ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২

নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে দক্ষিণের লাখো মানুষ

হাফিজুর রহমান হীরা, বরিশাল

প্রকাশিত: ১৮:০৪, ১৯ মার্চ ২০২৬

নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে দক্ষিণের লাখো মানুষ

ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাড়ির টানে দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষ এখন বাড়িমুখো। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা ছুটছেন গ্রামের বাড়িতে। ফলে সড়ক, নৌ ও আকাশপথ-সবখানেই দেখা গেছে যাত্রীদের ব্যাপক চাপ।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে নৌপথ এখনো সবচেয়ে আরামদায়ক ও জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেক যাত্রী আগাম টিকিট সংগ্রহ করলেও অতিরিক্ত চাপের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই লঞ্চগুলো পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ডেকে যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে, যা গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বরিশাল নদীবন্দরে ধীরগতির উন্নয়ন কার্যক্রমের ধাক্কায় ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ চরমে। গত দু বছর ধরে এ নদী বন্দরে ধীরলয়ে নির্মাণাধীন টার্মিনাল ভবন সহ পার্কিং ইয়ার্ড’র কাজ চলমান থাকায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নির্মাণ সামগ্রীর কারণে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের সাথে চলাচলে ঝুঁকিও বাড়ছে।

লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রীবহন রোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবুও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে সড়ক পথেও যাত্রীদের চাপ কম নয়। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কসহ দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বাস, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। যদিও আগের তুলনায় যানজট কম, তবে অতিরিক্ত যাত্রী চাপে অনেক পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ভোগান্তি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফেরার কারণে তারা বেশি ভাড়া দিয়েই যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ এবারের ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন। এতে করে লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল, ফেরিঘাট ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাপ ও কর্মচাঞ্চল্য।

এদিকে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে বিভিন্ন পয়েন্টে তদারকি করছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বরিশাল, কুয়াকাটা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালীগামী দূরপাল্লার ৪টি পরিবহনে অভিযান চালায়। এসময় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও যাত্রীদেরকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় ২০ হাজার টাকা জরিমানার পাশাপাশি ২৫ জন যাত্রীকে ২‘শ টাকা করে ফেরত দিতে বাধ্য করে বাস কর্তৃপক্ষকে।

লঞ্চযোগে বাড়ি ফেরা ঝালকাঠির বাসিন্দা জাহিদ হাসান বলেন, “ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফেরা। লঞ্চে ভিড় বেশি, তবুও নদীপথে যাত্রার আলাদা একটা আনন্দ আছে। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।”

রাজধানী থেকে সড়ক পথে আসা গার্মেন্টস শ্রমিক, বরিশালের তাসলিমা খাতুন বলেন, “ছুটি পেয়ে শেষ মুহূর্তে রওনা দিয়েছি। বাসে ভাড়া কিছুটা বেশি নিয়েছে, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য এই কষ্ট মেনে নিয়েছি।”

পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “লঞ্চে বাড়ি ফেরা আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। নদীর বাতাস, রাতের যাত্রা—সব মিলিয়ে অন্যরকম অনুভূতি। প্রতি ঈদেই চেষ্টা করি লঞ্চে যাওয়ার।”

এছাড়া কেউ কেউ সময় বাঁচাতে আকাশপথও বেছে নিচ্ছেন। ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে ফ্লাইটের সংখ্যাও বেড়েছে, তবে তুলনামূলক বেশি ভাড়ার কারণে সাধারণ যাত্রীদের কাছে তা এখনো সীমিত।

সব মিলিয়ে, ঈদকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কিছু ভোগান্তি থাকলেও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ উদযাপনের আনন্দই যেন সব কষ্ট ভুলিয়ে দিচ্ছে ঘরমুখো মানুষকে।

এম.কে

×