ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

তোফাজ্জেল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে আসামিরা

জাইদ ইকবাল, পাথরঘাটা (বরগুনা)

প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ১৩ মার্চ ২০২৬

তোফাজ্জেল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে আসামিরা

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের আব্দুর রহমান এর ছেলে মোঃ তোফাজ্জল (৩২) কে হত্যা করে ওরা নিভিয়ে দিয়েছে পরিবারের শেষ প্রদীপ। 
সরেজমিন তোফাজ্জলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কবর ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। 
জানা গেছে ২০১১ সালের ১১ মার্চ তোফাজ্জল এর পিতা মোঃ আব্দুর রহমান সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তোফাজ্জলের মায়ের মৃত্যু হয়। 

২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল তোফাজ্জল এর এক মাত্র ভাই পুলিশের এস আই মোঃ নাসির এর লিভার ক্যান্সার আক্রান্ত হয় মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে কতিপয় বিপথগামী শিক্ষার্থীর হাতে পরিবারের শেষ প্রদীপ তোফাজ্জলের মৃত্যু হয়। 
তাই এখন আর তোফাজ্জলের পরিবারে কেউ নেই স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে অযত্ন অবহেলায়  তোফাজ্জলের পরিবারের  বাড়িটি। 

তোফাজ্জলের বাড়ির প্রতিবেশী এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ কবির, সাবেক ইউপি সদস্য কালা বৈরাগী, প্রতিবেশী মোঃ এমাদুলসহ এলাকার বাসিন্দাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন। 

তোফাজ্জল এলাকার শান্ত ও ভদ্র একটা ছেলে ছিল।  তারা বলেন তোফাজ্জেল বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করে দুই বছর মঠবাড়িয়া থানায় রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন পরে পাথরঘাটা থানায় দেড় বছর রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন একই সাথে তিনি চাকরিরও চেষ্টা করেছেন। 
এলাকাবাসী বলেন তোফাজ্জল ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের ছাত্রলীগের সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। 
তারা বলেন তোফাজ্জলের সাথে কাঠালতলী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম এর মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তবে, তাদের এই প্রেম সম্পর্ক  কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিল না সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার। 

একপর্যায়ে মেয়েকে তোফাজ্জলের কাছ থেকে দূরে সরাতে সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তোফাজ্জলকে বিভিন্ন সময় বেধড়কভাবে মারপিট করতো।
এলাকাবাসী বলেন পরিবারের সকলকে হারানোর কষ্ট অপরদিকে প্রেম করে প্রেমিকাকে না পাওয়ার বেদনা এবং ভালোবাসার মানুষের পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হতে এক সময় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তোফাজ্জেল। 
তবে তোফাজ্জল ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেও এলাকার কোন মানুষের কোন রকমের ক্ষতি করেনি যখন যেখানে যাকে পেয়েছেন তার কাছে কিছু খাবার চেয়েছেন কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি।

ভারসাম্যহীন এই তোফাজ্জলকে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় বিপথগামী ছাত্ররা উল্লাস করে তোফাজ্জলকে পিটাতে থাকে এক পর্যায় তোফাজ্জল কিছুটা অসুস্থ হলে তাকে আবার ভাত খাওয়ানো হয়, ভাত খাওয়ানের পরে আবার ছাত্র নামক নরপশুর তোফাজ্জলকে পিটাতে থাকে দফায় দফায় আঘাতের কারণে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ একজন সহজ সরল তোফাজ্জলের মৃত্যু হয় নিভে যায় তোফাজ্জলের পরিবারের শেষ প্রদীপ। 

তোফাজ্জলের  ভাইয়ের স্ত্রী  শরীফা আক্তার জনকণ্ঠকে  বলেন, ২০২৪ সালের (১৮ সেপ্টেম্বর) বুধবার  আনুমানিক রাত ১০টার পরে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে তোফাজ্জল আমাকে ফোন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ভাবি আমাকে মোবাইল চুরির দায়ে হলে আটকে রেখে আমার কাছে টাকা চায়। এ কথা বলার পরেই ফোন কেটে দেয়। পরবর্তীতে ওই নাম্বার থেকে আবার কল দিয়ে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আমি তোফাজ্জলের কে হই। পরিচয় বলার পরে তারা আমাকে বলেন, তোফাজ্জলকে মোবাইল চুরির দায়ে আটকে রেখেছি ওকে আপনারা ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এ সময় আমি তাদের বলি, ভাই ওর মাথায় সমস্যা আছে, ও আসলে চোর না। তোফাজ্জল একজন ভালো ছাত্র, অনার্স- মাস্টার্স শেষ করা ছাত্র, ওকে আপনারা ছেড়ে দিন। পরে তারা আমাকে বলেন, আপনার কথা রেকর্ড করা হচ্ছে। আপনি দুই লাখ টাকা পাঠান, না হলে তোফাজ্জেলকে আমরা মেরে ফেলবো। তখন তাদের আমি বলি, আমি মহিলা মানুষ, কীভাবে কি করব? আমি তো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। পরে তোফাজ্জলের মামা-চাচা যারা ঢাকায় আছেন তাদের মোবাইল নম্বর দিয়ে দেই।

১৯ সেপ্টেম্বর শুনতে পাই তোফাজ্জলকে ওরা মেরেই ফেলছে, তিনি বলেন আমাদের পরিবারের শেষ প্রদীপ ছিল তোফাজ্জল তোফাজ্জলকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমরা। 

 এ ব্যাপারে  তোফাজ্জেল হত্যা মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান বলেন, তোফাজ্জেলকে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মারধর করে হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমানুল্লাহ শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতনামা একটি মামলা দায়ের করেন যার নম্বর ২৯।
মামলাটিতে শুরুতে নির্দিষ্ট কোনো আসামি উল্লেখ করা হয়নি, সবাইকে অজ্ঞাতনামা রাখা হয়েছিল।

তিনি জানান, মামলার তদন্ত শেষে শাহবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে ২১ জনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে এই মামলায় সাতজনকে গ্রেফতার করা হলে তারা দোষ স্বীকার করে এবং কারা কীভাবে আঘাত করেছে, কোথায় কী ঘটেছে এসব বিষয় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন।

ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমানের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একের পর এক নারাজি পিটিশন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও পরে আরও সাতজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় মোট ২৮ জনকে আসামি করে ২০২৫ সালে ১৫ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা সহ কতিপয় আসামিদের রক্ষা করার লক্ষ্যে একের পর এক নারাজি পিটিশন দিতে থাকেন এক পর্যায় 
বর্তমান বছরের ১০ মার্চ আদালতকে আমরা অবগত করতে সক্ষম হলে আদালত তোফাজ্জল হত্যা মামলায় ২৮ আসামী অভিযুক্ত  প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। 

তিনি আরও বলেন, আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তবে এতকিছুর পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসামিদের গ্রেফতারে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান বলেন, বর্তমানে মামলার সাতজন আসামি কারাগারে ছিলো, যাদের মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন। বাকি আসামিরা কারাগারে আছেন। পুলিশ ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামীদের গ্রেফতার করছে না। 

 তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে ভুক্তভোগী পরিবার। তাই তোফাজ্জেল হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া যেন বিলম্বিত না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয় এটাই তাদের দাবি।

 

রাজু

×