ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

বিএনপির ক্ষমতা দখলের আস্ফালন অলীক দিবাস্বপ্ন

তাপস হালদার

প্রকাশিত: ১৩:৫৮, ৯ ডিসেম্বর ২০২২; আপডেট: ১৪:০৮, ৯ ডিসেম্বর ২০২২

বিএনপির ক্ষমতা দখলের আস্ফালন অলীক দিবাস্বপ্ন

তাপস হালদার

১০ ডিসেম্বরকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের উদ্বেগ উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।উত্তেজনা পরিস্থিতিটা তৈরি করেছে বিএনপির কিছু অর্বাচীন নেতারা।তারা বিভিন্ন সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছে ১০ ডিসেম্বর সমাবেশে যোগ দিবেন খালেদা জিয়া,সেদিন তারেক রহমান বীরের বেশে দেশে ফিরবেন এবং তারপর থেকে দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়।

এসব বালখিল্য কথা তাদের কিছু সমর্থকেরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামী,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদান্যতায় বাসায় আছে তার কোনো মতে সমাবেশে আসার সুযোগ নেই।আর তারেক রহমান যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত আসামী সে দেশে ফিরলে নিশ্চিত স্থান হবে কারাগারে।বিএনপি নেতাদের এই আস্ফালন দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়।

বিএনপি গত ১২ অক্টোবর থেকে সারা দেশে সমাবেশ করে আসছে।যার প্রতিটি সমাবেশই সেখানকার ঐতিহাসিক মাঠে হয়েছে।কিন্তু ঢাকার সবচেয়ে ঐতিহাসিক মাঠ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ,সেখানে অনুমতি দেয়া সত্ত্বেও বিএনপি সমাবেশ করবে না বলে গো ধরেছে।

এক্ষেত্রে অনেক গুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো জামায়াতে ইসলামীর অনীহা।কারণ এই মাসের ১৬ তারিখই তো তাদের প্রভু পাকিস্তানিরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করেছিল।বিএনপির সমাবেশে অধিকাংশ লোকই জামায়াতের থাকে,তাই তাদের আপত্তি থাকলে বিএনপির কিছু করার সুযোগ থাকে না।

বিএনপি পল্টনে সমাবেশ করার আরেকটি কারণ হলো সরকারকে বিপদে ফেলতে তাদের অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে হেফাজতের মতো ঢাকাকে অবরোধ করার পরিকল্পনা।ইতিমধ্যে সে আলামত লক্ষ্য করা গেছে।পুলিশি তল্লাশিকে পার্টি অফিসে বোম,ককটেল পাওয়া গেছে। 


বিএনপির দাবি আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে।এজন্য তারা যেকোনো মূল্যে সরকারকে উৎখাতের ঘোষণাও দিয়েছে। সাংবিধানিক ভাবে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বিএনপির আন্দোলনের কথা শুনে জনগনের মধ্যে এক ধরনের ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের আন্দোলনের ইতিহাস তো ভয়াবহ।বিএনপির আন্দোলন মানেই তো জ্বালাও পোড়াও হত্যা খুনের রাজনীতি। 

বিএনপির আন্দোলনের কথা শুনলে জনগন শঙ্কিত হয়ে উঠে।বিগত দিনে বিএনপি -জামায়াতের আন্দোলন মানেই মানুষ দেখেছে সহিংস আন্দোলন। বিএনপি যতই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলুক না কেন, ঘর পোড়া গরু সিদেঁলে মেঘ দেখলে যেমন ভয় পায়,ঠিক তেমনি বিএনপির আন্দোলনের কথা শুনলেই জনগন আতঙ্কিত হয়ে উঠে। ইতোমধ্যেই ১০ ডিসেম্বর ঘিরে নাশকতা শুরু করে দিয়েছে।


সাম্প্রতিক কালে বিএনপি বেশ কয়েকটি সমাবেশ করেছে।সেখানে নেতাদের উস্কানিমূলক মূলক বক্তব্যে আবারও সহিংসতার আঁচ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।তাদের সমাবেশে সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ কোনো রকম বাধা দিচ্ছে না।তারপরও সরকারকে টেঁনে হিঁচড়ে নামানো,সরকার পালানোর পথ পাবেনা এসব উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যার কারণে জনগণ অজানা আতঙ্কে  যারপরনাই আবার শঙ্কিত হয়ে উঠছে।২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট যে ‘রাজনৈতিক ভুল’ ছিল তা বিএনপি নেতারা একবাক্যে স্বীকার করে।এবং সেই নির্বাচন রুখতে তারা যে সহিংসতার পথ অনুসরণ করেছিল তা যে মারাত্মক ভুল ছিল তা পরবর্তীতে  হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছে দলটি।

রাজনৈতিক ফায়দা তো তুলতেই পারেনি,বরং দলগত ভাবে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পরবর্তীতে দেখা গেছে শুধুমাত্র দলীয় নেতাকর্মীরাই নয়,দেশি-বিদেশি মিডিয়া এবং সাধারণ জনগনও বলেছে বিএনপির নির্বাচন না করাটা তাদের মারাত্মক ভুল হয়েছে।সে নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও একটি কার্যকর বিরোধী দলের ভুমিকা পালন করতে পারতো।তাহলে তাদের আজ এমন দেউলিয়াত্বের পথে যেতে হতো না।

বিএনপি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে তার রূপরেখা একযুগেও জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি।বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা দিয়ে জাতির কাছে হাস্যকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন খালেদা জিয়া।তারপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করলেও কখনো রূপরেখা দিতে সমর্থ হয় নি।নির্বাচন সামনে আসলেই বিএনপি ষড়যন্ত্র শুরু করে এটা তাদের পুরানো অভ্যাস।

বিএনপি তাদের সমাবেশ গুলো নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনেই করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে তার যথেষ্ট কারণ আছে।অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,দলীয় কার্যালয়কে ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন সময়ে  নাশকতা করেছে।২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে দলীয় কর্মীরা ইস্যু তৈরি করতে ছয়টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।

প্রতিবাদে ৭ মার্চ সারা দেশে হরতাল ডাকে।পরবর্তীতে পুলিশ ককটেল নিক্ষেপকারীদের গ্রেফতার করে এবং তদন্তে দেখা যায়,হরতালের ইস্যু সৃষ্টি করার জন্যই সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।এরপরও দলের নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ১৮ ও ১৯ মার্চ হরতাল পালন করে।এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের মুক্তি ও বিচার বন্ধের দাবিতে লাগাতার হরতাল অবরোধ দেয়।যার প্রতিটি হরতালই ছিল সহিংস।এভাবে ২০১৩ সালের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১৫ দিন হরতালের অভিশাপে জনগণকে দিন কাটাতে হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিয়ে,ধংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়েও সফল হতে পারে নি।বরং নির্বাচনের একবছর পর গনতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করতে গিয়ে উল্টো চাপে পড়ে দলটি।হরতালের নামে টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া।যদিও সেই অবরোধ আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনো প্রত্যাহার করেনি।বিএনপি আন্দোলন করুক কিংবা সমাবেশ করুক তাদের মূল শক্তি জামায়াতের ইসলামের নেতাকর্মীরা।জামায়াতের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না থাকায় বিএনপির সাথে তারা একাকার হয়ে গেছে।

বিএনপির আন্দোলন মানেই কিভাবে ক্ষমতা দখল করা  যায়।জনগনের কোন দাবি নিয়ে  তারা কখনো আন্দোলন করেনি।বৈশ্বিক সংকটও জনগণের পাশে না থেকে কিভাবে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়া হবে সেই আশায় বুক বেঁধে ছিল। বাংলাদেশ একটি বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়লে সরকারের পতন ঘটবে,সে আশায় বসে থাকে। বিএনপির অতীত ইতিহাস তো সুখকর নয়।তারা যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। সীমাহীন দুর্নীতিতে দেশ হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।জনগনের আস্থা অর্জন না করতে পারলে কোন আন্দোলনই সফল হবে না।

শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের জন্য আন্দোলন করলে জনগণ সম্পৃক্ত হবে না,বরং কর্মীরাও দূরে সরে যাবে। জনগণেরর বিশ্বাস অর্জন করতে চাইলে,জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে হয়। তা না হলে আন্দোলনের আস্ফালন বুমেরাং হয়ে যাবে। বিএনপি বলেছে তারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেনা।গত সংসদ নির্বাচনের আগেও তারা এমনটিই বলেছিল।কিন্তু জল ঘোলা করে শেষ মুহুর্তে নির্বাচনে আসে।পরিস্থিতি যা হওযার তাই হয়েছে।প্রস্তুতি ছাড়া নির্বাচনে গিয়ে তারা মাত্র ৭ টি আসন পেয়েছে।

বিএনপিকে বাস্তবতায় আসতে হবে। সরকার পরিবর্তনে নির্বাচন ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই।প্রতিটি গনতান্ত্রিক দেশেই তাই হয়ে থাকে।বাংলাদেশে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু হয়েছিল,সে পরিস্থিতি এখন আর নেই।ভবিষ্যতেও সেটি আর আসবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখন মৃত। এ নিয়ে মায়া কান্না না করে নির্বাচনে আসতে হবে। ১০ ডিসেম্বর ঘিরে নাশকতা করে কোন লাভ হবে না।বিএনপির ক্ষমতা দখলের দিবাস্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ।
 

এসআর

monarchmart
monarchmart