ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

ঢামেকের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন

যেমনি চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেব তেমনি রোগীদেরও

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৩৮, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

যেমনি চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেব তেমনি রোগীদেরও

সামন্ত লাল সেন

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, চিকিৎসকদের সুরক্ষার বিষয় দেখার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে আমার, পাশাপাশি রোগীদের সুরক্ষার বিষয়টিও দেখতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিয়েও কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় সারাদেশের চিকিৎসকদের ওপর পড়তে পারে না। এখন বাংলাদেশে চিকিৎসার মান অনেক উন্নত।

আমাদের চিকিৎসকদের কাছে বিদেশ থেকে রোগী এসে চিকিৎসা নিচ্ছে। শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভুটানের এক রোগীকে সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডা. মিলন অডিটরিয়ামে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন নর্থ আমেরিকা আয়োজিত ইকুইপমেন্ট হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের সুরক্ষার বিষয়টি বক্তারা তুলে ধরায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমি জানি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা অনেক কষ্ট করে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। আমি একবার প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম যে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকরা অনেক কষ্ট করে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তাদের তো নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত। রোগীদের সংখ্যা জরুরি বিভাগে মাঝে মাঝে এতটাই বেড়ে যায় যে, তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক কষ্ট করে তাদের চিকিৎসা নিতে হয়।
মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি গ্রাম থেকে উঠে এসেছি, আমি চিকিৎসকদের সব কিছুই জানি, তারা কত কষ্ট করে চিকিৎসা দিয়ে থাকে। তোমরা এক সময় ডাক্তার হবে, ডাক্তারি পেশা এমন একটা জিনিস, যার ওপর আল্লার আশীর্বাদ আছে। ডাক্তার হতে সবাই পারে না। ডাক্তার হতে গেলে আশীর্বাদ লাগে, সেই আশীর্বাদ নিয়ে তোমরা ডাক্তার হতে এসেছ। তোমরা মানুষের সেবা দিয়ে যাও, একদিন দেখবা অনেক বড় হয়েছ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আমিও তোমাদের মতো একজন ছিলাম। পেছনের সিটে বসে হাততালি দিয়েছি, সেøাগান দিয়েছি। আমি যদি পেছনের সিট থেকে আজকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে পারি, তোমরা একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে।
ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, হঠাৎ একটি টেলিফোন আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি হাসপাতালে যেতাম রোগী দেখতাম। আবার বাসায় ফিরে টিভিতে নাটক দেখতাম। ওই টেলিফোনে আমি প্রথম মন্ত্রী হবার সংবাদ পেলাম। আমি আবারও বলছি, আমি আগে যেমন ছিলাম এখনো সেরকমই আছি। আমি সাধারণ মানুষ হিসেবেই আপনাদের মাঝে আছি, থাকব। আমার দরজা সবার জন্যই সব সময় খোলা।
আয়োজকদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. দেবেশ চন্দ্র তালুকদার, পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানসহ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা।
সচেতন হলে ডায়াবেটিস রোগী কমানো সম্ভব ॥ এর আগে বারডেম হাসপাতালে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন বলেন, সচেতন হলে দেশের ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। 
সামন্ত লাল সেন বলেন, ডায়াবেটিস এমন একটা রোগ আমি যা মনে করি, এটি নিয়ন্ত্রণে রাখলে খুব ভালো থাকা যায় কোনো অসুবিধা হয় না। ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক আছে। আমি মনে করি উনার প্রতিষ্ঠিত এত বড় একটা সুন্দর প্রতিষ্ঠান যা বিশ্বের মধ্যে একটি বিরল ঘটনা বলে আমি মনে করি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা সচেতন হই, তাহলে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারব। আমি চাই বারডেম হাসপাতালের  ডায়াবেটিস এবং প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ যে কোনো সমস্যা নিয়ে আমার আছে আসুক। আমি চেষ্টা করব তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের।  
বাংলাদেশের ভালো দক্ষ চিকিৎসকের অভাব আছে মন্তব্য করে সামন্ত লাল সেন বলেন, আমি কোয়ান্টিটি চাই না, কোয়ালিটিফুল চিকিৎসক চাই। পাশাপাশি বাংলাদেশে শিক্ষকের খুব অভাব, বেসিক সাইন্সের শিক্ষক বলতে গেলে আমাদের দেশে একদমই নেই। তাই আমি চেষ্টা করছি এ ঘাটতিগুলো পূরণ করতে। হঠাৎ করে কোথাও নতুন মেডিক্যাল কলেজ খোলা হলো, যেখানে শিক্ষক নেই এ ধরনের মেডিক্যাল কলেজের পক্ষে আমি নেই। কারণ আমি মনে করি আমি সেখানেই মেডিক্যাল কলেজ খুলব যেখানে ভালো শিক্ষক আছে। আমরা যদি বেসিক সাইন্স ছেলে মেয়েদের পড়াতে না পারি তাহলে ভালো চিকিৎসক বানানো যাবে না।
সাধারণ রোগীরা যেন কোনো ধরনের ভুল চিকিৎসার শিকার না হয় এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দুর্ঘটনা এবং অব্যবস্থাপনা আমাকে অনেক পীড়া দেয়। একটা দুটো ঘটনা নিয়ে সমস্ত চিকিৎসক কমিউনিটির ওপর এক ধরনের অপবাদ আসে। তবে আমি মনে করি না বাংলাদেশের সব চিকিৎসক চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলা করেন।

বাংলাদেশে অনেক ভালো জ্ঞানীগুণী চিকিৎসক আছেন। তবে দু-একটা ঘটনা আমাদের অনেকটা চিন্তিত করে। তাই এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি সব সময় একটা কথা বলি আমি যেমন চিকিৎসকদের সুরক্ষা দিব একইভাবে রোগীদেরও সুরক্ষা দেব। সাধারণ রোগীরা যেন কোনো ধরনের ভুল চিকিৎসার শিকার না হয় সেটাও আমি দেখব।
ওষুধের দাম বেশি এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ওষুধের দাম যে বেশি এটা আমার আগে জানা ছিল না। গতকাল মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ের মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি যে দেশে ওষুধের দাম বেশি। আমরা মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ যেন সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে এজন্য আমি চেষ্টা করে যাব।
বুধবার বারডেম হাসপাতালের তৃতীয় তলার অডিটরিয়ামে ‘ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়’ এ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বারডেমের মহাপরিচালক অধ্যাপক এম কে আই কাইয়ুম চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বারডেম একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক মো. ফারুক পাঠান।
এ সময় তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন বয়সী প্রায় ১ লাখেরও বেশি মানুষের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছিলাম। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ লোক জানেই না তাদের ডায়াবেটিস আছে। অর্থাৎ এ বিষয়টি আমাদের জন্য কতটা বেশি এলার্মিং। ওয়ার্ল্ড ডায়াবেটিক সমিতির সমীক্ষায়ও প্রায় কাছাকাছি এমন ফল এসেছিল। তাই এ রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে জীবনযাপনের অভ্যাস আমাদের বদলাতে হবে।

খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। দৈনিক ৭ ঘণ্টার কম ঘুম হলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। কারও ডায়াবেটিস ধরা পড়লে শর্করা গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এ চিকিৎসক।
এ সময় ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বিশ্বের মধ্যে সব থেকে বড় ডায়াবেটিক সমিতি। বিশ্বের কোনো ডায়াবেটি সমিতি আমাদের মতো সরকারি সেবা দেন না। বেসরকারিভাবে এত বড় কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভাব না, যদিও ডায়াবেটিক সমিতি এটি করে দেখিয়েছে। এখানে আমরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।
ডায়াবেটিক সমিতির এ মহাসচিব বলেন, ৫০ ভাগের বেশি ডায়াবেটিস রোগী জানেই না যে তাদের এ সমস্যাটা আছে। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়। কাজেই আমরা জনগণের কাছে এ বার্তাগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছি। যাতে করে সাধারণ মানুষ ভালো থাকার জন্য সতর্ক হয়ে জীবনযাপন করতে পারে। আমরা আশা করি বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সহযোগিতায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি আরও এগিয়ে যাবে।  
আলোচনা সভায় বারডেমের ডেন্টাল সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরীর ‘ডায়াবেটিস ও মুখের স্বাস্থ্য’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ সময় তিনি বলেন, একটি বিষয় আমি সব সময় দেখেছি যে, যাদের মুখের রোগ আছে তাদের বেশিরভাগেরই ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা আছে। প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীকে সচেতন করার জন্য আমি চেষ্টা করব আমার বইটি বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস হলেও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। ডায়াবেটিস মূলত নীরব ঘাতক। তাই নিয়ম মাফিক জীবনযাপন করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা সারাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের সচেতন করতে নানা প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি।

×