ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০

মৃতের সংখ্যা ২৭শ’ ৬২ ছাড়িয়েছে, তুরস্কে জরুরি অবস্থা, ৭ দিনের শোক, ১০ শহরের স্কুল বন্ধ

ভয়াবহ ভূমিকম্প ॥ তুরস্ক ও সিরিয়ায়

জনকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২:০৬, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

ভয়াবহ ভূমিকম্প ॥ তুরস্ক ও সিরিয়ায়

ভূমিকম্পে তুরস্কে একটি ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে

স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত তুরস্ক ও সিরিয়া। সোমবার ভোর ও দুপুরের দুই দফা ভূমিকম্পে ২ হাজার ৭৬২ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে তুরস্কে নিহত হয় ১ হাজার ৭৬২ ও সিরিয়ায় ১০০০ জন। রিখটার স্কেলে প্রথম দফায় আঘাত হানা ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৮ ও দ্বিতীয় দফায় ৭.৫। অনেক মানুষ ধসে যাওয়া হাজার হাজার ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছে। ফলে মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি, এএফপি ও আলজাজিরার।
তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গাজিয়ানতেপের কাছে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পটিতে প্রতিবেশী সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, গ্রিনল্যান্ড এবং সাইপ্রাসও কেঁপে ওঠে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, সোমবার প্রথমে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে ও দ্বিতীয় দফায় দুপুর ১টা ২৪ মিনিটে ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের কারণে তুরস্কে জরুরি অবস্থা জারি ও ৭ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবন থেকে প্রতি ১০ মিনিটে একটি করে মরদেহ বের করে আনা হচ্ছে। তুরস্কের ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি শহরের সব স্কুল এক সপ্তাহ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 
অন্যদিকে তুরস্কসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা। শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনসহ বিশ্ব নেতারাও তুরস্ককে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। তুরস্ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে উদ্ধারকারীদের পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়ে সহায়তা করতে জনসাধারণকে মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রচ- শীতের মধ্যে তুষারে ঢাকা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়। প্রবল ঝাঁকুনিতে বহু ভবন ধসে পড়েছে, সেসব ধ্বংসস্তূপে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন। 
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেইমান সোইলু জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে গাজিয়ানতেপ, কাহরামানমারাস, হতাই, ওসমানিয়ে, আদিয়ামান, মালাটিয়া, সানলিউরফা, আদানা, দিয়ারবাকির ও কিলিস এই ১০টি শহর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যমে আসা ছবিতে দেখা গেছে, কাহরামানমারাস শহরে ধসেপড়া ভবনগুলোর চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে জীবিতদের খোঁজ করছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হতাহতদের অধিকাংশই আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হামা ও তারতুস প্রদেশের বাসিন্দা। সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর লাতাকিয়া থেকে শুরু করে ভূমিকম্পটি দক্ষিণে রাজধানী দামেস্ক পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আলেপ্পো প্রদেশে বহু ভবন ধসে পড়েছে বলে জানিয়েছে। দেশটির হামা প্রদেশের বেসামরিক পরিষেবা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানেও বেশকিছু ভবন ধসে পড়েছে। 
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, লেবাননের রাজধানী বৈরুত এবং বন্দর শহর ত্রিপোলিতে ভূমিকম্পের কারণে লোকজন দৌড়ে রাস্তায় বের হয়ে যায়, তাদের ভবনগুলো ধসে পড়তে পারে আশঙ্কায় কেউ কেউ নিজেদের গাড়ি সেখান থেকে সরিয়ে নেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। উভয় দেশে শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের রক্ষা করতে উদ্ধারকারীরা কাজ শুরু করেছেন। এদিকে ভূমিকম্পের পর বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার কাজ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুসারে, সোমবার ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে ১৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্প হয়। এর ফলে অঞ্চলজুড়ে ভবন ধসে পড়ে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভূমিকম্প এতই শক্তিশালী ছিল যে সাইপ্রাস ও লেবাননেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে উদ্ধার কাজ পরিচালনায় বাধা দিচ্ছে বিরূপ আবহাওয়া। উদ্ধার কাজ অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 
এ অবস্থায় ভুক্তভোগী দেশ দুটির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে গোটা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তুরস্ক-সিরিয়ায় যে কোনো ধরনের সহায়তার জন্য তারা প্রস্তুত। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান এক বিবৃতিতে বলেন, তুরস্ক ও সিরিয়ায় আজকের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের খবরে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, আমরা যে কোনো ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার জন্য ইউএসএআইডি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অন্য অংশীদারদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ইউরোপীয় কমিশনার জেনেজ লেনারসিক টুইটারে বলেছেন, নেদারল্যান্ডস এবং রোমানিয়ার উদ্ধারকারী দলগুলো এরই মধ্যে রওয়ানা দিয়েছে। ইইউর ইমার্জেন্সি রেসপন্স কোঅর্ডিনেশন সেন্টার তাদের তদারকি করছে। ভুক্তভোগী তুরস্ক ও সিরিয়াকে প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। দুটি দেশই রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত। 
সোমবার রুশ প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে পাঠানো বার্তায় পুতিন বলেছেন, আপনার দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অসংখ্য মানুষ হতাহত এবং বড় ধ্বংসযজ্ঞের জন্য আমার গভীর সমবেদনা গ্রহণ করুন। সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে পাঠানো পৃথক বার্তায় তিনি বলেন, যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের দুঃখ ও বেদনা ভাগাভাগি এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য করতে প্রস্তুত রাশিয়া। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, তার দেশ তুরস্ক ও সিরিয়াকে জরুরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এক টুইটে তিনি বলেন, অভূতপূর্ব শক্তির ভূমিকম্পের পর আমরা তুরস্ক এবং সিরিয়ায় ভয়ানক চিত্র দেখছি। সেখানে জরুরি ত্রাণ সরবরাহ করতে প্রস্তুত ফ্রান্স। এছাড়া, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত তুরস্ক-সিরিয়াকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে আজারবাইজান, ইসরাইল, জার্মানির মতো দেশগুলোও।
জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের পর এটাই তুরস্কে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ধারণা করা হচ্ছে, ধসেপড়া ভবনগুলোতে অসংখ্য মানুষ আটকা পড়েছে। কর্মীরা ধ্বসংস্তূপের মধ্য থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধারে তৎপরতা জোরালো করেছে। ১৯৯৯ সালের আগস্টে সাত দশমিক ছয় মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প তুরস্কের দক্ষিণে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল মারমারায় আঘাত হানে। ওই ভূমিকম্পে সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ নিহত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের শহর দুজসেতে সাত দশমিক দুই মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওই ঘটনায় মারা যায় ৮৪৫ জন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তুরস্কে ভূমিকম্প হয়। কিন্তু সেগুলো এত বিধ্বংসী ছিল না। তাই মাত্রার দিক থেকে এবারের ভূমিকম্পটি তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী। এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
তুরস্কে ৭ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা ॥ বিবিসি জানায়, তুরস্কে স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে হতাহতের স্মরণে সাতদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। স্থানীয় সময় সোমবার রাতে এক টুইটবার্তায় তিনি এ ঘোষণা দেন।

×