ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

দিল্লির মসনদে আবারও নরেন্দ্র মোদি

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত: ২০:৪১, ১১ জুন ২০২৪

দিল্লির মসনদে আবারও নরেন্দ্র মোদি

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রায় আড়াই মাস ধরে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারে মোদি এবং তার অনুগামীরা যেসব এজেন্ডা বা ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যে ভাষা এবং ভঙ্গিতে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন, সচেতনভাবে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, তাতে যদি ভারতের জনগণ সমর্থন জানাতেন, তাতে ৪০০ পার না হলেও অন্তত দলগতভাবে মোদির দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত।

বিজেপির জয় লাভের পর ২০১৪ সালের ২৬ মে প্রথমবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয়বারের জন্য তিনি জিতে আসেন ২০১৯ সালে। এবার তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির এই নেতা। এর আগে ভারতের ইতিহাসে দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

নরেন্দ্র মোদিও ভারতীয় ইতিহাসের সেই স্থানে ঠাঁই করে নিলেন। এটি নরেন্দ্র মোদির জন্য অত্যন্ত গৌরবের। আর নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেই দুর্লভ ইতিাসের অংশ হয়ে রইলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি বাংলাদেশের জন্য কম গৌরবের নয়। 
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের স্লোগান ছিল ‘আচ্ছে দিন আসছে’। বিগত ৯ বছরে ৪ কোটি মানুষ মাথার ওপর ছাদ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনায়। ১১ কোটি মানুষ পেয়েছেন শৌচালয়। উজ্জ্বলা যোজনা আসার পর কাউকে আর উনুনে রাঁধতে হচ্ছে না। চলছে স্কিল ইন্ডিয়া, মেক-ইন-ইন্ডিয়ার মতো অজস্র প্রকল্প। সন্ত্রাসী হামলার প্রত্যুত্তর হিসেবে এদেশ সাক্ষী থেকেছে বালাকোট এয়ার স্ট্রাইকের। নিরাপত্তা হোক বা কৃষি, কর্মসংস্থান হোক বা দারিদ্র্য দূরীকরণÑবিগত ৯ বছরে কীভাবে এলো সেই ‘আচ্ছে দিন’? 
ক্ষমতায় আসার পরপরই দারিদ্র্য দূরীকরণে একাধিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখা গেছে দেশজুড়ে। একসময় ‘গরিবি হঠাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে নির্বাচনে বাজিমাত করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু কংগ্রেসের জমানায় সেই স্লোগান নিছকই ছিল ফাঁকা আওয়াজ। তাই রাজীব গান্ধীকে পর্যন্ত বলতে হয়েছিল, ‘আমি ১ টাকা পাঠালে মানুষের কাছে পৌঁছায় ১৫ পয়সা।’ অর্থাৎ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির কথা তখন তাদের প্রধানমন্ত্রীকেও স্বীকার করতে হয়েছিল।

চিত্র বদলাতে থাকে ২০১৪ সাল থেকে। অনেকেই মনে করেন, আজ দারিদ্র্য দূরীকরণের একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সাক্ষী ভারতবাসী। ২০২৩ সালে ৯ বছর সম্পূর্ণ করল মোদি সরকার। বিগত ৯ বছরে একাধিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য। যেমনÑ মুদ্রা যোজনা, স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া ইত্যাদি।

এসবই সারাদেশে বেকারদের মধ্যে কর্মসংস্থানের স্রোত তৈরি করতে পেরেছে, এমনটাই বলছেন অর্থনীতিবিদরা। জানা গেছে, এখনো অবধি মুদ্রা যোজনার আওতায় ৪০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে পিছিয়ে পড়া তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং ওবিসি উদ্যোক্তাদের। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে তুলে আনার জন্য এটি মোদি সরকারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে, বিপদসংকুল নর্দমা এবং সেফটি ট্যাংকগুলো পরিষ্কারের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হয়েছে। যাতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমে এবং সাফাই কর্মীরা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন। জনজাতি সমাজকে সম্মান জানাতে নভেম্বরের ১৫ তারিখ ভগবান বীরসা মুন্ডার জয়ন্তীকে জনজাতি গৌরব দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে মোদি সরকার।
‘ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডিং’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, মোদি সরকার দেশের চরম দারিদ্র্য মেটাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি ‘মাল্টি ডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স’, যা প্রকাশ করে ‘ইউনাইটেড নেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’, তাদের মতে, মোদি সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণের দশটি ধাপই পার করতে সক্ষম হয়েছে।

মোদি সরকারের অন্যতম নীতি হলো ‘অন্ত্যোদয়’, যার অর্থ সমাজের সব থেকে পেছনে থাকা ব্যক্তিটির কাছে যতক্ষণ না পর্যন্ত উন্নয়ন পৌঁছাতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিকাশকে সম্পূর্ণ বলা যাবে না। 
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় ৬০ শতাংশ মন্ত্রীই হলেন তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং ওবিসি সমাজভুক্ত।

দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে একলব্য আবাসিক বিদ্যালয় আগের চেয়ে পাঁচগুণ স্থাপন করা হয়েছে সারাদেশে। ৪৮.২৭ কোটি ভারতীয়র জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ২৯.৭৫ কোটি মানুষকে প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনার আওতায় আনা হয়েছে। ১৩.৫৩ কোটি মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর জীবনজ্যোতি বিমার আওতায় আনা হয়েছে।

৩৭ কোটি মানুষকে আয়ুষ্মান ভারত যোজনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ২.৮৬ কোটি মানুষের বাড়িতে সৌভাগ্য যোজনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হয়েছে। ৯.৬ কোটি মানুষকে উজ্জ্বলা যোজনার মাধ্যমে এলপিজি গ্যাস কানেকশন দেওয়া হয়েছে। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের জন্য ‘দ্য ট্রান্সজেন্ডার পার্সন অ্যাক্ট ২০১৯’ পাশ করা হয়েছে।

ড্রাগের ছায়া থেকে সমাজকে বাঁচাতে, নেশামুক্ত ভারত অভিযান করা হয়েছে। ২৮.৮৫ কোটি অসংগঠিত শ্রমিকদের পোর্টালের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শ্রমযোগী মানধন পেনশন যোজনার মাধ্যমে অসংগঠিত ক্ষেত্রে ৪৯ .২৯ লাখ শ্রমিকের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে। যারা ৬০ বছর বয়স হলে তিন হাজার টাকা করে পেনশন পাবেন।
মোদি সরকারের উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি সাফল্য- ১) গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত সুদান থেকে অপারেশন কাবেরির মাধ্যমে তিন হাজারের বেশি ভারতীয়কে ফিরিয়ে আনা। ২) ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা এবং আর্টিকল ৩৫ (এ) বিলোপ করা হয়েছে ভারতীয় সংবিধান থেকে। ৩) গত ৫ বছরে যুদ্ধ সরঞ্জাম বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ৩৩৪ শতাংশ। ৪) ২ কোটি ৯৭ লাখের বেশি যাত্রীকে বন্দে ভারত ফ্লাইটের আওতায় আনা হয়েছে। ৫) প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চার হাজার একশ’র বেশি জিনিস দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ৬) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২৩ হাজারের বেশি ভারতীয়কে ইউক্রেন থেকে উদ্ধার করেছে মোদি সরকার। ৭) ভূমিকম্প বিধ্বস্ত তুরস্কে অপারেশন দোস্তের মাধ্যমে ৫,৯৪৫ টন আপৎকালীন ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে ভারত সরকার। ৮) ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ৫০০ কোটির বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। ৯) অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ডগুলোকে বদলানো হয়েছে সাতটি প্রতিরক্ষা পিএসইউতে। ১০) ২৯.২ কোটি কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনকে ৬১’র বেশি দেশে পৌঁছানো হয়েছে ভ্যাকসিন মৈত্রী প্রকল্পের মাধ্যমে। ১১) ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে সেভাবে কোনো সন্ত্রাসবাদী হামলা ঘটেনি। ১২) ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, ২০১৯ সালের এয়ার স্ট্রাইকের মাধ্যমে কড়া জবাব দেওয়া হয়েছে পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদকে।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক- বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

×