ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১

সড়ক দুর্ঘটনা কাম্য নয়

মো. মমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২১:০৬, ১০ জুন ২০২৪

সড়ক দুর্ঘটনা কাম্য নয়

প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে সড়ক দুর্ঘটনা

প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঝরে পড়ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। পত্রিকার পাতা খুললে এবং টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই ভেসে ওঠে সড়ক দুর্ঘটনার মর্মান্তিক চিত্র। প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যু অবধারিত, তা সত্য, কিন্তু অনাকাক্সিক্ষতভাবে মৃত্যু হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ২০১৮ সালে সড়ক আইন সংশোধনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল সড়কে চলাচল জনসাধারণের জন্য আরও নিরাপদ হবে।

কিন্তু এখন তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুসারে, ২০২৩ দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৯১১টি। নিহত হয়েছে ৬ হাজার ৫২৪ জন এবং আহত হয়েছে ১১ হাজার ৪০৭ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৯৭৪ জন এবং শিশু ১ হাজার ১২৮ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৫৩২টি। অন্যদিকে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র আরও ভয়াবহ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশে ৬৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৭১৩ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১২,৬১৫ জন। নিহতের মধ্যে নারী ১০৬১ ও শিশু ১১৪৩ জন। ২৯৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ৩০৯১ জন, যা মোট নিহতের ৪০.০৭ শতাংশ।

এ ছাড়াও বিআরটিএ-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫৫০ জন এবং এপ্রিল মাসে মোট ৬৫৮টি দুর্ঘটনায় ৬৩২ জন নিহত হয়েছে। এভাবে প্রতিমাসে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০২৪ সালে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৭০০০, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ওপরের পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মোট নিহতের ৪০ শতাংশই মৃত্যুবরণ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণে। নিহতদের মধ্যে তরুণ ও যুবকের সংখ্যা বেশি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ২১ এর নিচে। যুবকরা আবেগের বশবর্তী হয়ে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়। বিশেষত, ঈদের দিন এবং বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলেরা শখ করে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তাই অভিভাকদের সন্তানদেরকে মোটরসাইকেল দেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে চালকের অদক্ষতা, ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালানো, গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলা, চালকের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, নেশাযুক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো ইত্যাদি। এছাড়াও তরুণ ও যুবাদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ত্রুটিযুক্ত যান চলাচল, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, চলাচল অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার, রাস্তায় গতিসীমা নির্দেশক ও স্পিড ব্রেকার না থাকা এবং যথেষ্ট পরিমাণ ওভার ব্রিজ না থাকা, জনসাধারণের ট্রাফিক আইন জানা না থাকা, জানা থাকেলেও আইন না মানার প্রবণতা। বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্বলতা, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কারণেও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
সড়ক দুর্ঘটনার ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বেড়েছে। কেউ কেউ বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিকিৎসার অর্থ জোগান দিতে নিঃস্ব  হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা প্রতিরোধ করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেগুলো হচ্ছে- চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে।

প্রয়োজনে ওভার ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে, রাস্তায় ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ওভার টেকিংয়ের বিষয়ে চালকদের সতর্ক হতে হবে। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ও চালককে অপসারণ করতে হবে। বিশেষ করে জনসাধারণকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে সরকার পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে। আশা করি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ আইনের সঠিক ব্যবহার করে এবং যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : গবেষক

×