ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ॥ ক্যাম্পাস জুড়ে রঙিন চিঠি

তারিন সুমাইয়া

প্রকাশিত: ০০:৩৭, ১৩ নভেম্বর ২০২২

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ॥ ক্যাম্পাস জুড়ে রঙিন চিঠি

একটা হলুদ খামে চিঠির সুপ্ত অপেক্ষায় কৈশোর থেকে যৌবনের কত মুহূর্ত কেটে যায়

একটা হলুদ খামে চিঠির সুপ্ত অপেক্ষায় কৈশোর থেকে যৌবনের কত মুহূর্ত কেটে যায়, কিন্তু কখনো বলা হয়ে উঠে না, ‘চিঠি দিও, প্রিয়’। কনফেশন পোস্ট আর ফেসবুকীয় ভাবাবেগের যুগে হাতে লিখা চিঠি আজ সময়ের পরিক্রমায় ‘ব্যতিক্রম আর অভিনব’ মাধ্যমই হয়ে গেছে। মনের কোনে জমা শুভ্র মিষ্টি অথবা চাপা বিষাদময় অনুভূতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে কালো কালিতে পুরে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দেওয়া আজ অতীত হয়েছে।

ফেসবুকের কনফেশন পাতায় কনফেশন আসে, লুকিয়ে রাখা অনুভূতি নীল স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। কিন্তু কোথায় যেন আবেগের গভীরতা নেই, অকপট অনুভূতির অকৃত্রিমতা নেই। হুট করে বেনামে বা সংকোচভরা হাতে লাজুক অক্ষরে লিখা ইতিতে চিঠি পেয়ে কাগজখানা বুকের কাছে নিয়ে অনুভব করার গেছে যে দিন তা কি একেবারেই কি গেছে...?
কারো জন্য হুট করেই চিঠি আসবে, সে জানবে না কি আছে চিঠিতে। চিঠি পাওয়ার এই যে আনএক্সপেক্টেড আনন্দ, চিঠি পড়ার যে ব্যাকুলতা, এই ব্যাপারটা ফিরে আসুক আবার আমাদের মাঝে এইটুকুই চাওয়া। চিঠি চত্বর নিয়ে এমন আশার কথা বলছিলেন বৃত্তের হেড অব কমিউনিকেশন কানিজ ফাতেমা সুমি।
এ শতাব্দীতে এসেও হারিয়ে যাওয়া চিঠির যে আবহ তা নতুন করে ফিরিয়ে আনতেই ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে চিঠি চালাচালির অভিনব এ উদ্যোগের শুরু বৃত্তের। নিজস্ব মৌলিক কাজগুলো বৃত্ত এখন পর্যন্ত নিজ অর্থায়নেই করেছে। তবে এবার কুমিল্লা ডাক বিভাগে এ আইডিয়া নিয়ে পৌঁছালে ডাক বিভাগও দিয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া, উপহার পাঠিয়েছে একটি ডাকবিভাগের লগো সংবলিত ডাকবাক্স।

হলুদ রঙের মাঝে নীল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা চিঠি চত্বর, পাশে সবুজ দেয়ালে ডাকবাক্স বসানো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিল্ডিংগুলোর দিকে যাওয়ার রাস্তা বাঁ-পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাডমিন্টন কোর্টের কূল ঘেঁষে এ চত্বরের অবস্থান। ফ্যাকাল্টির পথে হেঁটে যাওয়ার রাস্তায় পাশ থেকে চিঠি চত্বর দিচ্ছে চিঠির আহ্বান। ২৭ সেপ্টেম্বর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়েই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হবে চিঠির নতুন অব্দ। সেই সঙ্গে ঐদিন সাংগঠনিকভাবে যাত্রা শুরু করছে বৃত্ত কুবি।
ক্যাম্পাসের সব অনাদরে পড়ে থাকা জায়গাগুলো সাজিয়ে নতুন প্রাণ দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য বৃত্তের। এবারও এতদিন ধরে ব্যাডমিন্টন কোর্টের পাশে পড়ে থাকা দৃশ্যত ময়লার স্তূপের জায়গাটিকেই রাঙিয়ে নতুন রূপ দিয়েছে তারা। যেখানে আগে কেউ পা মাড়াতো না সেখানে আজ লাল, হলুদ, নীল, সবুজ নানা রঙে রঙিন চত্বরটি ঘিরে চলছে ছবি তোলার হিড়িক। উদ্বোধনের আগেই ভিড় করছে উৎসুক শিক্ষার্থীসহ দর্শনার্থীরা। হবেই বা না কেন? এর আগে এমন এক ব্যতিক্রম ভাবনার উদ্যোগ এই প্রথমই। চিঠি নিয়ে এমন ভাবনা আর তাকে উৎসর্গ করে খোদ এক চত্বরের উদাহরণ নেই অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে।
একটা সময় ছিল যখন যখন যোগাযোগের মূল মাধ্যমই ছিল চিঠি। কথার আবেদন চিরকালই থাকছে, তবে আজকের সেই চিঠি কে মোটামুটি প্রতœতাত্ত্বিক বিষয়ই বলা যেতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসে তা ফেসবুক- হোয়াটসঅ্যাপ- ইমো-ভাইবারের নিচে চাপা পড়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম তো জানেই না একসময় মানুষ হাতে চিঠি লিখত।

বিশেষ করে জেনারেশন জির ভাগ্যে সরাসরি চিঠি লিখার বা পাওয়ার অভিজ্ঞতা তো হয়ইনি, সক্রিয় ডাকবক্সও দেখেনি। চিঠিবাক্স খুলে চিঠি নেওয়া বা পিয়নের হাতে চিঠি পাওয়া সবই কেবল একটা ধারণা। তবে সবাই-ই হয়তো কখনো না কখনো বাড়ির পুরনো জিনিস ঘাটতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছি দাদার আমলে লিখা চিঠি, অথবা মা-বাবার লিখা প্রেমপত্র হাতে পেয়ে মুচকি হাসি হেসেছি। কিন্তু একটা দীর্ঘশ্বাস রয়ে গিয়েছিল কোথাও না কোথাও, ওমন অমলিন প্রেমের আদান-প্রদান না পাওয়ার আক্ষেপে।

আবার কি মানুষ কখনো হাতের লেখা চিঠিতে ফিরে যাবে! সময়ের বিবর্তনে আজ বৃদ্ধ অস্তিসার কঙ্কাল রূপে দাঁড়িয়ে আছে ডাকঘরের পোস্ট বক্সগুলো। তাই বলে, চমৎকার বাক্য প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যকে মুগ্ধ করার ইচ্ছা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে থেমে থাকে? কখনো কি কোনো গুমোট দুপুরে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র পড়তে গিয়ে ডাকপিয়নের হাতে চিঠি এসে পৌঁছাবে এমন আশা জাগেনি!

টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু, হয়তো পাওয়া হয়নি সেই চিঠির যুগ- তবুও চুপচাপ কোন দুপুরবেলায় কখনো চিঠি পাব একদিন, কোন এক অপরিচিত ঠিকানা থেকে চিঠি আসবে কোনো এক গুণমুগ্ধ প্রেমিকের... চিঠিতে থাকবে মিষ্টিবাক্যের স্তূপ। আর সে চিঠি পেয়ে অমল মন ভরে উঠবে। অথবা চিঠি আসবে প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে, তাতে লুকিযে থাকবে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আবেগ আর ভালোবাসা  এমন শখ কতোর মাঝেই চাপা আছে। আজও তো কেউ চিঠি চায়, পথ চেয়ে থাকে। কিন্তু অভাব শুধু ডাকবাক্সের আর সুযোগের। এবার আসবে বৃত্তের চিঠিবাহক, ডাকবাক্সে চিঠি দিলে বাড়ি পৌঁছে দেবে তাদের হাতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসমিয়া মাহমুদ বলেন, ‘ডিজিটাল কমিউনেকেশনের যুগে আগের দিনে চিঠির যে চালাচালি হতো তা আবার নতুন করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে আমাদের ক্যাম্পাসে তা আসলেই প্রশংসারযোগ্য। চিঠি চত্বরের কাজটার জন্য বৃত্তকে অবশ্যই সবসময় সমর্থন জানাচ্ছি এতো সুন্দর একটি ভাবনা তুলে ধরার জন্য। ক্যাম্পাসের অন্য আরও অনেক চত্বরের মতো সময়ের কালে এ চত্বরটিও যাতে হারিয়ে না যায় এমনি কামনা শিক্ষার্থীদের।
রুদ্রের ব্যাকুল আকাক্সক্ষার মতো আকাশের ঠিকানায় লিখতে চাওয়া চিঠিগুলো আকাশের ঠিকানাতেই না হয় লিখা হোক, থাকুক প্রাপকের অপার ঠিকানায়। আর কথা থাকুক বৃত্তের লাল ডাকবাক্সে সেসব আবেগ আর চিঠিটুকুন প্রযত্নে জায়গা খুঁজে পাবার। খোলা জানালার ফাঁকে চিঠির আবেগ আর না পাঠানো কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, সেই প্রতিশ্রুতিতেই বৃত্তের এই চিঠি চত্বর যাতে স্বার্থক হয়।

×