ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

উৎপাদন খরচ কমানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ২২:৫২, ১৯ মে ২০২৪; আপডেট: ১০:৫০, ২০ মে ২০২৪

ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে  পণ্যমূল্যে

.

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণের শর্ত পূরণে একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্যে কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে দাম। একলাফে টাকা বাড়ানো হয়েছে ডলারের মূল্যও। এতে করে আমদানিকৃত সব পণ্যের ওপর চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানিতে খরচ বাড়বে অন্তত: থেকে ১০ শতাংশ বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে উৎপাদন ব্যয়ও। যেহেতু এই খাতে ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্ত রয়েছে তাই দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের কাছ থেকেই আদায় করা হবে বাড়তি অর্থ।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে গ্রাহকপর্যায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দাম থেকে টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলপিজির কাঁচামাল প্রোপেন বিউটেন আমদানি খরচ বাড়ায় আগামী মাসে এর দামেও আসবে বড় পরিবর্তন। জরুরি এইসব পণ্যের দাম বাড়লে প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের ওপরই। বাড়বে মূল্যস্ফীতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মিলিয়ে গ্রাহকদের ঘাড়েই বর্তাবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব। তাই দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত বছর কোটি ডলারের বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এলএনজি আমদানি টার্মিনাল ভাড়া বাবদ বছরে খরচ হয় সাড়ে তিনশকোটি ডলার। সবমিলিয়ে জ্বালানি খাতে ব্যয় মোট আমদানির ১৫ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ডলার প্রতি টাকা দাম বাড়ায় খরচ বাড়বে অন্তত থেকে ১০ শতাংশ বেশি। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব স্বল্প মেয়াদে বেশি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল আসতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিতে উৎসাহের পাশাপাশি নিরুৎসাহিত হবেন আমদানিকারকরা। এতে করে বাড়বে রিজার্ভের পরিমাণ।

কিন্তু জরুরি পণ্য বিদ্যুতের উৎপাদনে ব্যবহৃত মূল উপাদান তেল, কয়লা, গ্যাসের প্রায় সবটাই আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রের কোনো সুযোগ নেই। আর তাই উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে সরকারকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া শুরু করেছে। এতে করে এক প্রকার বাধ্য হয়েই চলতি মাসের শেষের দিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হতে পারে জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ জ্বালানিখাতে। কারণ দেশের জ্বালানির প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। এরই মধ্যে বেড়ে গেছে কয়লা, গ্যাস, জ্বালানি তেলের মতো আমদানি পণ্যের ব্যয়। বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির মালিকরা প্রতিদিনই আমাদের চাপ দিচ্ছে দাম বাড়ানোর জন্য। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিলের বড় অংশই পরিশোধ করা হয় ডলারে। ছাড়াও এসব খাতে বকেয়া রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এমন পরিস্থিতিতে বকেয়া পরিশোধে খরচ আরও বেড়ে যাবে।

এলএনজি আমদানিতেও খরচ বাড়ছে। এছাড়াও এলপি গ্যাসের কাঁচামাল বিউটেন প্রোপেন পুরোটাই আমদানি করতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে দাম বৃদ্ধি পাবে এলপি গ্যাসেরও। ডলারের দাম বৃদ্ধিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতেই ডিজেল, অকটেন পেট্রোলের দাম বাড়তে পারে থেকে টাকা পর্যন্ত। বিদ্যুতের দাম ঠিক কি পরিমাণ বাড়বে তা এখনই বলা না গেলেও আশা করা হচ্ছে তা গ্রাহকদের জন্য সহনীয়ই রাখা হবে।

সরকারের নির্বাহী আদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক বছরের মাথায় গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। ওই সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে সাড়ে শতাংশ বাড়ানো হয়। ওই দর অনুসারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে বাড়ে ৭০ পয়সা। যা ওই মাস থেকেই কার্যকর হয়। বাসাবাড়িতে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য দাম বাড়ে ইউনিটপ্রতি ২৮ পয়সা। আর সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য বেড়েছে টাকা ৩৫ পয়সা। সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ৪৩ পয়সা।

এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইউনিটপ্রতি খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে টাকা ২৫ পয়সা থেকে  বেড়ে টাকা ৯৫ পয়সায় দাঁড়ায়। আর পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় গড়ে শতাংশ। এতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় টাকা পয়সায়। কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও আইএমএফের শর্তপূরণের অংশ হিসেবেই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তবে এবার আর আইএমএফের শর্ত পূরণ নয় বরং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণেই দাম বাড়াতে হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, ডলারের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ইতোমধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিকরা আমাদের কাছে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছেন কয়েক দফায়। আমরা সব বিবেচনা করছি। যেহেতু এই খাতে ভর্তুকি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে তাই বাড়তি খরচের সমন্বয়ে দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে গ্রাহক ভোগান্তি যেন না হয় সে ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকি ৮৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আইএমএফ চায়, দাম সমন্বয় করে (বৃদ্ধি করে) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে। অর্থাৎ এই খাতে কোনো ভর্তুকি চায় না ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা এই সংস্থা। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে দাম বাড়িয়ে তা নিয়ে আসা হবে উৎপাদন খরচের সমান বা কাছাকাছি পর্যায়ে। এমনিতেই সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। এত চাপ ভোক্তা নিতে পারবে না। এখন আবার ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এটি আত্মঘাতী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, মূল্য বৃদ্ধি না করে বিদ্যুৎ খাতে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি আছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জ সরকারের জন্য গলার কাঁটা। পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে।

প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ জনকণ্ঠকে বলেন, আইএমএফের কথা শুনলে জনগণের ওপর চাপ বাড়বে, এটি খুবই স্বাভাবিক। এখন কথা হচ্ছে, সরকার তাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। কাজেই তাদের কথা তো শুনতেই হবে। এটি তো সরকারের নীতির দুর্বলতা। সরকার কেন ধরনের শর্তে ঋণ নিচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে জনগণ আরও দিশেহারা হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি মনে করি, বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পুনর্গঠন করা দরকার। সেখানে আলোচনা করে দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জানা গেছে, তেল-গ্যাসে এখন ভর্তুকি নেই। আইএমএফের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি জ্বালানি খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করেছে। পেট্রোবাংলা বিপিসি প্রায় একইভাবে আইএমএফকে জানিয়েছে, গ্যাস জ্বালানি তেলে নতুন করে ভর্তুকির চাপ নেই। তেলের দাম নিয়ে স্বয়ংক্রিয় যে পদ্ধতি (আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে দেশে বাড়বে, কমলে কমবে) চালু করার কথা আইএমএফ বলেছিল, তা হয়েছে। প্রতিমাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি তেলে আর কখনো ভর্তুকি দিতে হবে না।

প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়। ঘাটতি মেটাতে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। আগামী তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হবে। এর অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত মার্চ মাসে বিদ্যুতের দাম সরকার একবার বাড়ায়।

কিন্তু এখন আবার একদিনে টাকা ডলারের দর বাড়ায় বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির তেলের মূল্য আবার বাড়ানো হলে আমদানিকৃত সকল পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সর্বশেষ এর দায়ভার ভোক্তা বা দেশের জনগণকে বহন করতে হবে। প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মো. সহিদুল হক মোল্লা বলেন, আইএমএফের ঋণ প্রয়োজন আছে। তবে সংস্থাটির বেশকিছু শর্ত পরিপালনের ফলে ভোক্তা সমাজ বেকায়দায় পড়বেন। বিশেষ করে সব ধরনের আমদানিপণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এর ফলে ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে কৃষি যন্ত্রপাতি, মেশিনারিজ, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হবে। দিনশেষে এর দায়ভার পড়বে ভোক্তার ওপরই। বর্তমান সরকার জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের কথা বলছে। তবে আইএমএফের এসব শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যাতে না বাড়ে সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ছাড়া ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কর্মসংস্থান তৈরি করেন। তাই উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা যাতে নিরুৎসাহিত না হয়ে পড়েন সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

সম্প্রতি আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ত্যাগের আগেই অস্থির হয়ে পড়ে ডলারের বাজার। সংস্থাটির পরামর্শে ডলারের দাম বাড়িয়ে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে খোলা বাজারে ডলারের দর ১২৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ক্রলিং পেগ বিনিময় হার পদ্ধতি চালু করেএবং ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১১৭ টাকায় মার্কিন ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নতুন বিনিময় হার পদ্ধতি চালু করায় মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার মান কমেছে দশমিক শতাংশ। পদ্ধতিতে প্রতি মার্কিন ডলারে ক্রলিং পেগ মিড রেট (সিপিএমআর) নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা।

×