ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

’২৬ সালে এলডিসি গ্রাজুয়েশন

বহুমুখী চ্যালেঞ্জে তৈরি পোশাক খাত

জাহিদুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০০:৩২, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

বহুমুখী চ্যালেঞ্জে তৈরি পোশাক খাত

বহুমুখী চ্যালেঞ্জে তৈরি পোশাক খাত

দেশের ‘অর্থনীতির মেরুদণ্ড’ খ্যাত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল যোগানদাতা দেশের রপ্তানি খাত ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ২০২৬ সালের এলডিসি গ্রাজুয়েশন, দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চরম সংকট, বন্দরের মাশুল মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন বিধিনিষেধে খাতটির ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের মুখে। গত চার দশকেও পোশাক খাতের সমান্তরালে কোনো রপ্তানিযোগ্য শিল্প খাত গড়ে উঠতে না পারায় দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবেই যেন শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। 
সংশ্লিষ্টদের মতে গত চার দশক ধরেই দেশের অর্থনৈতিক খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার সময় থেকে গত কয়েক বছর ধরে এই খাতে নানামুখী সংকট দেখা দিয়েছে। করোনাকালে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কর্মকা-। এরপর রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে শুরু হয় আরেক বিপর্যয়। ইউরোপের দেশগুলোতে গ্যাস সংকট হওয়ায় কারখানার চাকা থেমে যেতে থাকে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় বহুগুণে। পোশাক খাতের ক্রয়াদেশ বন্ধ হয়ে যায়। 
পরিস্থিতির উত্তরণ না হতেই দেশে শুরু হয় তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। বেশি দাম দিয়েও শিল্প-কারখানাগুলোয় গ্যাস ও বিদ্যুতের যোগান দিতে পারছে না সরকার। অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্যাস আমদানি ও দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় প্রায় ১৫০ শতাংশ।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে শিল্প খাতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ডিজেলে ৬৪ শতাংশ (৫ বছরের জন্য) এবং ক্যাপটিভে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু এরপরও রপ্তানিমুখী উৎপাদনশীল খাতগুলোতে প্রয়োজনমাফিক গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। অথচ দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন কার্যক্রম দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত (৫ বছরের জন্য)। 
এদিকে ব্যাংকে সুদের হার বেড়েছে ১৫ শতাংশ। কিন্তু উচ্চ খেলাপি ঋণ, শ্রেণিভুক্ত ঋণ সময়সীমা ৯০ দিনে কমিয়ে আনা ইত্যাদির কারণে ব্যাংক থেকেও পুরো সহযোগিতা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে ২০২৩ সালে শ্রমিকদের বেতন ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং ২০২৪ সালে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। ঢাকার পূর্বাচলে প্রশস্ত রাস্তা ও নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলে নতুন শহর নির্মানেণ প্রচেষ্টা করা হলেও দেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফ লাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বেহাল দশা ও দীর্ঘ ভোগান্তি।

এমনকি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং অবকাঠামো সংস্কারেও কোনো গতি নেই। অথচ পোশাক খাতে বিকল্প কোনো সহযোগিতা না দিয়েই প্রণোদনা হ্রাস করা হয়েছে ৬০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা বন্ধের ঝুঁকিতে আছে খাত ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাক খাতই নয়, সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবার কোনো কারণ ছাড়াই বন্দর ফি এক লাফে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধিতে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে ছোট ও মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বন্দরের মাশুল বৃদ্ধিতে শুধু দেশীয় ব্যবসায়ীরাই নন, বিদেশি ক্রেতা ও বিক্রেতারাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি জাপানি একটি প্রতিনিধি দল এ নিয়ে নিজেদের অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে পোশাক খাতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে ২০২৬ সালের এলডিসি গ্রাজুয়েশন। ওই সময়ের পর বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি সরকার। অথচ প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। 
বিজিএমইএ পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ জনকণ্ঠকে বলেন, শুধু এই খাতটির ওপরে দেশের অর্থনীতির ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে জড়িত। তাই এর পরিচর্যা করাও আমাদের সকলের দায়িত্ব। গ্যাস-বিদ্যুৎ আমাদের এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় বিষয়। এটা না পেলে যেমন উৎপাদন স্থগিত হয়ে পড়বে, তেমনি শ্রমিকদের বেতন-ভাত, বেতন বৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব কোনোটাই দেওয়া সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এলডিসি গ্রাজুয়েশনের জন্য দেশ প্রস্তুত নয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, গ্রাজুয়েশনের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তেমন কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই। এর জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ চুক্তি হয়নি। আমাদের কোনো মাদার পোর্ট নেই, চট্টগ্রাম যেতে নেই কোনো উন্নত মহাসড়ক। ফলে এই পথে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার।

ব্যাংক সুদের হার, এসএমই খাতে ঋণ পেতে সমস্যা, চট্টগ্রাম বন্দরের ফি একবারে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধিতে আমাদের সার্বিক কার্যক্রম বাধগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে পোশাক খাতে সরকার পূর্বে যে প্রণোদনা দিত তার ৬০ শতাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকান, সেখানে সরকার গার্মেন্টস খাতের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। সেখানে বিনিয়োগের পর রিটার্নের সঙ্গে সরকার আরও দেয়। দক্ষিণ ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও দিচ্ছে সরকার। আবার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এফটিএ চুক্তিও করে ফেলেছে ভারত। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগীদের সঙ্গে আমরা কিভাবে টিকে থাকব? 
অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাক খাতের মতো এমন পরিস্থিতি এখন দেশের অর্থনীতির। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ব্যাংক খাতে ২৭ শতাংশের ওপরে নন-পারফর্মি লোন (খেলাপি ঋণ) বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করে ফেলেছে। অপরদিকে মাত্র ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (বিপিএম-৬) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি এখন পর্যন্ত ৮ শতাংশের ওপরে। বাড়ছে বেকারত্বের হার (৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ), যেখানে আংশিক বেকারত্ব ৩৮ শতাংশ এবং দারিদ্র্যের হার ২৮ শতাংশ।

বৈদেশিক ঋণ ১১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, অথচ কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৬ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিতে নেই কোনো বৈচিত্র্যকরণ, বরং রপ্তানিমুখী পোশাক খাত প্রায় পুরোটাই আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া কম বৈচিত্র্যকরণ ও উদ্ভাবনে হতদরিদ্র অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে এই খাতের জন্য উচ্চ ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করছে। 
এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ঝুঁকি। এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। মার্কিন শুল্কারোপের দীর্ঘায়িত প্রভাব, করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধুঁকছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। উদীয়মান মানবাধিকার এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ও দায় মূল্যায়ন এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান জনকণ্ঠকে বলেন, পোশাক খাতের জন্য আগামী দিনে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো এলডিসি গ্রাজুয়েশন।

গ্রাজুয়েশনের জন্য আমরা একদমই প্রস্তুত না। গত ১৬ বছরে আমাদের কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি, সরকারের কোনো সাপোর্টও ছিল না। ফলে আমাদের প্রস্তুতিও ছিল না। তবে তার মানে এই না যে, আমরা এলডিসি গ্রাজুয়েশন চাই না। যদি আমাদের গ্যাস দেওয়া হয়, আনইন্ট্রাপ্টেড বিদ্যুৎ পাই, যদি ব্যাংক সুদ ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে তাহলে আমরা গ্রাজুয়েশনে যেতে পারি। পাশাপাশি প্রয়োজন এনবিআর থেকে ব্যবসা সহজীকরণে বিভিন্ন সহায়তা, এসএমই খাতের জন্য ব্যাংকিং সহায়তা এবং সরকারের নীতিগত সমর্থন।
তিনি বলেন, আমাদের গ্যাস সংকট আছে। গত ১৬ বছরে কেন নতুন করে গ্যাস কূপ খনন করা হয়নি সেটা ভাবতে হবে। আমরা যদি গ্যাস কূপ খননে বিনিয়োগ করি তাহলে হয়তো আগামী দিনে কিছু গ্যাস পাব। এই মুহূর্তে এলএনজি আমদানি ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। 
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাশুল যে ৪১ শতাংশ বাড়িয়েছে এর কারণ কি, যেখানে প্রতিবছর আড়াই হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা হয়। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সরকার এই ফি বাড়িয়ে দিল, অথচ বন্দরের যে পারফরমেন্স বিশ্বের ৪শ’টি বন্দরের মধ্যে আমাদের অবস্থান ৩৫০-এরও নিচে। আমরা প্রতিনিয়ত বলছি কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস, এটা অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে। দিস ইজ বিকামিং ভেরি ডিফিকাল্ট। এটা ধীরে ধীরে বাড়ানো যেত।

বন্দর কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান না, বিআরটিসি বা বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো সেবাধর্মী। তারা প্রোফিট করবে; কিন্তু ৫ গুণ ভাড়া বাড়িয়ে দেবে, সেটা হতে পারে না। গত ২০ বছরে ফি বাড়ানো হয়নি এমনটা বলা হলেও সেটা সঠিক নয়। বন্দরে ফি নেওয়া হয় ডলারে। ফলে কখনোই লোকসানে পড়তে হয় না। 
এর বাইরে পোশাক খাতে সাম্প্রতিক নানা দুর্ঘটনা এবং শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়েও কথা বলেন পোশাক মালিক সংগঠনের এই নেতা। তিনি বলেন, নতুন শ্রম অধ্যাদেশে ২০ জনকে নিয়েও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়ন ও শ্রমিকদের উস্কানি এখন রীতিমত বিজনেসে পরিণত হয়েছে।

এত বেশি শ্রমিক সংগঠন হয়েছে যে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখানে ফেডারেশনই আছে ৭০ থেকে ৭৫টি। আবার প্রতিটি ফেডারেশনে ২০ থেকে ২৫টি ট্রেড ইউনিয়ন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ভালো থাকতে পারছে না। গত বছরের অক্টোবরে ব্যাপক মাত্রায় যে শ্রমিক অসন্তোষ হয়েছে আমরা এখনো এটার কারণ খুঁজে পাইনি। তাই আগামী দিনে এই শ্রমিক সংগঠনগুলো বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সরকার যদি এখনই কঠোর না হয় আমরা গার্মেন্টস চালাতে পারব না।

প্যানেল হু

×