ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

আমার মা

শেখ হাসিনা এমপি

প্রকাশিত: ০০:০৯, ৮ আগস্ট ২০২২; আপডেট: ১১:২৮, ৮ আগস্ট ২০২২

আমার মা

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা’র পোট্রেট

বুকে পাথর চেপে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে

হাসিমুখে সকল সমস্যা

সমাধানে ব্যস্ত হয়ে উঠা,

এইতো আমার মা- আমার মা রেণু

(শেখ রেহানা, লন্ডন, ৮ আগস্ট ২০০৮)

 

রেণু! ফুলের রেণুর মতোই গায়ের রংমাথায় ঘন-কালো একরাশ চুলঅপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারিণী আমার মায়ের জীবনপ্রদীপ মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে নিভে গেলআমার আব্বার সঙ্গে চলে গেলেন না-ফেরার দেশেকিন্তু কেন? কেন? কেন?

আমরা দুুই বোনÑ রেহানা এবং আমিÑ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরি আজওকিন্তু কে আমাদের দেবে এর উত্তর?

আমার আব্বা যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, রাষ্ট্রপতি ছিলেন, আমাদের বাসায় আত্মীয়স্বজন ছাড়াও দলের লোকজন, সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তাদের যাতায়াত ছিল অহরহআমার মা সকলকেই আপ্যায়ন করাতেন, কেউ খালি মুখে ফিরে যেতেন নাআমার মা সাধাসিধে জীবনযাপন করতেনদেশের ফার্স্ট লেডি ছিলেন তিনিএ নিয়ে তিনি কোনোদিন কোনো রকম গর্ব দেখাননি বা এটা নিয়ে তাঁর কোনো অহমিকা ছিল নাতিনি ছিলেন কারও আপা, কারও ভাবি, চাচি, মামি, খালা, ফুপুÑ যে যেমন সম্পর্কের, তেমনি তাঁকে সম্বোধন করতেন এবং হাসিমুখে সবই মেনে নিতেন

গরিব আত্মীয়স্বজন বা দলের নেতা-কর্মীদের ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ের ব্যবস্থা, রোগে চিকিসার ব্যবস্থাÑ এসবই তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতেন১৯৫৪ সালে মিন্টো রোডের সরকারি বাড়ি থেকে চলে এসে আমরা পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার লেনের একটা বাড়িতে থাকতামতখন রেহানা এবং রাসেলের জš§ হয়নিআমরা তখন তিন ভাইবোনÑ ছোট দুই ভাই কামাল, জামাল আর আমিতখনও দেখেছি ওই বাড়ি থেকে আওয়ামী লীগের বহু নেতার বিয়ের আয়োজন মা করে দিতেনবিয়ের সাজে বরযাত্রী সাজিয়ে দিতেনএমনকি বউবরণ করা অথবা কনে দেখাÑ সব দায়িত্ব একান্ত আপনজনের মতো আমার মা পালন করতেনযখন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ছুটি হতো অথবা সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাড়িতে ভালো-মন্দ রান্না হতো আমাদের আত্মীয়স্বজন যারা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতেন তাঁরা বন্ধুদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হতেন, খাবার খেয়ে যেতেনআমার মা হাসিমুখে সকলকে আপ্যায়ন করতেন

আমার আব্বা যখন কারাগারে বন্দি থাকতেন, আমাদের চরম দুঃসময় শুরু হতোকিন্তু আমার মা কখনই ভেঙে পড়তেন নাকখনও হতাশ হতে দেখিনি তাঁর চোখেমুখেসবকিছু নীরবে সহ্য করতেনআব্বার মামলা-মোকদ্দমা, দলের কাজ, নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া, অনেক নেতার বাড়িতে বাজারের টাকা পৌঁছে দেওয়াÑ সবই করতেন

আত্মীয়স্বজন অথবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অসুস্থ হলে চিকিসার ব্যবস্থা করতেন, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করাতেন, নিজে তাঁদের হাসপাতালে দেখতে যেতেনহাতে টাকা না থাকলে নিজের গহনা বিক্রি করে তিনি দল চালাতেন, ছাত্রদের সাহায্য করতেনআব্বার মামলা-মোকদ্দমা, আন্দোলন-সংগ্রাম সবই তিনি পর্দার আড়ালে থেকেই করেছেন

আমার নানা ও নানি মারা যাবার পর তাঁদের সব সম্পত্তি আমার মায়ের দাদা খালা ও মাকে লিখে দিয়ে যানআমার দাদাই দেখাশোনা করতেন মায়ের বিশাল সম্পত্তিসেখান থেকে যা টাকা পয়সা আসতো তা দিয়ে চলতে চেষ্টা করতেনসেই সঙ্গে আব্বার অনেক বন্ধু-বান্ধব সহযোগিতা করতেনআমার দাদাও বাড়ি থেকে চাল, ডাল ইত্যাদি পাঠাতেনমা কখনও নিজের জন্য কিছু ব্যয় করতেন না

আব্বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতেনমা সে বিষয়টা খুব ভালোভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে উপলব্ধি করতেনতাই তিনি চাইতেন আব্বা যেন তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেন, একনিষ্ঠভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারেনসব সময় পাশে থেকে তিনি প্রেরণা দিয়েছেন আর সংসারে সকল বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন

আব্বার কাপড়-চোপড়, জুতো-স্যান্ডেল যা যা প্রয়োজন সবকিছু মা নিজের হাতে গোছাতেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেনআমার আব্বাকে কখনও কোনো প্রয়োজনে বিরক্ত করতেন না, বরং এ কথা বলতেন: সংসারের চিন্তা তোমার করতে হবে না, ওটা আমি সামলাবতুমি দেশের জন্য কাজ করছো, দেশের মানুষের জন্য কাজ করছোÑ তাই করোআব্বা চাইতেন বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবন পাবেতাই স্বাধীনতা একান্তভাবে প্রয়োজনআমার মা এই আদর্শ ধারণ করেছিলেনআব্বা যেমন এদেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালবাসতেন, মা-ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন

 

আমার মা ছোটবেলা তাঁর বাবা-মাকে হারানছোট্ট রেণুকে তাঁর দাদা বিয়ে দেনএরপর থেকে আমার দাদির কাছেই তিনি বেড়ে ওঠেনছোট্ট রেণু যখন তাঁর বাবার জন্য কান্নাকাটি করতো, তখন আমার দাদি বলতেনÑ আমি তোর বাবাতাই দাদিকেই তিনি বাপবলে ডাকতেনসব বাচ্চাই কিন্তু নিজের আপনজনকে ডাকার জন্য তারা একটা নাম ঠিক করে নেয়তাই দাদিকে বাপবলেই আমার মা ডাকতেনমা বই পড়তে ও গান শুনতে খুব ভালবাসতেন

আমার আব্বা জেলের বাইরে থাকলে বারট্রান্ড রাসেলের বই পড়ে বাংলা তরজমা করে আমার মাকে শোনাতেনতাই তো আমার ছোট ভাইটি জš§াবার পর মা তার নাম রেখেছিলেন রাসেলআমি, কামাল, জামাল টুঙ্গিপাড়ায় জš§গ্রহণ করি আর রেহানা ও রাসেল ঢাকায় জš§গ্রহণ করেআমরা পাঁচটা ভাইবোন যখন জš§গ্রহণ করি আমার আব্বা কখনই আমার মায়ের পাশে ছিলেন নাসব সময় কাজে ব্যস্ত ছিলেনকিন্তু তাই বলে আমার মা কখনও এ নিয়ে অভিযোগ করেননি বা অভিমানও করেননিআমার আব্বার আদর্শকে তিনি এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁর সকল কাজে তিনি সহযোগিতা করতেন

আমরা যদি আমার মায়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিকটা দেখি তখন দেখতে পাই সেখানেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে টুঙ্গিপাড়ায় সকলে এক সঙ্গে কাজ করেআমার মা-ও সে নির্বাচনের সময় রান্নাবান্না করা, মানুষকে আপ্যায়ন করা ইত্যাদি নানা কাজে আমার দাদিকে সহযোগিতা করেছেনআব্বা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আমার মা ১৯৫৪ সালে ঢাকায় আসলেন এক বুক আশা নিয়ে সংসার করবেন বলেআব্বা মন্ত্রী হলেনআমরা মিন্টো রোডের বাড়িতে উঠলামমাত্র কয়েকদিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিলআমার আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলআমার মায়ের স্বপ্ন ভেঙে গেলআমরা নাজিরা বাজারের বাসায় উঠলাম

১৯৫৫ সালে আব্বা পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হলেনহোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেনআব্বা আবার মন্ত্রী হলেন১৫ নম্বর আব্দুল গনি রোডের মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত বাসায় আমরা উঠলাম১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন আমার আব্বাআমার মা কিন্তু কোনো অভিযোগ বা অভিমান করেননিহাসিমুখেই আমার আব্বার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেনআমরা সেগুনবাগিচার একটি বাসায় উঠলামনতুন করে সংসার সাজালেন মাআব্বাকে টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মিলিটারি ডিক্টেটর আইয়ুব খান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেপাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান থাকা সত্ত্বেও নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তিনি

১১ অক্টোবর আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়তিন দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়সিদ্ধেশ্বরীর একটা ছোট্ট বাড়ি, যেখানে কোনো রাস্তাঘাটও ছিল না, বাড়িটাও সম্পূর্ণ তৈরি হয়নিঅসম্পূর্ণ সেই বাড়ির দুটি কামরায় আমরা উঠিএরপর সেগুনবাগিচায় ৭৬ নাম্বার বাড়ির একটা ফ্ল্যাটে আমাদের জায়গা হয়১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর উচ্চ আদালতের রায়ে আব্বা মুক্তি পানকিন্তু রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলঢাকার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলআব্বা তখন আলফা ইস্যুরেন্স কোম্পানিতে একটা চাকরি নিলেনআমার মা সে সময় ধানম-ির বাড়ির কাজ শুরু করেনদুটি বেডরুম আর একটা বসার ঘর তৈরি করেই আমাদের এই বাড়িতে নিয়ে আসেন

আমার আব্বার কর্মজীবনটাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন আমার মাকারণ, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আব্বা যে কাজ করছেন, সংগ্রাম করছেনÑ মা সেটা খুব আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেনআব্বার পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করেনআব্বা যে একটা মহ কাজ করছেন সে বিশ্বাস সব সময় মা পোষণ করতেন৬-দফা দাবি পেশের পর যখন ১৯৬৬ সালের মে মাসে আব্বা গ্রেফতার হন, তারপর থেকে সকল সংগ্রাম আমার মা-ই করে গেছেন৬ জুনের হরতাল থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামে আমার মায়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কিছু নেতা মিলে ৬-দফার পরিবর্তে ৮-দফা নিয়ে আলোচনা শুরু করেনআমার মা এর ঘোর বিরোধিতা করেনতাঁর কথা ছিল যে, আব্বা যেহেতু ৬-দফা দিয়ে গেছেন, তাই ৬-দফা ৬-দফাই থাকবে

একটা কঠিন সিদ্ধান্ত আমার মা দিয়েছিলেনআগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অর্থা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে আমার আব্বাকে ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করা হয়তখন আমার মা সফলভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলেন

গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে গোপনে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আমার মা বৈঠক করতেন, নির্দেশনা দিতেন এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সবরকম সহযোগিতা দিতেন

আন্দোলন-সংগ্রামে সমগ্র বাংলা যখন উত্তাল, তখন আইয়ুব খানের কাছ থেকে প্রস্তাব আসে বৈঠকে বসারআব্বাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে সেই বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়আমার মা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বৈঠকে যাওয়ার ঘোর বিরোধিতা করেনতাঁর দাবি ছিল মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে এবং কেবল মুক্ত মানুষ হিসেবেই তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন

তাঁর এই সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ক্ষুব্ধ হনআমার মাকে তাঁরা এমন কথাও বলেন যে, “আপনি এটা কী করলেন? আপনি তো বিধবা হবেনআমার মা সে কথায় বিচলিত হননিতিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং সংগ্রাম যাতে আরও বেগবান হয় তার ব্যবস্থা নেনএরপর গণঅভ্যুত্থান ঘটেআইয়ুব খান মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়২১ ফেব্রুয়ারি মামলা তুলে নেওয়া হয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি আমার আব্বাসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়

জাতীয় জীবনে এ সিদ্ধান্ত যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা আজ চিন্তা করলে অনুধাবন করা যায়এরপর আইয়ুব খানের পতন ঘটেপাকিস্তানের আরেক সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া ক্ষমতা দখল করে১৯৭০ সালে নির্বাচন হয়সমগ্র পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেকিন্তু বাঙালির হাতে তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় নাশুরু করে ষড়যন্ত্রতখন সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন আমার আব্বা৭ মার্চ ১৯৭১রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় আব্বা ভাষণ দেবেন, দিকনির্দেশনা দেবেনঅনেক মানুষই অনেক পরামর্শ দিতে থাকেন আব্বা কী বলবেন বা কী বলা উচিতআমার মা আব্বাকে বলেন যে, ‘তোমার কারও কথা শুনতে হবে না, তোমার মনে যে কথা আছে তুমি সেই কথাই বলবেঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন: এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম

সেই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেমানুষকে উদ্বুদ্ধ করার শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে

২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা শুরু করে২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আমার আব্বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন, যা সকল জেলা, মহকুমা, ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত ওয়্যারলেসের মাধ্যমে পৌঁছে যায়৭ মার্চের ভাষণে তিনি যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবেÑ সে বার্তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে চলে যায়স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই রাতেই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানের কারাগারেআমার মা গ্রেফতার হনসঙ্গে জামাল, রেহানা, রাসেল এবং আমিআমার মা কখনও ভেঙে পড়েননিতাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল যে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করবে, বিজয় অর্জন করবেআমরা বিজয় অর্জন করেছি

আন্তর্জাতিক চাপে এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রায় ৯৬ হাজার সেনা সদস্যসহ যারা স্বাধীন বাংলাদেশে আটকা পড়ে, তাদের স্বার্থে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় আমার আব্বাকে মুক্তি দিতে১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেনআমার মা ফিরে পান তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষটিকেসেই দিন দেখেছি মায়ের আবেগ আর ভালোবাসাতিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননিসকল বাঁধ ভেঙে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আমার আব্বার বুকের ওপর

১১ জানুয়ারি ১৯৭২ সালযুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার নতুন সংগ্রাম শুরু করেন আমার আব্বাআমার মা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত মা-বোনদের পাশে দাঁড়ান তাঁদের চিকিসা, সামাজিকভাবে তাঁদের পুনর্বাসন করার কাজেনিজে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়ে তাঁদের জীবন গড়ে দিয়েছেনআমার আব্বা মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেনএই সময়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর যাত্রা শুরু করে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যান এবং স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা এনে দেন

আব্বা ঘুণেধরা সমাজ ভেঙে একটি নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রশাসনিক অবকাঠামো ভেঙে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষের ক্ষমতায়ন করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেনক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দিয়ে একটি উন্নত জীবন দিতে চেয়েছিলেনআত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেনবিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে চলার পথ দেখিয়ে ছিলেন

আমার বাবার চলার পথে আমার মায়ের যে আত্মত্যাগ, সাহসী ভূমিকা তা আমাদের দেশের প্রত্যেক নারীর জীবনে প্রেরণা হয়ে থাকবেস্বামীর আদর্শকে বুকে ধারণ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কীভাবে পাশে থেকে প্রেরণা দেওয়া যায়, শক্তি-সাহস দেওয়া যায় তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমার মাব্যক্তিগত জীবনে সকল চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি আমার বাবার পাশে থেকেছেন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বেইমান মুনাফিকের দল আমার আব্বা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে মানুষের সকল আশা-আকাক্সক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ সব ধ্বংস করে দেয়

আমার মা জীবনের সকল সময় আমার বাবার সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটে তিনিও জীবনটা দিয়ে গেলেনঘাতকদের কাছে তিনি জীবন ভিক্ষা চাননি বরং সাহসের সঙ্গে বলেছিলেন: তোমরা তাঁকে যখন হত্যা করেছ, আমাকেও হত্যা করো

ঘাতকের হাতের অস্ত্র গর্জে ওঠে৩২ নম্বর বাড়ির মেঝেতে আমার মা লুটিয়ে পড়েনএরপর একে একে সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়, সবার শেষে ছোট্ট রাসেলকে হত্যা করেআমার বাবার সমগ্র জীবনের সাথি আমার মা মরণেও তাঁর সাথি হলেন

লেখক-বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী