ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

গবাদিপশুর নির্ভুল রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

মো. রায়হান আবিদ

প্রকাশিত: ০০:৫৬, ৩ মার্চ ২০২৪

গবাদিপশুর নির্ভুল রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান

কম খরচে ও স্বল্প সময়ে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে গবাদি পশুর রক্তে পরজীবী দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন রোগের প্রায় শতভাগ নির্ভুল নির্ণয় পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান ও তাঁর গবেষক দল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এর অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় সিরাজগঞ্জ ও রংপুরের বিভিন্ন খামার থেকে প্রায় পাঁচ শতাধিক নমুনা পরীক্ষা করার মাধ্যমে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন গবেষকরা।

অধ্যাপক সহিদুজ্জামান জানান, গবাদি পশুর রক্তে বেবিসিয়া, থাইলেরিয়া ও এনাপ্লাজমার পরজীবীর প্রাদুর্ভাব  উল্লেখযোগ্য। এ সকল জীবাণুর সংক্রমণে গবাদি পশুর ওজন হ্রাস, রক্তস্বল্পতা ও দুধ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। চিকিৎসা সঠিকভাবে না হলে আক্রান্ত পশুর মৃত্যু হতে পারে। মাঠপর্যায়ে এসব রোগের লক্ষণ দেখে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা প্রদান করা হয় বলে চিকিৎসা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত পশুর রক্তে জীবাণুর উপস্থিতি নির্ণয়ে অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে শতভাগ সঠিক রোগ নির্ণয় সম্ভব হয় না। বিশ্বের অনেক দেশে ডিএনএর মাধ্যমে গবাদি পশুর রোগ নির্ণয় করা হলেও দেশের মাঠপর্যায়ে এখনো এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে অধ্যাপক সহিদুজ্জামান বলেন,  প্রাণির রক্ত সংগ্রহ করে ডিএনএ নিষ্কাশন করা হয়। নিষ্কাশিত এই ডিএনএ পিসিআর মেশিনের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। রক্ত পরজীবীর সামান্য পরিমাণ ডিএনএ ওই নমুনায় উপস্থিত থাকলেও এই পরীক্ষায় তা সহজেই শনাক্ত করা যায়। প্রক্রিয়াটি পিসিআর নির্ভর হওয়ায়  প্রায় শতভাগ নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে এবং একসঙ্গে অনেক নমুনা পরীক্ষা করা যায়। প্রতিটি নমুনা পরীক্ষা করতে গড়ে পাঁচশ’ থেকে সাতশ’ টাকা খরচ হয়।  
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কর্ণ চন্দ্র মল্লিক মাঠপর্যায়ে গবাদি পশুর রক্ত পরজীবী ও রোগ নির্ণয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, বেবিসিয়া আক্রান্ত প্রাণির মূত্র কফির মতো রঙের হয়। মূত্র  দেখে বেবিসিয়া রোগ নির্ণয় করা গেলেও থাইলেরিয়া ও এনাপ্লাজমা লক্ষণ দেখে নির্ণয় করা যায় না।

রংপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. জোবাইদুল কবীর বলেন,  বেবিসিয়া, থাইলেরিয়া ও এনাপ্লাজমা এই তিনটি রোগের প্রাাদুর্ভাব বাংলাদেশে আগে তেমন ছিল না। বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে উচ্চ উৎপাদনশীল গবাদিপশুর জাতগুলোতে রোগগুলো প্রকট আকার ধারণ করেছে। যে কারণে ডেইরিসহ প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরও বলেন, এনাপ্লাজমোসিস আঠালি দ্বারা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে সংক্রমিত হয়। উন্নত বিশ্বে এ রোগ হলে আক্রান্ত প্রাণীকে খামার থেকে বাতিল করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এই পদ্ধতির প্রচলন না থাকায় খামারে রোগের সংক্রমণ হার অনেক বেশি। 
আঞ্চলিক প্রাণীরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে (এফডিআইএল) জিমসা স্টেইনিংয়ের মাধ্যমে রোগগুলো নির্ণয় করা হয়। তবে এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল। অনেক সময় থাইলেরিয়া ও এনাপ্লাজমা নির্ণয়ে তারা দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়ায় সঠিক ফলাফলও পাওয়া যায় না। আবার রংপুরের বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নমুনা পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে।
গবেষণা নিয়ে ড. জোবাইদুল বলেন, ডিএনএ পর্যায়ে গবাদি পশুর রোগ নির্ণয়ের যে পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে এটি মাঠপর্যায়ে ব্যবহার করতে পারলে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

×