উদ্দিনের (৩৫) শরীরটা অপূর্ণ হলেও তার মনোবল পাহাড়সম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, বরং ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন কোটচাঁদপুর পৌর এলাকার সলেমানপুর গ্রামের এই যুবক। স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে তার ছোট সংসার। আশা ছিল, ঈদের আগে প্রতিবন্ধী ভাতার জমানো টাকাটা পেলে পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে ঈদ কাটাবেন। কিন্তু সেই আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
আগামী শনিবার ঈদ। অথচ আজ পর্যন্ত ভাতার টাকা হাতে পাননি নজির উদ্দিন। শুধু নজির একা নন, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার ১৩ হাজার ৫৫৫ জন অসহায় ভাতাভোগীর কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। সরকারি দপ্তরের ‘টেকনিক্যাল জটিলতা’ আর ‘অধিদপ্তরের গ্যাড়াকলে’ পড়ে ঈদের আনন্দ এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে এই মানুষগুলোর।
উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ৫৫৫ জন ভাতাভোগী রয়েছেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ২০৬ জন বয়স্ক, ২ হাজার ৯৭০ জন বিধবা এবং ৪ হাজার ৩৭৯ জন প্রতিবন্ধী। নিয়ম অনুযায়ী, ঈদের আগে প্রত্যেকের তিন মাসের ভাতার টাকা একসঙ্গে পাওয়ার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যেই গত ৩রা মার্চ ভাতার টাকা ছাড়ের জন্য ‘সাবমিট’ করা হয়। কিন্তু মাসের অর্ধেক পার হয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও টাকা ঢোকেনি উপকারভোগীদের মোবাইলে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বশির আহম্মেদ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, "আমরা সময়মতো সব সাবমিট করেছি। পাশের কালীগঞ্জ উপজেলায় শুধু বয়স্করা টাকা পেয়েছেন, বাকিরা পাননি। কেন এমন হলো বুঝতে পারছি না। যারা অফিসে আসছিলেন, তাদের কথা দিয়েছিলাম ঈদের আগে টাকা পাবেন। এখন টাকা না পাওয়ায় আমি নিজেও মর্মাহত।" এর জন্য পরোক্ষভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান বলেন, "সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৩ তারিখের মধ্যে সাবমিট করতে বলা হয়েছিল যাতে ঈদের আগে টাকা দেওয়া যায়। আমাদের এখান থেকে যথাসময়ে কাজ শেষ করা হয়েছে। কিন্তু অধিদপ্তর কেন টাকা ছাড়ল না, সেটা ওরাই ভালো বলতে পারবে। ঈদের আগে অসহায় মানুষগুলো টাকা পেলে সত্যিই অনেক খুশি হতো।"
একজন প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক বা একজন বিধবা মায়ের কাছে ৭৫০ কিম্বা কয়েক হাজার টাকা অনেক বড় সম্বল। ঈদের ঠিক দুদিন আগে যখন ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, তখন এই টাকা পাওয়ার আশা ক্ষীণ। জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল মমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অসহায় এসব মানুষের প্রশ্ন—সব প্রস্তুতি থাকার পরও কেন উৎসবের আগে তাদের টাকা আটকে গেল? এই অবহেলার দায় কে নেবে? নজির উদ্দিনের মতো হাজারো মানুষের ঈদ আনন্দ এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসে সীমাবদ্ধ।








