ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আগামীকাল পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী

বাড়ছে করের চাপ ॥ নতুন বাজেট

রহিম শেখ 

প্রকাশিত: ২২:৫৩, ৩০ মে ২০২৩

বাড়ছে করের চাপ ॥ নতুন বাজেট

নতুন অর্থবছরের বাজেটে এবার আয়ের সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে

সরকারের ব্যয়ের ধরন মোটামুটি গতানুগতিক থাকলেও নতুন অর্থবছরের বাজেটে এবার আয়ের সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসছে করের হিসেবে। সহজ করে বললে, রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী বাজেটে করহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। আয় না থাকলেও দিতে হবে ন্যূনতম আয়কর, সেটাও দিতে দেরি করলে জরিমানা হবে দ্বিগুণ। জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স দ্বিগুণ হচ্ছে। এছাড়া ডলার সাশ্রয়ে এবং শুল্ক ফাঁকি রোধে কাজুবাদাম, খেজুরের মতো খাদ্যসামগ্রীর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র, টয়লেট টিস্যু, কলম, মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। মোটাদাগে কর-ভ্যাটের বাড়তি চাপে আগামী বাজেট জীবনযাত্রার খরচ বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।      
আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট করা হচ্ছে ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার। ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’ শীর্ষক বাজেট বক্তব্য দেবেন অর্থমন্ত্রী। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরবেন তিনি। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আড়াই লাখ কোটি টাকা একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও আড়াই লাখ কোটি টাকা।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) প্রবৃদ্ধির হার ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হারের লক্ষ্য থাকবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। নির্বাচনের বছরে বড় বাজেটে থাকছে খরচেরও বিশাল বহর। এ খরচ মেটাতে বিভিন্ন খাতে বাড়তি কর বসিয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রীর, যা বাস্তবায়ন করতে অন্তত ৩৬ শতাংশ হারে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরেই ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যপূরণে হিমশিম খাচ্ছে এনবিআর। রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই ১০ শতাংশের ওপরে তোলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানিকে নিরুৎসাহিত করেছে। এলসি খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি এসেছে, সেটেলমেন্টও কমেছে।

ফলে আমদানি ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় শুল্ক আদায়ও কমে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে ঘাটতির ক্ষেত্রে। বিগত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ঘাটতি থাকবে। যার প্রভাব পড়বে নতুন অর্থবছরের বাজেটে। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল ভ্যাট ও আয়কর থেকে এনবিআরের আরও বেশি রাজস্ব আদায় হবে। সেটা হয়নি। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে পূরণ হয় না, সেখানে আগামী অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা কিভাবে অর্জিত হবে, সেটি অবশ্যই চিন্তার কারণ।  
প্রতিবছর বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে এনবিআর পণ্যের শুল্ককর ও ভ্যাট হ্রাস-বৃদ্ধি করে থাকে। এতে বাজারে ওইসব পণ্যের দাম বাড়ে-কমে। কর আদায় বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে বাজেটে নিত্যব্যবহার্য বেশ কয়েকটি পণ্যের করহার বাড়ানো হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক কারণেই সেসব পণ্যের দাম বাড়বে। আবার কিছু পণ্যের কর কমানো হচ্ছে, যদিও সেই তালিকা একেবারেই ছোট। জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এনবিআরের সক্ষমতা বিবেচনায় আগামী বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়।

এ লক্ষ্যের ধারেকাছেও এনবিআর যেতে পারবে না। কারণ এখনো সংস্থাটিতে গুণগত পরিবর্তন আনা হয়নি।  তিনি  বলেন, রাজস্বের লক্ষ্য পূরণে এনবিআর সব সময় সহজে কর আদায়ের (ইজি ট্যাক্স কালেকশন) পন্থা অবলম্বন করে। যেমন সিগারেটের ভ্যাট বাড়িয়ে বা যেসব পণ্যে ভ্যাট আছে সেসব পণ্যের ভ্যাট বাড়িয়ে বা যারা কর দিচ্ছে তাদের ওপর কর হার বাড়িয়ে। পণ্যের ভ্যাট বাড়ালে স্বভাবতই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। করজাল বৃদ্ধিতে এনবিআরের তেমন নজর লক্ষ্য করা যায় না।  
এনবিআর সূত্র জানায়, আসছে বাজেটে ধনীদের ছাড় দিয়ে নিম্নআয়ের মানুষকে করজালের মধ্যে আনার ছক থাকছে বাজেটে। কারণ শূন্য আয় (করযোগ্য সীমার নিচে বার্ষিক আয়) দেখিয়ে আগে রিটার্ন জমা দেওয়া গেলেও আগামী দিনে স্লিপ (প্রাপ্তি স্বীকারপত্র) পেতে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর রিটার্ন জমার স্লিপ না নিলে সঞ্চয়পত্র কেনা এবং ব্যাংক ঋণ নেওয়া যাবে না। ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস নবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, বাড়ির নক্সা অনুমোদনসহ সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি ৪৪ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এটা স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। জানা যায়, অন্তত ৮ লাখ করদাতার করযোগ্য আয় নেই। তাদের কাছ থেকে নতুন অর্থবছরে ১৬০ কোটি টাকার বাড়তি কর আদায়ের চিন্তা নতুন বাজেটে। নতুন অর্থবছরে দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে এর জন্য দ্বিগুণ হারে জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। আসছে অর্থবছরে তা দিতে হবে ৪ শতাংশ হারে। এছাড়া জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স দ্বিগুণ হচ্ছে। ঢাকায় রাজউক ও চট্টগ্রামের সিডিএর আওতায় জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধনে গেইন ট্যাক্স ৪ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ করা হচ্ছে। আর দেশের অন্য এলাকার ক্ষেত্রে তা ৩ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ হচ্ছে। 
এনবিআর সূত্র জানায়, বর্তমানে গৃহস্থালি সামগ্রীর ক্ষেত্রে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, এটি বাড়িয়ে নতুন বাজেটে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। একই হারে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী ও তৈজসপত্রের (হাঁড়িপাতিল, থালাবাসন) ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। কিচেন টাওয়াল, টয়লেট টিসু, ন্যাপকিন টিসু, ফেসিয়াল টিসু/পকেট টিসু ও পেপার টাওয়াল উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, এটি বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে টিসু পেপারের দাম বাড়তে পারে।

এছাড়া শুল্ক ফাঁকি রোধে বাজেটে সব ধরনের ওভেন আমদানির শুল্ক ৩০ শতাংশ বাড়াচ্ছে, মোট করভার ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ করছে। এতে বিদেশী ওভেনের দাম বাড়তে পারে। যদিও দেশে ওভেন উৎপাদনের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া আছে, তাই আগামী দিনে দেশি ওভেন ব্যবহারের চিন্তা করলে খরচ কমবে। এছাড়া সারাদেশে রান্নার কাজে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়। বাজেটে সিলিন্ডার উৎপাদনে ব্যবহৃত স্টিল ও ওয়েল্ডিং ওয়্যার আমদানিতে শুল্ক আরোপ এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। এতে বাজারে সিলিন্ডারের দাম বাড়তে পারে। 
এছাড়া বিরিয়ানি-তেহারির প্রধান উপকরণ বাসমতি চাল আমদানিতে ভ্যাট বসানো হচ্ছে। এতে চালের দাম বাড়তে পারে। সুস্বাস্থ্যের জন্য বাদাম-খেজুর খান অনেকে। বাজেটে তাজা ও শুকনা খেজুর আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। মূলত শুল্ক ফাঁকি রোধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দেশে বাদাম চাষকে উৎসাহিত করতে কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৩ শতাংশ করা হচ্ছে। তাই আমদানি করা কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফল ও বাদামের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে বিধায় ফল ও বাদামের দাম বাড়তে পারে। 
জানা গেছে, নতুন বাজেটে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ানো হচ্ছে। নি¤œস্তরের এক প্যাকেট (২০ শলাকার) সিগারেটের (হলিউড, ডার্বি) দাম ৯০ টাকা, মধ্যমস্তরের (স্টার, নেভি) ১৩৪, উচ্চস্তরের (গোল্ডলিফ) ২২৬ এবং অতি উচ্চস্তরের (বেনসন, মালবোরো) সিগারেটের দাম ৩০০ টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে জর্দা-গুলের দামও। বিড়ির দাম অপরিবর্তিত থাকবে। প্রতিবছর মোবাইল ফোন পাল্টানো ফ্যাশনের অংশ, যা শখে পরিণত হয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে আইএমএফ’র পরামর্শে মোবাইল ফোনকে বিলাসী পণ্য বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি আছে, সেখানে ২ শতাংশ ভ্যাট বসানো হচ্ছে।

আর সংযোজন পর্যায়ে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে মোবাইল ফোনের দাম বাড়তে পারে। এছাড়া বাচ্চার জন্য কলম কেনার খরচও বাড়বে। কলম উৎপাদনে বর্তমানে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে, সেখানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হচ্ছে। এতে কলমের দাম বাড়তে পারে। চশমার ফ্রেম ও সানগ্লাস আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। সাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। সিরিজ কাগজ আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে।

আসন্ন বাজেট বাড়ি নির্মাণেরও খরচ বাড়বে। বাড়ি নির্মাণের প্রধান উপকরণ সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে বর্তমানে টনপ্রতি ৫০০ টাকা শুল্ক আছে, এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। এ কারণে সিমেন্টের দাম বাড়তে পারে। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বিদেশী টাইলস আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এ কারণে বিদেশী টাইলসের দাম বাড়তে পারে। অবশ্য কমার তালিকা একেবারেই ছোট। মিষ্টির দাম কমতে পারে। কারণ মিষ্টির ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া আরও কিছু পণ্যের ভ্যাট কমানো হচ্ছে।

×