ১২ মাসে গড় মূল্যের তুলনা করেও মূল্যস্ফীতি বের করা। বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার বাইরেও বাংলাদেশে যেভাবে মূল্যস্ফীতি ঘটে, তা কেন হয় এবং কীভাবে হয়, এবং এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে কীভাবে অর্থনীতিকে রক্ষা করা যায়, সে নিয়ে রয়েছে নানামুখী বক্তব্য। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, বাস্তবতা এত জটিল যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা তৎসংশ্লিষ্ট কেউ ভালো করে জানেনই না যে কী কারণে মূল্যস্ফীতি হয়। সাধারণ মূল্যস্ফীতি ব্যাখ্যা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি তত্ত্ব ব্যবহার করে। প্রথমত, অর্থের তারল্য তত্ত্ব এবং দ্বিতীয়ত, ফিলিপস কার্ভ। অর্থের তারল্য তত্ত্বের ভাষায়, মূল্যস্ফীতি হলো অর্থ সরবরাহের অত্যধিক বৃদ্ধির ফলাফল। বেশি অর্থ যখন সীমিত পণ্য এবং সেবার জন্য বরাদ্দ করা হয়, তখন পণ্য সেবার দাম বেড়ে যায়। আলোকে বর্তমান উচ্চমূল্যস্ফীতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য করোনাকালীন সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতিকে দায়ী করা যায়। মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলোফিলিপস রেখা’, যার অর্থ মোটামুটি রকমÑএকটা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সেবার চাহিদা যখন অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখনই ঘটে মূল্যস্ফীতি। কিন্তু বাংলাদেশে এই দুই তত্ত্বের বাইরে মূল্যস্ফীতি ঘটে, যা বিশ্বের আর কোথাও তেমন একটা দেখা যায় না।

বাংলাদেশের মূলধারার অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, অর্থনীতিতে যখন মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, কিন্তু পণ্য বা সেবার পরিমাণ একই থাকেÑতখনই মূল্যস্ফীতি ঘটে; অর্থাৎ বেশি টাকা দিয়ে কম পণ্য বা সেবা কিনতে হয়। তাদের দৃষ্টিতে মুদ্রাস্ফীতির কারণেই মূল্যস্ফীতি হয়, ইংরেজিতে যাকে বলে ইনফ্লেশন।

তাদের মতে, আগের বছর বা মাসের সঙ্গে অথবা কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের সঙ্গে বর্তমানের দাম তুলনা করে খাদ্য, কাপড়, পোশাক, বাড়ি, সেবা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানের মূল্য বৃদ্ধির যে পার্থক্য যাচাই করা হয়, সেটাই মূল্যস্ফীতি। আবার কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন, মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি ছাড়াও চাহিদা-জোগান সংকটপরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক ঘাটতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্ব পণ্যবাজারে অস্থিতিশীলতা, বিদেশী মুদ্রা বা রিজার্ভ সংকট ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও  মূল্যস্ফীতি ঘটে থাকে। বাংলাদেশের  নীতিনির্ধারকরা দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যে যে নানামুখী উত্তেজনা চলছে, সেসবকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া এবং মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার পর বৈশ্বিক বিষয়াবলির ওপর মূল্যস্ফীতির দায় চাপানো থেকে কিছুটা সরে আসেন। বিশ্বের অন্যতম  সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের অর্থনীতির অধ্যাপক রিচার্ড উলফ, যাকে টাইম ম্যাগাজিন আমেরিকার সর্বকালের ইতিহাসে কাল মার্ক্সের শ্রেষ্ঠ বিশ্লেষক হিসাবে মনোনীত করা হয়; তিনি এবং যারা মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক কারণকে মূল্যস্ফীতির কারণ মনে করেন, তাদের এক কথায়আহাম্মকঅভিহিত করে বলেছেন, ‘নিয়োগদাতা মালিকপক্ষ চান বলেই মূল্যস্ফীতি ঘটে। এখানে অন্য কোনো লুকোছাপা নেই, রহস্য নেই, অন্য কোনো কারণ নেই।তাঁর মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মোট জাতীয় সম্পদের সিংহভাগের মালিক - শতাংশ মানুষের ইচ্ছাতেই মূল্যস্ফীতি ঘটে। পারিপার্শ্বিক অনুষঙ্গকে এরা অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করে। এর কারণ, সর্বাবস্থায় মুনাফা করা এবং তা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলাই পুঁজিবাদী নিয়োগকর্তা-মালিকপক্ষের ধর্ম। এখানে ধর্মের বাণী, ফাঁসির রশি, স্বর্গ-নরক প্রাপ্তির প্রলোভন-ভয় কোনো কিছুই কাজে আসে না।

অধ্যাপক রিচার্ড উলফ মূল্যস্ফীতি বিষয়ক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যেসব যুক্তি দিয়েছেন, সেসব একেবারে অকাট্য। কিন্তু পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার সেসব যুক্তি করপোরেট শাসিত কোনো মিডিয়ায় প্রচারিত হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন, এনবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ কোনো গণমাধ্যমে রিচার্ড উলফের সাক্ষাৎকার অথবা মন্তব্য প্রকাশ করা মোটামুটি নিষিদ্ধ। রিচার্ড উলফের মতে, পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক কোনো সভায় প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মীকে নেওয়া হয় না। কারণ, মূল্যবৃদ্ধি কর্মীর বেতনের ওপর প্রভাব ফেলে, তার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রতিবছর খুব কম হলেও কর্মীর বেতন বৃদ্ধি পায়, মালিক পক্ষ বেতন বৃদ্ধির টাকা মূল্য বৃদ্ধি করে পুষিয়ে নেয়। আবার পণ্য সেবার উৎপাদন পর্যায়ে কোনো কোনো সময় মালিকপক্ষের খরচ বেড়ে যায়। বেড়ে যাওয়া এই অর্থ উদ্ধারে মালিকপক্ষ যুদ্ধ-বিগ্রহ-অস্থিরতা-সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যাকে উছিলা হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি বৈশ্বিক বিষয়াবলিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন মূল্যস্ফীতির হার শতাংশের ঘরে, তখন চীন, জাপানসহ অন্য অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি কীভাবে - শতাংশ থাকে। তিনি বলেন, মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনেস্ট্রেশনের (এমবিএ) পাঠ্যসূচিতে এমন কিছু বিষয় আছে, যেখানে শেখানো হয় পণ্য বা সেবার বিনিময়ে মুনাফা কীভাবে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে নেওয়া যায়।

এক্ষেত্রে সরবরাহকারী পরিবর্তন করা, নিয়মিত বিরতিতে কর্মী ছাঁটাই করে কম বেতনে নতুন কর্মী নিয়োগ করা, কনস্ট্রাক্টিভ ডিসমিসাল (কর্মীর কাজের ক্ষেত্র এমন জটিল করা, যাতে করে কর্মী নিজেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়) প্রভৃতি উল্লেখ করা যায়। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও মালিকপক্ষ একই উপায় অবলম্বন করে, প্রয়োগবিধিটা কিছুটা পরিবর্তন করে। অধ্যাপক রিচার্ড উলফের যুক্তিসমূহকে যারা বাতিল করে দেবেন, তাদের জেনে রাখা ভালো যে, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অর্থনীতি শাস্ত্রে অধ্যাপনা করা ইহুদি এই অধ্যাপক ফিলিস্তিনে গণহত্যা বর্বরতায় জাতিভাইদের নৃশংস ভূমিকার ঘোরবিরোধী। নিজেকে ইহুদি বলে পরিচয় দিতেও তিনি লজ্জিত বোধ করেন। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ কোনো অবস্থাতেই তার মুনাফায় ছাড় দেবেন না। পুঁজিবাদী ব্যবসা-বাণিজ্যে মুনাফায় ছাড় দেওয়া এবং তা এক জায়গায় দীর্ঘ সময় স্থির রাখার কোনো সুযোগ বা বিদ্যা শেখানো হয় না। কারণ, মুনাফা বন্ধ করলে এই ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তবে ইতিহাস বলছে, মুনাফা শোষণভিত্তিক এই ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই ভেঙ্গে পড়বে। কারণ সামন্ত ব্যবস্থা, দাসপ্রথাসহ পৃথিবীর সব অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই জন্ম হয়েছে, বিকাশ ঘটেছে এবং একসময় তার মৃত্যু হয়েছে। নতুন কোনো ব্যবস্থা তার জায়গা নিয়েছে।   

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে বাজার ব্যবস্থার প্রধান সুবিধাভোগী -উৎপাদনশীল এক গোষ্ঠী। এই -উৎপাদনশীল মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যে কৃষক কখনোই তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না, আবার ভোক্তাও অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়। এখানে বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার সুযোগে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র যখনই সুযোগ পায়, তখনই যথেচ্ছা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

এতে করে কৃষি সাধারণ ভোক্তাসমাজই মূলত সবসময় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী লাভবান হয়। অথচ সংবিধানেরমূলনীতিঅংশে কৃষক কৃষিপ্রশ্নে বলা রয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে কৃষক শ্রমিককে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তিদান এসব প্রশ্নে দেশ যদি বিপরীতমুখী চলে সাংবিধানিকভাবে তাকে প্রতিহত করার কোনো পথ আমাদের হাতে নেই। আবার মালিকানা প্রশ্নে সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা বণ্টনপ্রণালিসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ।এই মালিক বা নিয়ন্ত্রককৃষিসমাজ বা কৃষকনা বলেজনগণবলার মাধ্যমে অকৃষি সমাজকে সমানভাবে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর অকৃষি সমাজ অর্থাৎ ব্যবসায়ী-মুনাফালোভী গোষ্ঠী যখন কৃষিব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন নিশ্চিতভাবে কৃষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিতে বলা চলে, সংবিধানের একটি বক্তব্য অন্যটির সাথে সাংঘর্ষিক এবং বিপরীতার্থক। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবেসমাজতন্ত্র’-এর কথা বলা হলেও ধানের পুরো সাপ্লাইর চেন রেখে দেওয়া হয়েছেবাজার’-এর হাতে। এর সঙ্গে পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী দৌরাত্ম্য যোগ হয়ে সরকারের সদিচ্ছা থাকার পরও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির কোনো তত্ত্ব-উপাত্ত সমাধানই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিরসন করতে দেয় না।

বাংলাদেশে বরাবরই এক ধরনের সমঝোতাভিত্তিক দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে, যেখানে ভোক্তাস্বার্থ সবসময় উপেক্ষিত থাকে। অবস্থায় নানা উপায়ে নিয়ন্ত্রণের বৃথা চেষ্টা না করে স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি, পদ্ধতিগত উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা উন্নয়নেই আমাদের বেশি জোর দিতে হবে। গণমাধ্যমসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগীর ভূমিকা নিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

×