ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু একটি মানবিক ইস্যু নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন উদ্যোগ নিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ ও পথ নকশায় হাঁটতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
কোস্ট ফাউন্ডেশন এর আঞ্চলিক টিম লিডার ও সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা উখিয়া টেকনাফের আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ধীরে ধীরে কমছে, আর প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক কৌশল গ্রহণে এগোতে হবে।
প্রথমত, কূটনৈতিক উদ্যোগকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। অতীতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। তাই এখন প্রয়োজন বহুপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার করা। জাতিসংঘ, ওআইসি ও আসিয়ানের মতো প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত চাপ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
দ্বিতীয়, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, এসব প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রমাণ সংগ্রহ, তথ্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এগোতে হবে। আইনি চাপ দীর্ঘমেয়াদে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে সহায়ক হবে।
তৃতীয়, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শর্তভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নীতিকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থ, দেশের অভ্যন্তরে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, সিভিল সোসাইটি এবং এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ালে কার্যক্রম আরও বাস্তবমুখী ও গ্রহণযোগ্য হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।
পঞ্চম, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শিশু ও তরুণ, যারা সঠিক সুযোগ না পেলে ভবিষ্যতে একটি হারানো প্রজন্মে পরিণত হতে পারে। তাই তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এটি শুধু মানবিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
ষষ্ঠ, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ক্যাম্প এলাকায় অপরাধ, মানবপাচার ও উগ্রবাদের ঝুঁকি বাড়ছে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। তাই আইন-শৃঙ্খলা জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সামাজিক সংহতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সবশেষে, সহায়তার ধরনে পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও জীবিকা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় এনজিও ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সহজ নয়, এবং তা রাতারাতি সম্ভবও নয়। তবে একটি সুসংগঠিত কূটনৈতিক কৌশল, শক্তিশালী আইনি উদ্যোগ, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সংস্কার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রত্যাবাসনের পথ সুগম হতে পারে।
এম.কে








