ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

শুধু কর্মীরাই নয় হয়রানির শিকার কর্মকর্তারাও

প্রকাশিত: ০৪:৪৩, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭

শুধু কর্মীরাই নয় হয়রানির শিকার কর্মকর্তারাও

ফিরোজ মান্না ॥ মালয়েশিয়ায় কর্মী হয়রানির পাশাপাশি বাংলাদেশের সরকারী কর্মকর্তারাও চরম দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি সরকারী সফরে গিয়ে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে হেনস্থার শিকার হন বাংলাদেশ সরকারের একাধিক যুগ্ম-সচিবসহ ১২ সরকারী কর্মকর্তা। সফররত সবার সরকারী পাসপোর্ট ও সরকারী সফর হলেও তাদের এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অন এরাইভ্যাল ভিসা দেয়া হয়নি। একই অবস্থা পর্যটকদের ক্ষেত্রেও। মানব পাচারের অভিযোগে সম্প্রতি এয়ারপোর্ট থেকে ৭ কর্মকর্তাকে আটক ও ৬ শ’ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। নতুন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টের চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইমিগ্রেশন বিভাগ দেশ থেকে অবৈধ বাংলাদেশীকে বের করে দিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে দেশটিতে কোন অবৈধ বাংলাদেশীকে থাকতে দেবে না বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশী পর্যটকরাও এয়ারপোর্টে ভাল আচরণ পাচ্ছেন না। তাদের সঙ্গে কর্মীদের মতো আচরণ করা হচ্ছে। এখন মালয়েশিয়া বাংলাদেশী পর্যটকদের জন্য বিপজ্জনক দেশ হয়ে উঠেছে। সরকারী কর্মকর্তারাও হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। তাদের জন্য ‘অন এরাইভ্যাল ভিসা’র নিয়ম থাকলেও তাদের তা দেয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি সরকারের ১২ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতায় কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট এখন বাংলাদেশীদের জন্য ভীতিকর হয়ে উঠেছে। যে কোন যাত্রীকে সন্দেহ হলে তাকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারে। এয়ারপোর্টের ভেতরেই স্থাপন করা হয়েছে এই সেন্টার। কর্মী হোক আর সরকারী কর্মকর্তা হোক তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই সেন্টারে বসিয়ে রেখে নানা বিষয়ে জেরা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কাউকে দেশে পাঠানো হয়। আবার কাউকে আটক রাখা হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতি চলছে এয়ারপোর্টে। বিষয়টি নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল বাংলাদেশী কোন নাগরিককে হয়রানি করা হবে না। এই আশ্বাসের পর হয়রানি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট থেকে একদিনে ৬ শ’র ওপর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে বদলি করে দেয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কথাগুলোও মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মুসতাফা আলী ঘোষণা দিয়েছেন, কোন দেশের অবৈধ অভিবাসীকে দেশটিতে অবস্থান করতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের অবৈধ কর্মীদের দেশে পাঠানোর সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। রিহায়ারিং কর্মসূচী শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই এই কর্মীদের দেশে পাঠানো শুরু করা হবে। দেশটিতে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩ লাখ অবৈধ কর্মী রয়েছে। এরা রিহায়ারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু কর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে যেতে পারছেন না। যদিও দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ রিহায়ারিংয়ে যাওয়া কর্মীদের আটক করবে না বলে জানিয়েছিল। দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশীদের প্রবেশ করতে দেয়া কয়েক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে আটক করেছে। এছাড়া একদিনে ৬শ’ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে বদলি করে দিয়েছে। জানা গেছে, এখন আর কোন কর্মী পুলিশের ভয়ে রিহায়ারিংয়ের জন্য হাইকমিশনে যাচ্ছেন না। কারণ, পুলিশের হাতে আটক হলেই ১৪ দিনের আগে জেল থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। জেল থেকে বের হওয়ার পর তাদের সোজা দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে হাজার হাজার কর্মী লুকিয়ে জীবনযাপন করছেন। তাদের অনেকে জঙ্গলে গিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। দেশটিতে দিনে-রাতে সব সময় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রতিদিন পুলিশের হাতে বহু কর্মী আটক হচ্ছেন। রিহায়ারিংয়ের জন্য যাওয়া কর্মীদের পুলিশ আটক অভিযানের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোন সারা পায়নি। প্রতিদিনই বাংলাদেশী কর্মীদের আটক করা হচ্ছে। এক সপ্তাহে এক হাজারের বেশি কর্মীকে আটক করা হয়েছে। কর্মীরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অনুমতি নিয়েই বাংলাদেশ হাইকমিশনে যাচ্ছিলেন। দেশটির পুলিশ কর্মীদের হাইকমিশনের খুব কাছে থেকে আটক করে নিয়ে গেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিহায়ারিং কর্মসূচী চলবে। এই সময়ের মধ্যে নিবন্ধিত হতে না পারলে কর্মীদের দেশে ফিরে যেতে হবে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে হাইকমিশন জানিয়েছে, কয়েক হাজার কর্মীকে পুলিশ আটক করেছে এমন খবর তারা পেয়েছেন। কিন্ত ঠিক কত হাজার কর্মী আটক হয়েছে, তার কোন হিসাব মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকে পাওয়া যায়নি। হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশটির সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা কোন অবৈধ অভিবাসীকে রাখবে না। এ কারণে কঠোর হাতে তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোন সারা পাওয়া যাচ্ছে না।
×