ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

লাল সবুজের ক্যাম্পাস

টুটুল মাহফুজ

প্রকাশিত: ০০:০৭, ২ অক্টোবর ২০২২

লাল সবুজের ক্যাম্পাস

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডার একাংশ

১৯৭১ সাল, নিম্নাঞ্চল হওয়ায় ভূপ্রাকৃতিক কারণে খুলনার গল্লামারী এলাকাটি ছিল বিস্তৃত ধানক্ষেত আর জলাভূমিতে পূর্ণ। তখনও তৈরি হয়নি খুলনা-সাতক্ষীরা রোড। শহর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এই এলাকাটি ছিল বেশ নির্জন; আশপাশে ছিল না তেমন কোন বসতবাড়ি। যুদ্ধকালীন সময়ে এই ধানখেত আর জলাভূমির মাঝেই ছিল একটি একতলা অবকাঠামো।

বেতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের নামে তৎকালীন সময়ে হানাদার বাহিনী এই ভবনটি ব্যবহার করতো। শুধু বেতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ নয়; মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে এখানে আটকে রাখা হতো। ভবনটির সামনেই ছিল একটি দোচালা ঘর আর ফাঁকা জায়গা। এখানেই তাদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। বুলেটের আঘাত, বেয়নেটের খোঁচা, অমানুষিক নির্যাতন অথবা জবাই করে হত্যা করা হতো মুক্তিকামী মানুষদের। হত্যা করে নিথর দেহগুলোকে ভাসিয়ে দেওয়া হতো গল্লামারীর বিলের স্রোতে। দেশ স্বাধীনের পর এখানে পাওয়া গেছে অজস্র নরকঙ্কাল। বেতার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সেই একতলা ভবনটি আজ দোতলা, যেটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রশাসনিক ভবন। ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় আর একাত্তরের নির্মমতার সাক্ষ্য বহনকারী বদ্ধভূমির ওপর সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আজকের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা মহানগরী থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে গল্লামারীতে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক সংলগ্ন ময়ূর নদীর পাশে এক মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সরকারী সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালের ৯ মার্চ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এরপর ১৯৯০ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদে ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯০’ পাস হয়।
দেশের প্রথম রাজনীতিমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন সময়ে ছাত্র-রাজনীতির দরুন অনেক মা-বাবা যখন সন্তানহারা হয়ে পড়ছিল, ঠিক তখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট দাবি জানিয়েছিল একটি সুস্থ-সুন্দর ছাত্র-রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসের। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ড. গোলাম রহমান শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিলেন; নিষিদ্ধ করা হলো ছাত্র-রাজনীতি।

সেই থেকে এখন পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থীকে রক্ত ঝরাতে হয়নি, অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে বন্ধ করতে হয়নি একাডেমিক কার্যক্রম। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের মেধা আর প্রয়োজন বিবেচনায় পেয়ে আসছে আবাসন সুবিধা। করতে হচ্ছে না কোনো দলীয় মিটিং মিছিল। ১০৫ একরের এই ক্যাম্পাসে আটটি স্কুলের (অনুষদ) অধীনে মোট ২৯টি ডিসিপ্লিন (বিভাগ) রয়েছে। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় সাত হাজার; রয়েছেন পাঁচ শতাধিক শিক্ষক, যাদের মাঝে এক-তৃতীয়াংশ পিএইচডি ডিগ্রিধারী।
এছাড়া তিন শতাধিক কর্মকর্তা এবং প্রায় তিনশত কর্মচারী রয়েছে। স্কুলগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা স্কুলের আওতায় রয়েছে আর্কিটেকচার, আরবান এ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং, কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিন। কলা ও মানবিক স্কুলের আওতায় রয়েছে ইংরেজী, বাংলা এবং ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিন। আইন স্কুলের আওতায় রয়েছে আইন ডিসিপ্লিন।

জীববিজ্ঞান স্কুলের আওতায় রয়েছে এগ্রোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, ফিশারিজ এ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, ফরেস্ট্রি এ্যান্ড উড টেকনোলজি, ফার্মেসি ও সয়েল ওয়াটার এ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিসিপ্লিন। ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসন স্কুলের আওতায় রয়েছে ব্যবসায় প্রশাসন এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন। সমাজ বিজ্ঞান স্কুলের আওতায় আছে অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা স্কুলের আওতায় তিনটি ডিসিপ্লিন চালু রয়েছে। এগুলো হলো ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং, প্রিন্টমেকিং ও ভাস্কর্য ডিসিপ্লিন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েই সর্বপ্রথম চালু করা হয় আরবান এ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং (ইউআরপি) ডিসিপ্লিন। এছাড়াও এনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স (ইএস) ডিসিপ্লিন, ফরেস্ট্রি এ্যান্ড উড টেকনোলজি (এফডব্লিউটি) ডিসিপ্লিন, ব্যবসায় প্রশাসন এবং হিউম্যান রিসোর্স ও ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন এবং উপমহাদেশর মধ্যে প্রথম বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বিজি) ডিসিপ্লিন চালু করা হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসের মধ্যেই রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, যেটি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অনন্য এক মাত্রা যোগ করে। দেশের প্রথম সয়েল আর্কাইভ চালু করা হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু একাডেমিক ভবনের ২০ ফুট ভূ-গর্ভে রয়েছে দেশের সমগ্র অঞ্চলের মাটির সংগ্রহশালা। চার বছরের মধ্যেই যাতে স্নাতক শেষ করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই কারিকুলাম সাজানো হয়। শিক্ষা কার্যক্রমে বিগত বছরগুলোতে ১১ সহস্রাধিক গ্রাজুয়েট উত্তীর্ণ হয়, যাদের মধ্যে অনেকেই দেশে-বিদেশে দক্ষতা, সুনাম ও সফলতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য রয়েছে ৩০টির বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। রয়েছে নৈয়ায়িক (বিতর্ক সংগঠন), বাঁধন (রক্তদান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন), রোটারেক্ট ক্লাব, পোডিয়াম (স্পিকিং), কৃষ্টি (সঙ্গীত), ভৈরবী (সঙ্গীত), স্পার্ক (নৃত্য), ৩৫ মি.মি. (মুভি ক্লাব), নৃ-নাট্য, ছায়াবৃত্ত, নয়েজ ফ্যাক্টরি, খুলনা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি সোসাইটির মতো সংগঠন।
বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো এই ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। বসন্ত বরণ, চৈত্রসংক্রান্তি, বাংলা নববর্ষ বরণ, পিঠা উৎসব, দীপাবলি, পূজা, নবীনবরণ ছাড়াও ডিসিপ্লিনকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত অনুষ্ঠান র‌্যাগ ডে (শিক্ষা সামাপনী অনুষ্ঠান)। তিন দিনব্যাপী এই শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়টিকে অন্য মাত্রা দান করেছে।

শুধু তা-ই নয়, খেলাধুলায়ও বেশ সক্রিয় এখানকার শিক্ষার্থীরা। বছরের শুরুতে ভলিবল প্রতিযোগিতায় ছেলেমেয়ে উভয়ের অংশগ্রহণে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, টেবিল টেনিসসহ অন্যান্য ইভেন্টে সবার অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।

monarchmart
monarchmart