ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

এক বছর একই স্থানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বদলি শুরু হচ্ছে আজ

ব্যাপক রদবদল ॥ মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনে

তপন বিশ্বাস

প্রকাশিত: ২৩:৪৮, ৪ ডিসেম্বর ২০২৩

ব্যাপক রদবদল ॥ মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনে

মাঠ প্রশাসনে আজ থেকে বড় রদবদল হচ্ছে

মাঠ প্রশাসনে আজ থেকে বড় রদবদল হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ওসি ও ইউএনওদের বদলি করা হবে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা অনুসারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বদলি করছে সরকার। ২০০১ সালের পর কোনো জাতীয় নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে এটিই বড় ধরনের রদবদল। প্রথম পর্যায়ে ওসি ও ইউএনও মিলে ৫৭০ কর্মকর্তাকে বদলি করা হতে পারে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যেসব ইউএনও এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে এক স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন, নির্বাচন কমিশন থেকে চিঠি দিয়ে তাদের বদলি করতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এই চিঠি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আসলে ওই দিনই সকল বিভাগীয় কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে জনপ্রশাসনে পাঠাতে বলা হয়। সকল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এক বছর বা তার বেশি সময় ইউএনও থাকা কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে রবিবার তা জনপ্রশাসনে পাঠানো হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে রবিবারই ইসিকে অবহিত করে। এতে বলা হয়, নির্দেশনা অনুসারে আড়াই শতাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদলিযোগ্য। 
নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) পর্যায়ক্রমে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সাংবিধানিক এ সংস্থাটি ইউএনওদের বদলির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। 
নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মিজানুর রহমানের সই করা চিঠিতে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য সব উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে পর্যায়ক্রমে বদলির জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে যেসব উপজেলা নির্বাহী অফিসার বর্তমান কর্মস্থলে এক বছর বা তার বেশি সময় দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অন্য জেলায় বদলির প্রস্তাব ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করা প্রয়োজন। 
সারাদেশে এখন ৪৯৫টি উপজেলা রয়েছে। ইউএনওদের বদলি ও পদায়নের দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ইউএনও বদলির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা আজ থেকেই বদলি শুরু করব। বিভাগীয় কমিশনাররা প্রস্তাবগুলো পাঠিয়েছেন। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে সেগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন পর্যায়ক্রমে বদলি করতে বলেছে। তারা যেভাবে বলেছেন, আমরা সেভাবেই করব। প্রথম পর্যায়ে এক বছরের বেশি সময় এক স্থানে থাকা ইউএনওদের বদলি করতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। এমন কতজন ইউএনও রয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, হিসাবটা এখনো হচ্ছে। মূলত কাজটা বিভাগীয় কমিশনাররা করছেন। তাদের কাছ থেকে আসবে। আমরা আশা করছি, আজ (সোমবার) রাতের মধ্যে পেয়ে যাব। 
বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কথা বলে জানা গেছে, ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ২৫১টি উপজেলার ইউএনও বর্তমান কর্মস্থলে এক বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি  উপজেলার ইউএনওরা তাদের বর্তমান কর্মস্থলে আছেন এক বছরের কম। তবে ওসিদের মধ্যে কতজন ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। প্রসঙ্গত, ঢাকা বিভাগের ৮৯ উপজেলার ইউএনওর মধ্যে ৫৪ জন এক বছরের বেশি সময় ধরে একই স্থানে কর্মরত আছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের ৩৫ ইউএনওর মধ্যে এক বছরের বেশি সময় এক স্থানে কর্মরত ২৭ জন। বরিশালে ৪২ ইউএনওর মধ্যে ২২ জন, সিলেটে জনের ৪১ জনের মধ্যে ২১, রংপুরে ৫৮ জনের মধ্যে ১৭, রাজশাহীতে ৬৭ জনের মধ্যে ৩১, চট্টগ্রামে ১০৪ জনের মধ্যে ৪৯ এবং খুলনা বিভাগে ৫৯ জনের মধ্যে ১৯ জন এক বছরের বেশি একই স্থানে কর্মরত আছেন বলে মাঠ প্রশাসনের একাধিক ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারের অফিস সূত্রে জানা গেছে।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. শওকত আলী (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাব এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা সেখানে এক বছর, দেড় বছর ও দুই বছর ধরে যেসব ইউএনও দায়িত্ব পালন করছেন তাদের তালিকা দিয়েছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করব।
এদিকে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্দেশনা অনুযায়ী ৩২০ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও ২৫০ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। তিনি বলেন, কমিশনে ৪৭ ইউএনওকে বদলির সুপারিশ এলে তা অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া এ অনুমোদনের মধ্যেই আরও ২০ জনের বদলির চিঠি এসেছে। মোট কতজন ওসি ও ইউএনও বদলি হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যে শর্ত দিয়েছিলাম সে অনুযায়ী ৩২০ জনের মতো ওসি, আর ২৫০ জনের মতো ইউএনও বদলি হতে পারে।
এর আগে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সব থানার ওসিকে ও ইউএনওকে বদলির নির্দেশনা দিয়ে প্রস্তাব পাঠাতে বলে ইসি। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ৪৭ ইউওনকে বদলির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইসির অনুমোদন চাইলে তা দেওয়া হয়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে লতিফুর রহমান প্রথম রাতেই স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসনসহ ১০ সচিবকে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। 
১৯৯৬ সালে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন এনেছিলেন। তবে তা ওভারনাইট বা রাতারাতি ছিল না। তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসনকে আমূল বদলে ফেলেছিলেন। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের পর প্রশাসন বদলে ফেলার এ ধারা আর দেখা যায়নি। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে দীর্ঘ দুই বছর সময় পেয়েছিল ফখরুদ্দিন আহমদের সরকার। এ সময় তিনি প্রশাসন সাজিয়েছিলেন। ২০১৪ বা ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রশাসনে বদল আনার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। তারপরও ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা বিএনপিকে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি সেই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি। 
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তদবির আমলে নেওয়া যাবে না। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ওসিদের বদলি করতে হবে। সাধারণত ওসিদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভালো যোগাযোগ থাকে। তাদের না সরালে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনের আগে এক মাস ধরে ঢাকাসহ সারাদেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বিপুলসংখ্যক পদোন্নতি ও বদলি হয়েছে। নিজেদের পছন্দের স্থানে যেতে নানা উপায়ে তদবিরও করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৬৬১টি থানা আছে। বেশিরভাগ থানায় বছরের পর বছর একই স্থানে ওসির দায়িত্ব পালন করছেন একই ব্যক্তি। তাদের মধ্যে কাউকে বদলি করা হলে কয়েক মাস পর ওপর মহলে তদবির করে তারা আগের থানাতেই চলে আসছেন। সব থানার ওসিদের বদলি করতে নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দেওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে থানার ওসিদের নামের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই বদলির প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কয়েকজন ওসি বলেন, ইসির নির্দেশনা আসার পর তারা আতঙ্কে আছেন। তারা কেউ কেউ পছন্দের থানায় যেতে তদবির করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বলেন, পছন্দের পদ পেতে অনেকেই চেষ্টা-তদবির শুরু করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এ জন্য অর্থ খরচও করছেন বলে অভিযোগ এসেছে। পুলিশের যে কোনো দুর্নীতি প্রতিরোধে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যদিও অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই এক জায়গায় আছেন। রাজনৈতিকসহ নানা কারণে তাদের সরানো যাচ্ছে না। ফলে তারা দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। যে সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের সরানোর সিদ্ধান্ত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, থানার ওসিদের বদলির যে নির্দেশনা এসেছে তা তারা পালন করবেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি নির্দেশ মানতে বাধ্য পুলিশ। সব থানার ওসিদের আমলনামা তৈরি করে দ্রুত তাদের বদলির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বদলির বিকল্প নেই। থানায় যাদের চাকরির বয়স ছয় মাস, তাদের বদলি না করলেই ভালো। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে এক থানায় আছেন, তাদের এক ইউনিট থেকে আরেক ইউনিটে বদলি করলে নির্বাচনের পরিবেশ আরও ভালো হবে।

×