ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

হিন্দুত্ববাদী বিজেপির তীব্র সমালোচনায় বিরোধীরা

বড়দিনের উৎসবে ভারতজুড়ে হিন্দু জঙ্গিদের সিরিজ হামলা-হেনস্থা

প্রকাশিত: ০৭:৩৯, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫

বড়দিনের উৎসবে ভারতজুড়ে হিন্দু জঙ্গিদের সিরিজ হামলা-হেনস্থা

ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং বড়দিনের উৎসব উদযাপনের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ব্যাপক হামলা, হেনস্থা ও হুমকি-ধামকির ঘটনা ঘটেছে। খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবে হিন্দু জঙ্গিদের সিরিজ হামলায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো। বিরোধীরা তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, নরেন্দ্র মোদি সরকারের শাসনামলে সুপরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করা হচ্ছে।

ভারতজুড়ে বড়দিনের উৎসবে সিরিজ হামলা-হেনস্থা

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গির্জা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ঢুকে প্রার্থনা ও উৎসবে বাধা দিয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি অঞ্জু ভার্গব এক দৃষ্টিহীন নারীর মুখ চেপে ধরে আক্রমণাত্মক আচরণ করছেন।

অন্যদিকে, দিল্লির লাজপত নগর মার্কেটে হকারদের সান্তা টুপি খুলে ফেলতে বাধ্য করার এবং নারী ও শিশুদের হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামনে এসেছে। আম আদমি পার্টির (এএপি) দিল্লির সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ এই ঘটনার সমালোচনা করে বলেন, “ভারতে যারা ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তাদের নিজেদের সন্তানরাই আবার আমেরিকা ও ইউরোপে ধুমধাম করে বড়দিন পালন করছে।”

ছত্তিশগড়ের কঙ্কের জেলায় খ্রিস্টান যাজকদের গ্রামে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এক খ্রিস্টান ব্যক্তি তার পিতাকে ধর্মীয় রীতি মেনে সমাহিত করার পর একটি গির্জায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওড়িশায় সান্তা টুপি বিক্রি করতে হকারদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে বলা হয়েছে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ভারতে এসব পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ। দিল্লির লাজপত নগর বাজারেও একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিরা সান্তা ক্যাপ পরা নারী ও শিশুদের হুমকি দিচ্ছে।

আপের দিল্লির সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ লাজপত নগরের ভিডিওটি শেয়ার করেছেন এবং তিনি এটিকে ভণ্ডামি বলে বর্ণনা করে সমালোচনা করেছেন। ‘‘আমি এমন হাজার হাজার কাকাকে চিনি যারা ধর্মের নামে ভারতে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, এখানে ক্রিসমাস এবং সান্তা ক্লজকে গালি দিচ্ছে। কিন্তু তাদের বাচ্চারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপে আনন্দের সাথে ক্রিসমাস উদযাপন করছে,’’ বলেন তিনি।

অনলাইনে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, উগ্রবাদী হিন্দু হিসেবে পরিচিত সত্যনিষ্ঠ আর্য উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের একজন যাজককে গালিগালাজ করছেন। হেনস্থাকারী একজন প্রাক্তন বাংলাদেশি নাস্তিক, পরে তিনি হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ভারতে নির্বাসিত তৎকালীন স্বঘোষিত এই শাহবাগী নাস্তিক এখন অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার জন্য পরিচিত।

আরেকটি ঘটনায়, হরিদ্বারে উত্তর প্রদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মালিকানাধীন একটি হোটেল স্থানীয় হিন্দু সংগঠন শ্রী গঙ্গা সভা থেকে হুমকি পাওয়ার পর বড়দিনের বুকিং বাতিল করেছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন দলের নিন্দা ও প্রতিবাদ

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি ভেনুগোপাল বলেছেন, এই ঘটনাগুলো খ্রিস্টানদের প্রতি বিজেপির চরম শত্রুতা প্রকাশ করে। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে তিনি বলেন, “এটি খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিজেপির তীব্র ঘৃণার আসল চেহারা। তাদের নেতারা ভারতের সংখ্যালঘুদের অপমান করতে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারেন, এমনকি একজন দৃষ্টিহীন নারীকে আক্রমণ করতেও তারা দ্বিধা করেন না।”

ভেনুগোপাল দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং ওড়িশার মতো বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে ঘটা বেশ কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি কেরালার পালক্কাদে আরএসএস কর্মীদের দ্বারা শিশুদের একটি ক্যারল দলের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “বিজেপি দিন দিন প্রমাণ করছে যে তারা মেষের ছদ্মবেশে নেকড়ে ছাড়া আর কিছুই নয়।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে ভেনুগোপাল আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি বছরের পর বছর ধরে খ্রিস্টানদের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর নাটক করছেন, কিন্তু তার দল এবং সংঘ পরিবার বারবার তাদের আসল চরিত্র উন্মোচন করছে। বড়দিনের উপহার হিসেবে বিজেপি ঘৃণা ও বিষ বিলি করছে।

দিল্লির মন্ত্রী সৌরভ ভরদ্বাজ এই ঘটনাকে ‘ভণ্ডামি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যারা ভারতে বড়দিন পালন নিয়ে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তাদের সন্তানরাই আবার বিদেশে গিয়ে ধুমধাম করে বড়দিন পালন করছে।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতার সম্প্রীতির উৎসবের ছবির সঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সহিংসতার তুলনা করে বলেছে, বিজেপির রাজ্যে বড়দিন উদযাপন করা এখন ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলটি বলেছে, “বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে, বড়দিন উদযাপন একটি অপরাধে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র সান্তা টুপি পরার জন্য মহিলাদের নির্যাতন এবং অপমান করা হয়। ভিজিল্যান্ট গোষ্ঠীগুলি মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়, ঘৃণা পুরস্কৃত হয় এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের নীরবতা বধির করে তোলে।”

ক্যাথলিক বিশপ কনফারেন্সের উদ্বেগ

ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া (সিবিসিআই) এক বিবৃতিতে এই ঘটনাগুলোকে সংবিধানবিরোধী বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা বিজেপি নেত্রী অঞ্জু ভার্গবের বরখাস্ত দাবি করেছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

সিবিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, “এই লক্ষ্যবস্তুযুক্ত ঘটনাগুলি, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ ক্যারল গায়ক এবং গির্জায় প্রার্থনা করার জন্য জড়ো হওয়া মণ্ডলীর বিরুদ্ধে, ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নির্ভয়ে বেঁচে থাকার এবং উপাসনার অধিকারের সাংবিধানিক গ্যারান্টিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।’’

জবলপুরের ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিশপ কনফারেন্স বলেছে, “এই ধরণের জঘন্য এবং অমানবিক আচরণের আলোকে, সিবিসিআই ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে অঞ্জু ভার্গবকে অবিলম্বে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে।” সিবিসিআই ২৪ ডিসেম্বর ছত্তিশগড়ে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বন্ধের ডাক দেওয়া ঘৃণাপূর্ণ পোস্টারের প্রতিবেদনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংঘটনটি সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই ধরণের আহ্বান আরও সহিংসতাকে উস্কে দিতে পারে।

এম/আই

×