ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

এক ছাগলেই ধ্বংস করলো মতিউরের সাজানো সাম্রাজ্য!

প্রকাশিত: ১৫:০৮, ২৪ জুন ২০২৪

এক ছাগলেই ধ্বংস করলো মতিউরের সাজানো সাম্রাজ্য!

মতিউর রহমান 

সালমান শাহের চলচ্চিত্রের একটি জনপ্রিয় গান হলো 'পিপড়া খাবে বড়লোকের ধন' এই গানটা যেনো পুরোপুরি না হলেও কাছাকাছি মিলেছে মতিউর রহমানের ক্ষেত্রে। এক ছাগল খেয়ে ফেললো মতিউর রহমানের সাজানো গুছানো সাম্রাজ্য। 

বর্তমানে আলোচনায় এই কোরবানির ছাগল; অথচ সরকারি এক কর্মকর্তার দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা ‘অবৈধ সম্পদ আর প্রতাপ’-এর সাম্রাজ্য ধসে পড়ার সব আয়োজন সম্পন্ন। প্রভাব খাটিয়ে পাহাড়সম সম্পদ আর বিত্ত-বৈভবের যে রাজকীয় জীবনযাপনে ঢুকেছিলেন রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তা যেন তাসের ঘরের মতো ধসে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন : কানাডায় ছাগলকান্ডের মতিউরের মেয়ে ইপসিতার রাজপ্রাসাদ

মতিউরকে নিয়ে এখন চারিদিকে সন্দেহ। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা (দুদক) তার সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমে পড়েছে। সরকারি এই কর্মকর্তা এখন সর্বত্রই ব্রাত্য লোক। তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে। সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেও এখন তাকে ডাকা হচ্ছে না। মাত্র এক সপ্তাহেই সব কিছু অপরিচিত হয়ে উঠেছে মতিউরের কাছে। এখন যেন কাছের লোকরাও চিনতে চাইছেন না।

কিন্তু কীভাবে এতো সম্পদের মালিক হলেন এই সরকারি চাকুরে? প্রশ্ন উঠছে, জনগণের কাছ থেকে কর-ভ্যাটের অর্থ আদায় করে তিনি কি নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন? দায়িত্ব ভুলে শুধু পরিবারের সমৃদ্ধির কথাই চিন্তা করেছেন? কত সম্পদ গড়েছেন তিনি? নিজের দখলে থাকা টাকা-পয়সা, রিসোর্ট, বাড়ি, জমি, গাড়িসহ কত সম্পদের মালিক মতিউর?   

এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে হঠাৎ করেই মতিউর রহমান কীভাবে জন-আলোচনায় ঢুকে পড়লেন সেদিকে একটু ফিরে দেখা যাক।

মতিউর নিয়ে আলোচনা যেভাবে শুরু
এবারের কোরবানির হাটের একটি ছাগল সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনায় আসে। পাঞ্জাবের বিটল জাতের ছাগলটি পালা হচ্ছিলো রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রোতে। ১৭৫ কেজি ওজনের খাসিটির চাওয়া হয় ১৫ লাখ। ৬৫ ইঞ্চি  উচ্চতার বাহারি ছাগলটি দেখে খুব পছন্দ হয় মুশফিকুর রহমান ইফাত নামের এক তরুণের।

কোরবানি ঈদের আগে একটি ভিডিও প্রকাশ হয় ফেসবুকে। সেখানে ওই ছাগলটি পাশে রেখে ইফাতকে বলতে শোনা যায়, এ রকম একটি খাসি কেনার স্বপ্ন ছিলো আমার। এ রকম খাসি কখনোই সামনাসামনি দেখিনি, আমার জীবনে প্রথম দেখা। এটি আমার হবে, জানা ছিলো না!

এই ভিডিও প্রকাশের পরই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় ইফাত। মূলত কনটেন্ট ক্রিয়েটররাই তাকে ভাইরাল বানিয়ে ফেলে। কারণ, বাংলাদেশের উদীয়মান পশুপালন খামার নিয়ে অসংখ্য কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাজ করেন। সব সময়ই এসব বিষয়ে কনটেন্ট প্রকাশ করেন তারা। এর আগে সাদিক অ্যাগ্রোর একটি কোটি টাকা মূল্যের আমেরিকান ব্রাহমা জাতের গরুও ভাইরাল করে দেয় ওই কনটেন্ট ক্রিয়েটররা।

যাই হোক, ছাগল কেনার সঙ্গে সঙ্গে ওত পেতে থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জালে পড়েন ইফাত। মুহুতেই ভাইরাল হয়ে যায় তার সেসব ছবি ও বক্তব্য। সামাজিক মাধ্যমে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে যে, কোরবানির জন্য এই কিশোর শুধু ছাগলই না, আরও ৫০ লাখ টাকা দিয়ে কয়েকটি গরুও কিনেছেন।

এমন ভাইরাল ইস্যু স্বাভাবিকভাবেই হাতছাড়া করবেন না কেউই। বহু কনটেন্ট ক্রিয়েটর হাজির হয় ইফাতের ধানমন্ডির বাড়িতে। সেখান থেকে লাপাত্তা হয়ে যায় ইফাত। এরি মধ্যে বেরিয়ে পড়ে ইফাতের বাবা রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান। এবার ভাইরাল আলোচনায় যোগ হয় আরেক ভাইরাল ইস্যু।

যখন দুদক সাবেক পুলিশ প্রধানের সম্পদ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান ও জব্দ করছে, তখনই আরেক সরকারি কর্মকর্তার ছেলের এমন বিলাসী জীবনযাপনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এবার তথ্য সরবরাহে নামে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো। বেরিয়ে আসতে শুরু করে মতিউরের থলের বিড়াল।


প্রথমে ছেলেকে অস্বীকার, পরে কথা ঘোরানো
সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরান হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ইফাতের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিল কিছুদিন আগে হওয়া ঢাকার প্রাণিসম্পদ মেলায়। এরপর সে খামারে এসে দামাদামির এক পর্যায়ে ১২ লাখ টাকায় বিটল প্রজাতির ছাগলটি কিনে নেয়। এক লাখ টাকা অ্যাডভ্যান্স করে ঈদের আগে বাকি অর্থ পরিশোধ করে ছাগল নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় সে।

ছাগলের ক্রেতা ইফাতের উপস্থিতিতেই এক ভিডিও কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে ইমরান হোসেন বলেন, এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খাসি। ইফাতের বাবারও এই ছাগল খুব পছন্দ হয়েছে। সে বাবাকে খুশি করার জন্য ১২ লাখ টাকায় খাসিটি কিনেছেন। এজন্য ইফাতকে ধন্যবাদ।       

কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর, ইফাতের থেকে তার বাবার আলোচনাই সামনে চলে আসে। এ সময় বেরিয়ে পড়ে যে, গত বছরও ইফাতের বাড়িতে অর্ধ লাখ টাকা মূল্যের কয়েকটি পশু কোরবানি হয়েছে। এরপরই মতিউরের বিলাসী জীবনযাপনের নানা তথ্য প্রকাশ পেতে থাকে।

খবর ছড়িয়ে পড়ে ইফাতের বাবা মতিউর রহমান এনবিআরের সদস্য এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদেও রয়েছেন। প্রকাশ্যে চলে আসে মতিউরের একাধিক স্ত্রীর কথা, শেয়ারবাজারে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ, বিভিন্ন কোম্পানিতে মালিকানা, বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাটের খবর। এরই সঙ্গে সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপনের গল্পও আসতে থাকে স্রোতের মতো।

বড় বেকায়দায় পড়ে দিশেহারা হয়ে যান মতিউর। প্রথমে ইফাতকে ছেলে হিসেবেই অস্বীকার করে বসেন। আর এসব নিয়ে যারা ‘গুজব ছড়াচ্ছে’ তাদের বিরুদ্ধে ‘মামলা’ করার হুঁশিয়ারি দিয়ে বসেন। আর যাই কই! হুমকি বাধে আরো গণ্ডগোল। বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর বেরোতে শুরু করে যে, মতিউরের ছেলেই ইফাত।

তখন বাধ্য হয়েই ছেলের অস্বীকৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন মতিউর। দাবি করেন, সাদিক অ্যাগ্রো তার ছেলেকে দিয়ে মার্কেটিং করিয়েছে। তবে সরকারি এই কর্মকর্তার দাবি সরাসরি উড়ে যায়, যখন সাদিকের মালিক ইমরান বিভিন্ন গণমাধ্যমে কথা বলা শুরু করেন। তিনি খাসি কেনাবেচার আলাপচারিতার বিস্তারিত গণমাধ্যমকে জানান এবং তথ্যপ্রমাণ হাজির করেন।  

১৫ লাখের ছাগলকে কেন্দ্র করে ভাইরাল হওয়ার পর ইফাতের দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, গাড়ি, আলিশান জীবনযাপনের নানা বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে। সরকারি চাকুরীজীবী বাবার বেতনের টাকা দিয়ে ছেলে কীভাবে এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারে, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন চলতেই থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন জোর আলোচনা ওঠে, এক ছাগলের জন্যই কি বাবা-ছেলের সম্পর্ক অস্বীকার?  অনেকে মন্তব্য করেন, ১৫ লাখ টাকার উচ্চবংশীয় ছাগল কোরবানি কাণ্ডে এখন বাপ ছেলের সম্পর্ককে কোরবানি দিচ্ছেন এক রাজস্ব কর্মকর্তা।

যেভাবে জানা গেলো ইফাতের বাবাই মতিউর
মতিউর রহমানের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ইফাত যে তারই সন্তান, সেটির সপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকগুলো ছবি ও তথ্য প্রকাশিত হয়। পরে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানেও জানা যায়, ইফাতের মা শাম্মী আখতার শিভলী ওরফে শিবলী মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী।

শাম্মী আখতারের বাবার বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। শাম্মী আখতার ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য (ফেনী-২) নিজাম উদ্দিন হাজারীর আত্মীয়। নিজাম উদ্দিন হাজারী গণমাধ্যমকে জানান, ইফাত তার মামাতো বোনের সন্তান। আর মতিউর রহমানই তার বাবা।

কত সম্পদের মালিক মতিউর?
ছেলের ছাগলকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আলোচনা এখন মতিউর রহমানের সম্পদের দিকে গড়িয়েছে। তার কত সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে শুরু হয় সন্ধান। চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নরসিংদীতে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে অনেক সম্পত্তি রয়েছে বলে অনেকেই দাবি করছেন।

একাধিক গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, রিসোর্ট, শুটিং স্পট, বাংলো, জমিসহ মতিউরের নামে-বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদ। বরিশালেও রয়েছে তার সম্পদ। ঢাকায়ও আছে একাধিক প্লট ও দামি গাড়ি। স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ গড়েছেন মতিউর।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ঢাকায় মতিউর রহমানের স্ত্রী-সন্তান ও ঘনিষ্ঠদের নামে দুই ডজন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরার ডি-ব্লকের ৭/এ রোডের ৩৮৪ নম্বর ভবনের মালিক তিনি। সাততলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী লায়লা কানিজকে নিয়ে বাস করেন।

গুলশানের সাহাবুদ্দিন পার্কের পাশে ৮৩ নম্বর রোডের ১১ নম্বর প্লটে আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের বেগ পার্ক ভিউতে রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। কাকরাইলে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে ছোট স্ত্রীর নামে। এছাড়া ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে একাধিক ফ্ল্যাটের খোঁজ পাওয়া গেছে।

টঙ্গীতে এসকে ট্রিমস নামের কারখানার মালিকানাও রয়েছে তারা। নরসিংদীর রায়পুরায় ওয়ান্ডার পার্ক অ্যান্ড ইকো রিসোর্ট রয়েছে মতিউরের। এসব রিসোর্টের মালিকানায় আছে তার ছেলে ও মেয়ে। ময়মনসিংহের ভালুকার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের ঝালপাজা মৌজায় আছে গ্লোবাল শুজ লিমিটেড নামে জুতার ফ্যাক্টরি। এখানে প্রায় ৩০০ বিঘা জমিজুড়ে রয়েছে গ্লোবাল সুজ লিমিটেড কারখানা, বাগানবাড়ি, দেশি-বিদেশি ফলের বাগান ও ফসলি জমি। স্থানীয় বাজারদরে ওই ৩০০ বিঘা জমির দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

শুধু ভালুকা নয়, গাজীপুরের পূবাইলেও রয়েছে মতিউর রহমানের বিশাল সাম্রাজ্য। পূবাইলের খিলগাঁওয়ের টঙ্গী-ঘোড়াশাল সড়কের দক্ষিণ পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তুলেছেন ‘আপন ভুবন’ পিকনিক অ্যান্ড শুটিং স্পট। রিসোর্টটি প্রায় ২৫ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

নরসিংদীর মরজালে তার স্ত্রী উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকির নামে ১০০ বিঘা জমির ওপর রয়েছে ওয়ান্ডার পার্ক অ্যান্ড ইকো রিসোর্ট। তার মেয়ে ফারজানা ঈপ্সিতার নামে মরজাল বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশ এলাকায় ১০ বিঘা জমি রয়েছে।

এবি 

×