ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

বাংলাদেশ

উন্মুক্ত হবে সবকটি বাণিজ্যিক পথ বরিশাল হবে বাণিজ্যিক নগরী

পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ২১:১৪, ২১ মে ২০২২

পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার অসমাপ্ত সেই স্বপ্ন নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী জুন মাসে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। ফলে এক সময়ের অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলবাসী তাদের ভাগ্য উন্নয়নের আশায় বুক বেঁধেছেন। একই সঙ্গে চরম বেকায়দায় পরেছেন পদ্মা সেতু নির্মার্ণের শুরুতে দেশ-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা। তাদের সব ষড়যন্ত্রকে পিছু ফেলে বৃহৎ এ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।জাতির পিতার স্বপ্নের রূপকার তারই কন্যা, মানবতার বাতিঘর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব ও সাহসিকতায় পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন শুধু স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর পরই উন্মুক্ত হবে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়কপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সরাসরি যোগাযোগের সবকটি বাণিজ্যিক পথ। দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্প ও নতুন শিল্পায়নের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হওয়ার পাশাপাশি বিভাগীয় শহর বরিশাল হবে বাণিজ্যিক নগরী। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ের অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলবাসীর ভাগ্য উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশসহ চিরঋণী হওয়ার কথা জানিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতারা। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে গত এক সপ্তাহ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরের নেতারা এ সেতু নিয়ে একটি মহলের নানা ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপনসহ প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করছেন। অপরদিকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বরিশালের সঙ্গে ফেরীবিহীন সড়কপথে যোগাযোগের জন্য নামীদামি বিভিন্ন বেসরকারি পরিবহন কোম্পানির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ওইসব পরিবহন কোম্পানির প্রতিনিধিরা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বাসষ্ট্যান্ডগুলোতে কাউন্টার স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন। বরিশালের কৃতি সন্তান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সদস্য সৈয়দা রুবিনা আক্তার মিরা এমপি বলেন, বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে তাদের কাজ গুটিয়ে নিয়েছিল, তখন পদ্মা সেতু প্রকল্প অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা পড়ে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে সেই মেঘ কেটে গেছে। আজ পদ্মা সেতু রঙিন কোনও স্বপ্ন নয়। বিশ্বের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু এখন একটি মাইলফলক। সচেতন নাগরিক কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ সাজেদা বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর ভাগ্য উন্নয়ন ঘটাতে নতুন শিল্পায়নের যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে তার প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস। ফলে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাণিজ্যিক যাত্রার সাফল্য পেতে ভোলা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে বরিশালে গ্যাস আনার কোন বিকল্প নেই । বরিশালের কৃতি সন্তান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার বলেন, পদ্মা ও পায়রা সেতুকে ঘিরে তাই বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠতে শুরু করেছে হোটেল-মোটেলসহ অসংখ্য ছোট-বড় শিল্পায়ন কল-কারখানা। জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। পাশাপাশি গড়ে উঠবে ব্যবসায়ীক সর্ম্পক। বাড়বে এখানকার পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে লোক সমাগম। এতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে। বরিশালের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তী বলেন, পদ্মা ও পায়রা সেতু বিভাগের পুরোনো চেহারা বদলে দিচ্ছে। তবে পদ্মা সেতুতে যানবাহনের চলাচল শুরুর আগেই বরিশালের সাংসদ, প্রশাসন, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, রাজনিতীবিদ ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে সমন্বিত একটি উন্নয়ন কমিটি হওয়া জরুরি। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, স্বপ্নের পদ্মা ও পায়রা সেতু নির্মাণ হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও জীবন-জীবিকা বদলে যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চল বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। এ জনপদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করবে পদ্মা সেতু। বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, ভোলার গ্যাস যদি নিশ্চিত এসে যায়, আর যদি সরকারের এ অঞ্চলে উন্নয়নের স্বদিচ্ছা থাকে, তাহলে গার্মেন্টস শিল্পকে গুরুত্ব দিলে দক্ষিণাঞ্চলের বেকার সমস্যা চিরদিনের জন্য দূর হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের মতো বরিশালেও ইপিজেড স্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে । বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়া আর বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হওয়া একই কথা। বেশকিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো খুলনা নির্ভর। সেগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামী লীগের একমাত্র অভিভাবকখ্যাত বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি বলেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়া মাত্রই বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক যাত্রার সূচনা দক্ষিণাঞ্চলের অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা তার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও বাণিজ্যিক সুবিধা পৌঁছে দেব । খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের হাতে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখে ইতোমধ্যে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা শত শত একর জমি ক্রয় করেছেন। পায়রা বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন, দৃষ্টিনন্দন ফোর লেনের পায়রা সেতুর পাশাপাশি শেরে বাংলা নৌ-ঘাঁটি ও ইপিজেড স্থাপিত হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চল পরিণত হবে অর্থনৈতিক জোনে। পায়রা সমুদ্র বন্দরের নিরাপত্তা এবং ব্লু ইকোনমি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কলাপাড়ার লালুয়ায় শেরে বাংলা নৌ-ঘাঁটি স্থাপনে কাজ শুরু হয়েছে। সবমিলিয়ে একস ময়ের অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে উন্নয়নের মহাসড়কে বাকি রইল শুধু রেলপথ ও গ্যাস। উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন যাবে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত। সেই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় দক্ষিণাঞ্চলবাসী রেলপথ ও গ্যাস পাবেন বলেও শতভাগ আশাবাদী। ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনাময় দক্ষিণাঞ্চলে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। সারাদেশ থেকে পর্যটকদের কুয়াকাটায় আসতে কক্সবাজারের চেয়ে কম সময় লাগবে। ফলে পর্যটকদের আগমনে জমে উঠবে কুয়াকাটা। সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা।