ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

শান্তিরক্ষী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

অস্ত্রের টাকা জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষায় ব্যয় করুন

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:১২, ৩০ মে ২০২৪

অস্ত্রের টাকা জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষায় ব্যয় করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আহত শান্তিরক্ষীদের ক্রেস্ট প্রদান করেন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরাইলের চলমান গণহত্যা ও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যুদ্ধ মানবজাতির জন্য কী কল্যাণ বয়ে আনছে? যুদ্ধ বন্ধ করে অস্ত্র তৈরি ও প্রতিযোগিতার টাকা জলবায়ুর অভিঘাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে, ক্ষুধার্তের আহার ও শিশু শিক্ষায় কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০২৪ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকটাত্মীয় ও আহত শান্তিরক্ষীদের সংবর্ধনা জানানো হয় এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম উপস্থাপন করা হয়। 
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, যুদ্ধ আজ বিশ্বশান্তি বিঘিœত করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরাইলের হামলায় হাজার হাজার মানুষ মরছে, সেখানে গণহত্যা চলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করা- ইত্যাদি মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আমি ঠিক জানি না, এই সংঘাত বা যুদ্ধ মানবজাতির জন্য কী কল্যাণ বয়ে আনছে?

অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই মানুষের জীবন আরও বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নারী, শিশুরা বেশি কষ্ট পাচ্ছে। যুবকরা অকাতরে জীবন দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আলাপ-আলোচনা মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে চাই।

সরকারপ্রধান বলেন, বিশ্বের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। কোটি কোটি মানুষ দু’বেলা খাবার পায় না। রোগের চিকিৎসা পায় না। শিশুরা শিক্ষা পায় না, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। যারা অস্ত্র তৈরি ও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় এত অর্থ ব্যয় করছেন, তাদের কাছে আমার আহ্বান- আমরা শান্তির কথা বলি, কিন্তু সংঘাতে লিপ্ত হই, কেন?

এই যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, এই অর্থ যদি ক্ষুধার্ত মানুষের আহার, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় হতো, তা হলে এই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতো, মানুষের জীবনমান উন্নত হতো, মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচতে পারত। কিন্তু এই সংঘাত প্রতিনিয়িত মানুষকে আরও কষ্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি সবসময় যেখানেই যাই, এই একটি আহ্বান জানাই, সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা, সেটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কাজ।

তিনি বলেন, ‘সেই সঙ্গে যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে, সেই জলবায়ু অভিঘাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য এই অস্ত্র তৈরি ও প্রতিযোগিতার অর্থ দিতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুধার্ত ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের ক্ষুধা নিবারণ ও শিক্ষার আলো দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারে, সেই আহ্বানটাই আজ আমি জানিয়ে যাচ্ছি।’ 

শান্তিরক্ষীদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে ৬৩টি মিশন সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত করেছে। বর্তমানে ১৩টি মিশন চলমান। যে দরদ ও আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের শান্তিরক্ষীরা কাজ করেন, বিশ্বের যেখানেই যাই, এ বিষয়ে প্রশংসা পাই।
বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেসব দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী কাজ করছে, সেসব দেশে গেলে বা তাদের রাষ্ট্রপ্রধান-সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দেখা হলে তারা প্রত্যেকেই আমাদের শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এটা শুনে সত্যিই গর্বে বুক ভরে যায়।
চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা যাতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেন, সে জন্য তাদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে গৌরবের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশের সদস্যরা। আরও বেশি নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণের জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আমাদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করা অতীতের চেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, প্রযুক্তির সাম্প্রতিক প্রসার ও অগ্রযাত্রার সঙ্গে বাড়ছে নতুন নতুন হুমকি। ফলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর শান্তিরক্ষীদের বহুমাত্রিক জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শান্তিরক্ষা মিশনগুলো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও বিপজ্জনক অঞ্চলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, সে জন্য তাদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে আমাদের পদক্ষেপ ‘উইমেন স্পিচ অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডা’ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অন্যতম বৃহৎ নারী শান্তিরক্ষী দেশ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করছে।’ 
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ৬ হাজার ৯২ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ৪৯৩ জন নারী শান্তিরক্ষী আছে। আর এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩ হাজার ৩৮ জন নারী শান্তিরক্ষী অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তি মিশন সম্পন্ন করেছেন। এখন দাবি আসছে, আরও নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণ করার। আমরা নারী শান্তিরক্ষীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
এর আগে সকালে শান্তিরক্ষীদের সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। পরে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ‘শান্তিরক্ষী দৌড়-২০২৪’ উদ্বোধন করেন।

×