ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রথম পর্যায়ে ৪৭ ইউএনও রদবদল

মাঠ প্রশাসনে বদলি আতঙ্ক

তপন বিশ্বাস

প্রকাশিত: ০০:০৭, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

মাঠ প্রশাসনে বদলি আতঙ্ক

৮ বিভাগের ৪৭ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করেছে সরকার

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম পর্যায়ে দেশের ৮ বিভাগের ৪৭ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করেছে সরকার। সোমবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়ার পরই রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করে আট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। এদিকে একযোগে বিপুল সংখ্যক ওসি ও ইউএনওকে বদলির সিদ্ধান্তে কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে তারা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মাঠ প্রশাসনে বদলি প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন কমিশন বদলির প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপনের পরই সোমবার সন্ধ্যায় ইউএনও বদলি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। প্রথম পর্যায়ে আট বিভাগে ৪৭ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পর্যায়ক্রামে  ইসির চাহিদা মোতাবেক বদলির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সূত্র জানায়, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা বিভাগের ১৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের আটজন, বরিশাল বিভাগের দুজন, খুলনা বিভাগের চারজন, ময়মনসিংহ বিভাগের ছয়জন, সিলেট বিভাগের ছয়জন, রাজশাহী বিভাগের ছয়জন এবং রংপুর বিভাগের দুই ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে। বরিশাল সদরের ইউএনও মনিরুজ্জামানকে পিরোজপুরে ও পিরোজপুর নেছারাবাদের ইউএনও মো. মাহবুব উল্লাহ মজুমদারকে বরিশাল সদরে বদলি করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদরের ইউএনও রাসেদুল হাসানকে পঞ্চগড়ের অটোয়ারীতে, আর পঞ্চগড়ের অটোয়ারীর ইউএনও মো. মুসফিকুল আলম হালিমকে কুড়িগ্রাম সদরে বদলি করা হয়েছে।
নওগাঁর বদলগাছীর ইউএনও মোসা. আলপনা ইয়াসমিনকে পাবনার সাঁথিয়ায় বদলি করা হয়েছে। নওগাঁর সাপাহারের ইউএনও মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জয়পুরহাট সদরে, জয়পুরহাট সদরের ইউএনও আরাফাত হোসেনকে পাবনার ভাঙ্গুড়া, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ইউএনও তৃপ্তি কণা ম-লকে নওগাঁর বদলগাছী, পাবনার সাঁথিয়ার ইউএনও মো. মাসুদ হোসেনকে নওগাঁর সাপাহার ও পাবনার ভাঙ্গুড়ার ইউএনও মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খানকে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে বদলি করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটি সদরের ইউএনও নাজমা বিনতে আমিনকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে, বান্দরবানের লামার ইউএনও মোস্তফা জাবেদ কায়সারকে রাঙ্গামাটি সদরে, রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর ইউএনও শান্তনু কুমার দাশকে বান্দরবানের লামায়, খাগড়াছড়ির পানছড়ির ইউএনও রুবাইয়া আফরোজকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে, কক্সবাজারের পেকুয়ার ইউএনও পূর্বিতা চাকমাকে চাঁদপুরের হাইমচরে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের ইউএনও এএইচ ইরফান উদ্দিন আহমেদকে রাঙ্গামাটির রাজস্থলীতে, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ইউএনও অনজন দাশকে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ও চাঁদপুরের হাইমচরের ইউএনও চাই থোয়াইহলা চৌধুরীকে কক্সবাজারের পেকুয়ায় বদলি করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদরের ইউএনও শামীম ভুইয়া চৌধুরীকে সাতক্ষীরা সদরে, কুষ্টিয়ার কুমারখালির ইউএনও বিতান কুমার ম-লকে যশোরের ঝিকরগাছায়, সাতক্ষীরা সদরের ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরাকে চুয়াডাঙ্গা সদরে ও যশোরের ঝিকরগাছার ইউএনও মো. মাহবুবুল হককে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বদলি করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ ঈশ্বরগঞ্জের ইউএনও হাফিজা জেসমিনকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহ তারাকান্দার ইউএনও মিজাবে রহমতকে শেরপুর সদরে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ইউএনও ছাব্বির আহমেদ আকুঞ্জিকে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে, জামালপুর সদরের ইউএনও লিটুস লরেন্স চিরানকে নেত্রকোনার আটপাড়ায়, শেরপুর সদরের ইউএনও মেহনাজ ফেরদৌসকে জামালপুর সদরে, নেত্রকোনা আটপাড়ার ইউএনও মো. শাকিল আহমেদকে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ ভৈরবের ইউএনও মো. সাদিকুর রহমান সবুজকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে, নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ইউএনও ফরিদপুরের ভাঙ্গায়, গাজীপুরের কাপাসিয়ার ইউএনও এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খানকে কিশোরগঞ্জ ভৈরবে, কিশোরগঞ্জ সদরের ইউএনও মোহাম্মদ আলী সিদ্দিককে গাজীপুরের কাপাসিয়ায়, কিশোরগঞ্জ পাকুন্দিয়ার ইউএনও রোজলিন শহীদ চৌধুরীকে নরসিংদী রায়ঞ্জে, গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়ার ইউএনও ফেরদৌস ওয়াহিদকে ঢাকার সাভারে, ঢাকার ধামরাইয়ের ইউএনও হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকীকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে, গাজীপুর শ্রীপুরের ইউএনও তরিকুল ইসলামকে কিশোরগঞ্জ সদরে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ইউএনও তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদকে ঢাকার ধামরাইয়ে, নরসিংদীর রায়পুরার ইউএনও মো. আজগর হোসেনকে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, সাভারের ইউএনও মো. মাজহারুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে, টাঙ্গাইলের মধুপুরের ইউএনও শামীমা ইয়াসমিনকে গাজীপুরের শ্রীপুরে ও ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইউএনও আজিম উদ্দিনকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বদলি করা হয়েছে।
হবিগঞ্জের বাহবলের ইউএনও মহুয়া শারমিন ফাতেমাকে ওসমানী নগর সিলেটে, আর ওসমানীনগরের ইউএনও নীলিমা রায়হানাকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে, সিলেটের গোয়াইনঘাটের ইউএনও তাহমিলুর রহমানকে হবিগঞ্জের বাহুবলে, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ইউএনও সিদ্ধার্থ ভৌমিককে সিলেটের গোয়াইনঘাটে, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ইউএনও মো. সাজেদুল ইসলামকে সিলেটের জৈন্তাপুর আর জৈন্তাপুরের ইউএনও আল বশিরুল ইসলামকে জগন্নাথপুরে বদলি করা হয়েছে।
ইউএনওদের পর্যায়ক্রমে বদলি এবং পুলিশের সব থানার ওসিকে বদলি করতে ইসির নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে জনপ্রশাসন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে যেসব ইউএনও-ওসি এক বছর এবং ৬ মাস আগে স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীর তদ্বীর করে বদলি হয়েছেন সেই, সব ইউএনও-ওসিরাও বিপাকে পড়েছেন। মাঠ প্রশাসনে যেসব ইউএনও কর্মস্থলে দুই বছর, দেড় বছর এবং ৬ মাস অতিবাহিত করেছেন, তাদের তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়েছে বিভাগীয় কমিশনাররা। ইতোমধ্যে ইউএনওদের তালিকা ইসিতে পাঠানো হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) তালিকাও পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাও ইসিতে পাঠানো হয়েছে। এই তালিকা ধরে ইতোমধ্যে বদলি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে হঠাৎ বদলির কারণে মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের মধ্যে রীতিমতো বদলি আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এই আতংকের কথা ইতোমধ্যে বিভাগীয় কমিশনার এবং ডিআইজিরা সরকারকে জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ডিএমপির ৫৩টি থানার মধ্যে ৩৩টি থানার ওসিদের বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার অতিরিক্ত সচিব ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন এ বিভাগে যেসব ইউএনও এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি কর্মস্থলে ২ দুই বছর, দেড় বছর এবং ৬ মাস অতিবাহিত করেছেন তাদের তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বদলির যে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি), তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা। তারা মনে করছেন, নির্বাচনের মাত্র এক মাস বাকি থাকতে কর্মকর্তাদের গণহারে বদলির এই উদ্যোগ নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিতে পারে। কারণ, ইতোমধ্যে ইউএনও ও ওসিরা গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করার পাশাপাশি নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য কাজ করছেন।

বদলি কার্যকর হওয়ার পর নতুন জায়গাগুলোতে দায়িত্ব বুঝে নিতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ লাগবে। তাই বিষয়টি মাথায় রেখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইউএনওদের নিকটবর্তী জেলাগুলোতে বদলির কথা ভাবছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অন্তত ছয়জন ইউএনও বলেছেন, তারা ভেবেছিলেন যে কিছু কারণে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে অল্প কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা হতে পারে। কিন্তু এমন গণহারে বদলির বিষয়টি তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
ঢাকা বিভাগের একজন ইউএনও বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনারদের বলতে শুনেছি যে নির্বাচনকালে প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হবে না। তাই সব ইউএনও-ওসিদের বদলির নির্দেশে আমি হতবাক হয়েছে। সপ্তাহদুয়েক আগে দুই নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও পুলিশে বড় ধরনের রদবদল হবে না। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় ধরে উপজেলাগুলোতে কর্মরত ইউএনও আর ছয় মাসের বেশি সময় ধরে থানায় দায়িত্বে থাকা ওসিদের বদলির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

চার বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, তারা নিজ নিজ বিভাগের ইউএনওদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন। রাজশাহী বিভাগের একজন ইউএনও বলেন, ইউএনওরা ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন। তাদের নিজ নিজ উপজেলা সম্পর্কে ধারণা আছে। কিন্তু বদলির পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এস এম আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ব্যাপারে সমিতি কোনো মন্তব্য করবে না।
রংপুর বিভাগের একজন পুলিশ সুপার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ওসিদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ আছে। এ ব্যাপারে ঢাকার একটি থানার ওসির বক্তব্য, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো মানে হয় না। এত কর্মকর্তাকে ঝামেলায় ফেলানো ঠিক হবে না। তিনি বলেন, নতুন একজন ওসির ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পরিচিত হতে ও এলাকার রাস্তাঘাট সম্পর্কে ধারণা পেতেও কমপক্ষে এক মাস সময় লাগে। গণবদলির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক সংসদ সদস্য পুনরায় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এ কারণেই।

বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ শনিবার ইসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, সম্প্রতি ঢাকার বাইরে নির্বাচন কমিশনারদের সফরের সময় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইসি সরকারের কাছে ইউএনও ও ওসিদের বদলি চেয়েছে। এই বদলি সরকার চাইল, নাকি নির্বাচন কমিশন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনই চেয়েছে।

×