ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯

সংস্কৃতি সংবাদ

মুর্তজা বশীরের জন্মদিন উদ্যাপনে বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৩৮, ১৭ আগস্ট ২০২২

মুর্তজা বশীরের জন্মদিন উদ্যাপনে বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী

মুর্তজা বশীরের জন্মদিন উদ্যাপনে বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী

আমি জীবনভর চেষ্টা করেছি; এখন কী পেলাম সেটি আমার কাছে কিছু নামৃত্যুর পর বেঁচে থাকব কি না, সেটি হলো আমার সাধনাআপমি বিশ্বাস করি, এখন কী পেলাম সেটি বড় কথা নয়চিত্রকলা হোক, সাহিত্য হোক- সময়কে অতিক্রম করে কেউ যদি সৃষ্টি করতে না পারেন, সেটি লাইফটাইম এ্যাচিভমেন্ট হবে নামানুষ হারতে পারে, কিন্তু ধ্বংস হবে নামৃত্যুর পর আপন সৃজনে-কর্মে এভাবেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন পথিকৃ চিত্রশিল্পী ও ভাষাসংগ্রামী মুর্তজা বশীরতার সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে

শরীরী অস্তিত্ব না থাকলেও আপন সৃষ্টির আলোয় দীপ্তিমান বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটিচিত্রকলা থেকে লেখালেখির ভুবনে রেখেছেন অনন্য কীর্তির স্বাক্ষরবুধবার ছিল প্রয়াত এই শিল্পীর ৯০তম জন্মদিনশিল্পের আলোয় ভিন্নভাবে উদ্যাপিত হলো দিনটিতাই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে অনানুষ্ঠানিক আয়োজনটিও হয়ে ওঠে অনন্যএই চিত্রশিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম, তারুণ্য থেকে বার্ধক্যের নানা সময়ের আত্মপ্রতিকৃতি, তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রিত চিত্রিকর্মসহ অটোগ্রাফ খাতা, সুলতানী আমলের কয়েন, নানা ধাতুতে গড়া আংটিসহ শিল্পীর সংগ্রহের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে সজ্জিত হয়েছে প্রদর্শনীটিফার্মগেটের মণিপুরীপাড়ার বাসভবনে ভিন্নধর্মী প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে মুর্তজা বশীর ট্রাস্ট। 

অনাড়ম্বর এ আয়োজনে এসে উপস্থিত হন মুর্তজা বশীরের বোন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান, স্থপতি আবদুল্লাহ খালিদের স্ত্রী কুলসুম খালিদ, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন প্রমুখপরিবারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন শিল্পীর দুই মেয়ে মুনীরা বশীর ও মুনিজা বশীর

এছাড়াও মুর্তজা বশীরের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত শুভাকাক্সক্ষীদের অনেকেই সমবেত হয়েছিলেন অনানুষ্ঠানিক জন্মদিন উদ্যাপনের এ আয়োজনেস্মৃতিচারণের পাশাপাশি শিল্পীর বর্ণিল জীবনের মূল্যায়ন করেন তারাএ আয়োজনে বাংলাদেশ ম্যাচ বক্স কালেক্টরস ক্লাবের উদ্যোগে পোস্ট অফিস থেকে প্রকাশিত মুর্তজা বশীরের ছবিসংবলিত স্মারক খাম তুলে দেয়া হয় তার দুই মেয়ের হাতেস্মারক খামটি তুলে দেন দিয়াশলাই সংগ্রাহক সাকিল হক

মতিউর রহমান বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনীতিবিদদের অবদান অনস্বীকার্যতবে রাজনীতিবিদদের বাইরে শিল্পীরাও দেশের আন্দোলনে বড় ভূমিকা পালন করেছেনমুর্তজা বশীর সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকরা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতমঅন্যদিকে দেশে বহুমুখী প্রতিভাধর অনেকেই আছেনশিল্পীদের মধ্যেও অনেকেই বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেনএই বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বদের মধ্যে মুর্তজা বশীর শ্রেষ্ঠতম

নাসির আলী মামুন বলেন, মুর্তজা বশীর প্রয়াত হননিতিনি এই বাড়ির দেয়ালে, কার্নিসে, নিজের পোর্ট্রেটের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে আছেনতার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেনআমাদের এখানকার গুণী মানুষেরা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সবকিছু নিয়ে চলে যানএক্ষেত্রে মুর্তজা বশীর ব্যতিক্রমতিনি সবকিছু গুছিয়ে রেখে গেছেনসেগুলো মানুষের সামনে নিয়ে আসার যে দায়িত্ব তাঁর পরিবার নিয়েছে, আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ

মাহবুবুর রহমান বলেন, মুর্তজা বশীরের মৃত্যুর পর বেঁচে থাকার যে অন্বেষণ ছিল তাতে তিনি সফল হয়েছেনতাঁর কাজ ও সংগ্রহের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন

লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, বাবার বন্ধু ছিলেন মুর্তজা বশীরসেই সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তাকে চিনিতবে তিনি যে এত বড়মাপের একজন শিল্পী- সেই ছেলেবেলায় জানতাম নাতিনি একজন সার্থক শিল্পীতিনি জীবনে যা কিছু করতে চেয়েছেন, তাই করতে পেরেছেনআর এভাবে জীবনটাকে উদ্্যাপন করেছেন

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ১৯৫৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মুর্তজা বশীরে আঁকা ১২০টি আত্মপ্রতিকৃতিসেখানে নানা বয়সে, সময়ে ও পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে মেলে ধরেছেন নিজেকেসঙ্গে রয়েছে স্ত্রী আমিনা বশীরের ১২টি প্রতিকৃতিএর বাইরে রয়েছে পেইন্টিং, ড্রইং, লিথোগ্রাফি, কালি ও কলমের কাজআরো রয়েছে দুই মেয়ের প্রতিকৃতিতার বিভিন্ন সময়ের নেয়া সাক্ষাতকারের ভিডিও চিত্রআছে পাথর ভেঙ্গে গড়া ভাস্কর্য

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আঁকা ছবি এপিটাফ অব মার্টিয়াররয়েছে তার নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র চশমা থেকে টোব্যাকো পাইপএছাড়াও তার সংগৃহীত চাবির রিং, সুলতানী আমলের মাটির মুদ্রাসহ বিভিন সময় ও কালের সাক্ষ্যবহ কয়েন, অটোগ্রাফ বই, আলোকচিত্র, স্ট্যাম্প, নানা ধাতুতে গড়া রকমারি আংটি, তার রচিত গ্রন্থসহ নানা কিছু

আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনীপ্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আগ্রহী দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে প্রদর্শনীঠিকানাটি হচ্ছে ফ্ল্যাট ৭/বি, শেলটেক মণিহার, ১৫৪/১ মণিপুরীপাড়া, ফার্মগেট