ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

সাংবাদিকদের জানালেন কৃষিমন্ত্রী

আমরা একটু কষ্ট করি তারপরও ডিম আমদানি করব না

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:৫৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

আমরা একটু কষ্ট করি তারপরও ডিম আমদানি করব না

ডিম

ডিম আমদানির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, কোন অবস্থাতেই দেশে ডিম আমদানি করা হবে না। বরং তিনি দেশবাসীকে একটু কষ্ট করার অনুরোধ জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে কৃষিমন্ত্রী তার দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমরা একটু কষ্ট করি তারপরও ডিম আমদানি করব না।’ এ সময় সার পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে চাহিদার প্রায় চারগুণ টিএসপি ও ডিএপি সার মজুদ রয়েছে। এছাড়া চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ মজুদ রয়েছে ইউরিয়া ও এমওপি।
নতুন করে ডিমের দাম বাড়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দাম চাহিদার ওপর নির্ভর করে। তবে একজন কৃষিবিদ হিসেবে বলতে পারি যাই দাম বৃদ্ধি পাক দুই-তিন মাস পর আমি লিখে দিতে পারি ডিম তারা বেচতেই পারবে না। এটা নিয়ে আমাদের কোন সমস্যা নেই।
এর আগে ডিমের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন প্রয়োজনে ডিম আমদানি করা হবে। এরপরই ডিমের দাম কমে যায়। এতে বিষয়টি স্পষ্ট যে ডিমের দাম বাড়ার পেছনে কিছু একটা আছে। সাংবাদিকদের এমন আরেক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, কোনক্রমেই যেন ডিম আমদানি করা না হয়।
কীসের ভিত্তিতে বলছেন দুই-তিন মাস পর ডিম বিক্রি করতে পারবে না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, যখন দাম বাড়ছে সবাই বাচ্চা তুলছে। কয়েকদিন আগেই ডিম বিক্রি করতে পারছিল না, আবার ব্রয়লার মুরগি ৯০-১০০ টাকা। গত তিন বছর ধরে এটা চলছে। পোল্ট্রি ফার্মের মালিকরা লস দিতে দিতে আর লস করতে রাজি না।
এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেয়ার কথা বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বলেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর পরিপেক্ষিতে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোন আলোচনা হয়নি। অসহযোগিতার কিছু নেই। তবে আমি আবারও বলছি নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে বাস্তবায়ন করা কঠিন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটা বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে কাঁচাপণ্য চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে।
চাহিদার অতিরিক্ত সার মজুদ ॥ দেশে চাহিদার প্রায় চারগুণ টিএসপি ও ডিএপি সার মজুদ রয়েছে। এছাড়া চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ মজুদ রয়েছে ইউরিয়া ও এমওপি। চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ইউরিয়া সারের চাহিদা থাকে তিন লাখ ৫০ হাজার টন। সেখানে বর্তমানে মজুদ আছে ছয় লাখ ৫৩ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ ইউরিয়া আছে। এমনকি মজুদের পরিমাণ গতবছরের তুলনায় বেশি। গতবছরের একই সময়ে মজুদ ছিল পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার টন।
মন্ত্রী জানান, দেশে টিএসপির চাহিদা ৯৬ হাজার টন। এর বিপরীতে চার লাখ ৯৪ হাজার টন টিএসপি মজুদ আছে। গতবছরের একই সময়ে মজুদ ছিল তিন লাখ ৬৭ হাজার টন। আর বর্তমানে ডিএপি মজুদ আছে নয় লাখ ৪৭ হাজার টন। এ সারের চাহিদা দুই লাখ ১৯ হাজার টন। গতবছর ডিএপি মজুদ ছিল সাত লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ এই দুই ধরনের সার চাহিদার প্রায় চারগুণ মজুদ রয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে এমওপি সার মজুদ আছে দুই লাখ ৬৮ হাজার টন। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এই সারের চাহিদা থাকে এক লাখ ২১ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার দ্বিগুণের বেশি এমওপি মজুদ আছে। এমনকি এই মজুদের পরিমাণ গতবছরের তুলনায় বেশি। গতবছরের একই সময়ে এই সারের মজুদ ছিল এক লাখ ৮৯ হাজার টন। কৃষিমন্ত্রী বলেন, সার নিয়ে আমরাও দুশ্চিন্তায় আছি। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি অস্বাভাবিক না হলে সারের কোন সমস্যা হবে না। আগামী বোরো মৌসুমে আমাদের পর্যাপ্ত সারের দরকার। সেই সারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, প্রায় দুই-আড়াই বছর মহামারী এবং পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই দুটি মিলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কৃষির বিভিন্ন উপকরণ ও সার-কেমিক্যালের দাম বেড়েছে। যেমন প্রতি টন পটাশিয়াম ৩০০ ডলার হওয়ার কথা, সেটা আমরা এক হাজার ২০০ ডলারেও কিনেছি। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা কমে এখনও প্রায় ৯০০ ডলারের কাছাকাছি। যেটা ৩০০ ডলার, সেটা কীভাবে ৯০০ ডলারে এফোর্ড করা সম্ভব ? আমাদের মতো ছোট দেশ, গরিব দেশ।
তিনি আরও বলেন, ৬০০ ডলারের একটা কন্টেনার এখন এক হাজার ৮০০ ডলার লাগে। গমের দাম সাধারণত থাকে আড়াই শ’ ডলারের কাছাকাছি। গত ক্রয় কমিটিতে প্রায় ৫০০ ডলারের কাছাকাছি গম কেনার অনুমোদন দিতে হয়েছে। যখন গমের দাম বেশি থাকে তখন মানুষ চালের দিকে ঝুঁকে। আয় অনুযায়ী মানুষ একটু সমন্বয় করে। সবাই না, কম আয়ের মানুষ। আর এখন মানুষের গম খাওয়ার দিকে একটা ঝোঁকও আছে।
ইউরিয়া সার ব্যবহার কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন, কিন্তু দেখা গেল আরও বেশি করে আমদানির অনুমতি দেয়া হচ্ছে- সাংবাদিকের এমন এক প্রশ্নে কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি ইউরিয়ার ব্যবহার কমিয়ে ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়ানোর। ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়ছে ঠিকই ১৫-১৬ লাখ টন। কিন্তু সরকারকে এখানে ভর্তুকি দিতে হয়। আমরা ১৬ টাকায় দিচ্ছি অথচ বাজারে ১৪০ টাকা। আর ইউরিয়াতে প্রতি কেজিতে ৬০ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছি। প্রত্যেকটা সারে এ রকম ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা চাচ্ছিলাম ইউরিয়ার ব্যবহার কমাতে। কিন্তু ইউরিয়া দিলে গাছ ভাল হয় এতে চাষী মনে করে ফলন ভাল হবে। আসলে এমনটা হয় না। ধানে ইউরিয়া বেশি ব্যবহার হলে চিটা বেশি হয়। আর ডিএপি ব্যবহারে গাছের রোগ-জীবাণু কম হয়। গাছ শক্ত হয়, পটাশিয়াম বেশি পায়।
মন্ত্রী আরও বলেন, কিন্তু আমাদের চাষীদের একটা প্রবণতা হলো, রাতের অন্ধকারে হলেও ইউরিয়া দেবেন। এ ক্ষেত্রে আমরা সফল হই নাই। যারা আমাদের মাঠকর্মী তাদের নির্দেশ দিয়েছি বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। চাষীদের ইউরিয়া ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
আমন ধান নিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমাদের আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। কারণ বিলের বীজতলায় বৃষ্টি না হওয়াতে নিচু এলাকাতেও ধানের চারা বপন করতে পেরেছি। এর পাশাপাশি একটা সমস্যাও আছে বৃষ্টি না হওয়ায় চারা বৃদ্ধি পাচ্ছিল না। এখন বৃষ্টি হচ্ছে ফলে আমন দাঁড়িয়ে গেছে।