ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

দেড় দশকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

মোঃ মমিনুর রহমান

প্রকাশিত: ০১:০৪, ১৬ অক্টোবর ২০২২

দেড় দশকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

দেড় দশকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

রংপুর শহরের অদূরে মডার্ন মোড়ের কোল ঘেঁষে উত্তর বঙ্গের অক্সফোর্ড খ্যাত ৭৫ একরের জায়গাজুড়ে সবুজ ছায়ায় ঘেরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর রংপুর বিভাগের মানুষের জন্য দিনটি মাহেন্দ্রক্ষণ কেননা অনেক চড়াই-উতরাই পার করে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীতে, রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের মহীয়সী নারী, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামানুসারে ২০০৯ সালে নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে পনেরো বছরে পদার্পণ করছে বৃক্ষের জাদুঘর খ্যাত প্রিয় ক্যাম্পাস। ৪০০ প্রজাতির বিভিন্ন তরু পল্লব মিলে প্রায় ৩৮ হাজার গাছের সবুজের সমারোহ ক্যাম্পাসটি বর্তমানে ৬টি অনুষদ ও ২২টি বিভাগ নিয়ে গঠিত। বর্তমানে এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার এবং শিক্ষকের সংখ্যা ১৮৬ জন। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য রয়েছে ৪টি একাডেমিক ভবন, গবেষণার জন্য ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং পড়াশোনার জন্য রয়েছে একটি সেন্ট্রাল লাইব্রেরি।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপাদানের পাশাপাশি মুখরোচক খাবারের জন্য রয়েছে একটি ক্যাফেটেরিয়া এবং আড্ডা দেওয়ার জন্য রয়েছে পদ্মরাগ, বায়ান্ন, এসো বিদ্রোহ করি ছাউনি। এছাড়াও প্রাকৃতিক নৈসর্গের সৌন্দর্যম-িত এই ক্যাম্পাসটি বিভিন্ন নামের মাধ্যমে নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছে দারুণভাবে: যেমন ১নং প্রবেশদ্বারের গেটকে বলা হয় দেবদারু রোড কারণ এই রাস্তার দুই দিকেই রয়েছে দেবদারু গাছ। ২নং প্রধান ফটককে কৃষ্ণচূড়া রোড বলা হয়।

বসন্তকালে এই রাস্তার দুই ধারের কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ফুলগুলো যেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের নিজের আঁচলে আবদ্ধ রাখার জন্য নিঃস্বার্থ ও নিরহংকারীভাবে আমন্ত্রণ জানায়। ৩নং গেটকে বকুলতলা বলা হয়। ক্লাস শেষে অনেকেই জোট বেঁধে ফুলের গন্ধে নিজেদের আত্মনিয়োগ করে এবং অনেকেই ফুল কুড়িয়ে বইয়ের পাতায় কিংবা পড়ার টেবিলে যতœসহকারে রেখে দেয়।

২ ও ৩ নং গেটের মাঝখানের বিশাল জায়গাজুড়ে অংশটি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এবং সর্বোপরি ৪নং গেটটির সংলগ্নে ভিসির বাংলো থাকায় ঐ গেটের কাছের রোড, ভিসি রোড নামে পরিচিত। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য জানা অজানা কিছু নামের সমাহার, যেগুলো ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে।

যেমন রাসেল চত্বর, স্বাধীনতা সড়ক, বিজয় সড়ক, সিঙ্গেল চত্বর, হতাশার মোড়, ট্রান্সপোর্টেশন এবং তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থায়ী ম্যূরাল। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মেধা বিকাশের জন্য রয়েছে বিতর্ক ক্লাব, সাংস্কৃতিক ক্লাব, গুন গুন, রণন, ভবতরী, গ্রীন ভয়েস, ফিল্ম অ্যান্ড আর্ট সোসাইটি, বিএনসিসিসহ বিভিন্ন গঠনমূলক সংগঠন এবং বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

ছেলেদের জন্য রয়েছে ২টি আবাসিক হল এবং মেয়েদের জন্য রয়েছে ১টি। এছাড়াও মেয়েদের জন্য শেখ হাসিনা হলের কাজ চলমান। পুরো ক্যাম্পাসের মাঝ বরাবর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রশাসনিক ভবন। সবগুলো মিলিয়ে বছরের একটি দিনের জন্য অনেক উচ্ছ্বসিত দেখা যায় ক্যাম্পাসের স্পন্দন নামে পরিচিত শিক্ষার্থীদের। দিনটিকে মাতিয়ে তোলার জন্য কয়েক দিন আগে থেকেই চলে নাচ, গান ও বক্তৃতার রিহার্সেল।

রাত যায় দিন আসে, এভাবে মাহেন্দ্রক্ষণের উপস্থিতি। জাতীয় সংগীত পরিবেশনা এবং জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয় দিনটি। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যুরাল ও বেগম রোকেয়ার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপনে কেক কাটা ও আনন্দ শোভাযাত্রা করা হয়। সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলোকিত হয় ক্যাম্পাসটি।

চাপাইয়ের গম্ভীরা গান, ভবতরী, টঙ্গের গান, রবীন্দ্র, কাজী নজরুল ও দ্বিজেন্দ্রলালের সংগীত পরিবেশন করা হয়। ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অঙ্গীকার সেশনজট মুক্ত হবে এবার’। এখানের ২০১৬-১৭ সেশনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সকল পাবলিক, প্রাইভেট কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করার গৌরবোজ্জ্বল করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজগুলো সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে চলমান। সকালের স্নিগ্ধ বাতাস, দুপুরের সবুজ ছায়া, গোধূলিতে পাখির কিচিরমিচির ও কলতান এবং সন্ধ্যার পরেই শিয়ালের হুক্কাহুয়া জড়িত ক্যাম্পাসটি শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের কাছে আবেগ ও ভালোবাসার জায়গায় পরিণত হয়েছে।

সবুজময় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা আজ স্বপ্নে বিভোর। পড়াশোনা শেষে দেশের সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা গতিশীল রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে এবং ভবিষ্যতে বেরোবি কে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখার মনোবাসনা গেঁথে রেখেছে অন্তরে।

×