ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ॥ জাতির বিক্ষত বিবেক

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ২৫ আগস্ট ২০২০

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ॥ জাতির বিক্ষত বিবেক

(গতকালের পর) মেজর রশীদ, মেজর ফারুক ও উল্লিখিত সামরিক বাহিনীর অফিসাররা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। মেজর রশীদ বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদের আত্মীয় আর মেজর ফারুক মেজর রশীদের ভায়রা ছিল। মেজর রশীদ বঙ্গবন্ধু সরকারের কার্যকলাপকে ইসলাম পরিপন্থী ও সামরিক বাহিনীর গোষ্ঠীয় স্বার্থের প্রতিকূল মনে করত। মেজর ফারুক ‘৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা জ্যেষ্ঠতর মেজর মমিনের কাছে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তার অধীনস্থ একই রেজিমেন্টের দ্বিতীয় অধিনায়ক হতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণে মেজর ফারুক ২ বছরের জ্যেষ্ঠতা পায়নি। মেজর ডালিম ও মেজর নূর শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়। অন্য আসামি সেনা অফিসাররা মেজর রশীদ ও মেজর ফারুকের অধীনস্থ কিংবা অনুগত ছিল। মোশতাক ছিল অতি ডানপন্থী রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনে বিশ্বাসী উচ্চ অভিলাষী ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধু তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলে সে ক্ষুব্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেবেন বলে তার আশঙ্কা ছিল। ’৭৫ সালের মার্চ মাস থেকে মন্ত্রী মোশতাকের সঙ্গে কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, দাউদকান্দি মাদ্রাসা, গাজীপুরে সালনায় স্কুল ও ঢাকার বাসায় এরা ষড়যন্ত্রমূলক সভায় মিলিত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিদিত অপরাধ ঘটানোর জন্য এগিয়ে আসে। এসব ষড়যন্ত্রমূলক সভায় অন্যতম অংশগ্রহণকারী ছিল মাহবুবুল আলম চাষী ও তাহেরউদ্দীন ঠাকুর। বঙ্গবন্ধুর সরকার তাকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে পদস্থ না রাখায় চাষী বিক্ষুব্ধ ছিল। তাহেরউদ্দীন ঠাকুর ছিল মোশতাকের অনুগত ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এসব সেনা অফিসার বেতারের ম্যাধ্যমে তা প্রচার করে খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। দেশের প্রধান বিচারপতি সায়েম বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে অবজ্ঞা ও সংবিধান লংঘন করে এবং সংবিধান রক্ষা করার জন্য তার নেয়া শপথ ভঙ্গ করে মোশতাককে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করায়। জোর করে তিন বাহিনীর প্রধানকে দিয়ে মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করিয়ে একটি অঘোষিত কমান্ড কাউন্সিলের মাধ্যমে বঙ্গভবনে অবস্থান করে এসব বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী অফিসার মোশতাকের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করার অপপ্রয়াস পায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে কমান্ড কাউন্সিলের এসব অফিসার উপসেনা প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান, মন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও মোশতাকের সঙ্গে মিলে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা তৈরি করে (দ্রষ্টব্য, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর প্রদত্ত জবানবন্দী)। ’৭৫ সালের ২৪ আগস্ট জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান এবং ব্রিগেডিয়ার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে (পরবর্তী কালের সংবিধান লঙ্ঘনকারী স্বৈরশাসক) মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে উপ-সেনাপ্রধান করা হয়। মোশতাক ও পরে জেনারেল জিয়া ’৭৫ সালের ৭ নবেম্বরের পরে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে এসব অফিসারকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেয় এবং বিদেশে নিরাপদ ও সুখী অবস্থানে পদস্থ করে। এদের মধ্যে মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক বিদেশে পদ নেয়নি। সেনাবাহিনীতে সুনির্দিষ্ট পদ বা দায়িত্ব না দিয়েও এই দু’জনকে লেঃ কর্নেল পদবীতে উন্নীত করা হয়। ’৭৫ সালের তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের পর তাদেরকে বিদেশে যেতে দেয়া কিংবা পাঠানো হয়। ’৭৬ সালে তারা উভয়েই দেশে ফিরে এসে সাভার ও বগুড়ায় সেনা বিদ্রোহ ঘটাবার অপপ্রয়াস চালিয়ে ব্যর্থ হয়। জেনারেল জিয়া এবারও এদের বিরুদ্ধে কোন আইনী ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এদেরকে আবার বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। ’৮০ সালের শেষের দিকে সেনাবাহিনীর এই সব অফিসার রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আরও একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করে আবারও ব্যর্থ হয়। ফলত আবার তারা সকলে চাকরিচ্যুত হয় এবং বিদেশে ফেরারি জীবন যাপন করতে থাকে। জেনারেল হুসাইন মোঃ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে তাদেরকে দ্বিতীয়বার পুনর্বাসন করে এবং তাদের সকল বকেয়া বেতন পরিশোধ করে (দ্রষ্টব্য, সাক্ষী ৪৪ কর্নেল সাফায়েত জামিলের সাক্ষ্য)। ‘৮৬ সালে এরশাদের আমলে লেঃ কর্নেল ফারুককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করা হয়। এরশাদের পতনের পর ’৯০ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত লেঃ কর্নেল রশীদকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য খালেদা জিয়ার সরকারের অপচেষ্টা প্রযুক্ত থাকে। ’৯৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারি সেই প্রহসনমূলক নির্বাচনে তখনকার বিএনপি জান্তার তরফ থেকে লেঃ কর্নেল রশীদকে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে বিরোধী দলীয় নেতার পদে পদাসীনও করা হয়। ’৯৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারির সেই প্রহসনমূলক নির্বাচনে বিএনপির প্রভাবাধীন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকে কুষ্টিয়ার গাংনি থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই নৃশংস হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় লন্ডনে ১৯৭৬-এর ৩০ মে প্রকাশিত সানডে টাইমসে মেজর ফারুক রহমানের ছবিসহ তার একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। এই বিবৃতিতে ফারুক দম্ভোক্তি করে বলে, ‘আমি মুজিবকে খুন করায় সহায়তা করেছি, সাহস থাকলে আমাকে বিচারে সোপর্দ কর’। এর সঙ্গে সাংবাদিক এন্থনী মাসকারোনাসের কাছে দেয়া ‘এক ভিডিও’ সাক্ষাতকারে মেজর ফারুক ও মেজর রশীদ (তখনও লেঃ কর্নেল পদে তাদের পদোন্নয়ন দেয়া হয়নি) সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী হিসেবে নিজেদের বিবৃত করে। এই লক্ষ্যে তারা তাদের পরিকল্পনা ও সহযোগীদের কথা ভিডিও সাক্ষাতকারে প্রকাশ করে। এই পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় তখনকার উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথাও তারা প্রকাশ করে। বিচারে উপস্থাপিত প্রমাণ হিসাবে যুক্তরাজ্যের নোটারি পাবলিক কীথ রবার্ট হপকিনস কর্তৃক এই ভিডিও সত্যায়িত হয়েছিল (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার এক্সিভিট, ৩২ দ্রষ্টব্য)। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকা-ের দায়ে অভিযুক্ত আসামিদের পক্ষ হতে সাফাই হিসেবে দাবি করা হয় যে, ঐ হত্যাকা-ের সঙ্গে তারা কেউ জড়িত ছিল না। কোন তৃতীয় পক্ষ ঐ হত্যাকা- ঘটিয়েছে। আরও বলা হয় যে, সামরিক আইনের আওতায় ঐ হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে এবং সেজন্য আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই হত্যার জন্য দেশের সাধারণ আইনে অর্থাৎ দ-বিধির আওতায় তাদের বিচার হতে পারে না। আসামিগণ তাদের প্রতিরক্ষণে কোন সাক্ষী হাজির করেনি বা করতে পারেনি। সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে হত্যাকা-ের সঙ্গে আসামিগণের সংশ্লিষ্টতা সকল সন্দেহের ওপর প্রমাণিত হওয়ায় তৃতীয় কোন শক্তি কর্তৃক হত্যাকা-টি ঘটানোর সম্ভাবনা স্বীকার করা যায় না। সাক্ষ্য প্রমাণে তৃতীয় কোন শক্তির সংশ্লিষ্টতা কখনও উপস্থাপিত হয়নি। ফৌজদারি কার্যবিধির (মিলিটারি অফেনর্ডাস) ২নং ধারা অনুযায়ী দেশের সেনাপ্রধান ’৯৭ এর ২ এপ্রিল বেসামরিক আদালতে সংশ্লিষ্ট সেনা সদস্যদের বিচারের ক্ষেত্রে সেনা আইনের বিধানে কোন বাধা নেই বলে জানিয়েছিলেন। মামলায় প্রাপ্ত মৌখিক, দালিলিক, তথ্যগত ও অবস্থানগত সাক্ষ্য ও আলামত এবং আসামিদের পরীক্ষা, পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করে বিচারক কাজী গোলাম রসুল (১) লেঃ কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, (২) লেঃ কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, (৩) লেঃ কর্নেল মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারী), (৪) পলাতক লেঃ কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ, (৫) পলাতক মেজর বজলুল হুদা, (৬) পলাতক লেঃ কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, (৭) পলাতক মেজর আহমদ শরফুল হোসেন ওরফে শরিফুল ইসলাম, (৮) পলাতক লেঃ কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরী, (৯) পলাতক লেঃ কর্নেল এ কে এম মুহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার), (১০) পলাতক লেঃ কর্নেল এস এইচ এম টি নূর চৌধুরী, (১১) পলাতক লেঃ কর্নেল আবদুল আজিজ পাশা, (১২) পলাতক ক্যাপ্টেন মোঃ কিসমত হাশেম, (১৩) পলাতক ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসার, (১৪) পলাতক ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, (১৫) পলাতক রিসালদার মোসলেম উদ্দিনকে দ-বিধির ৩০২/৩৪ ধারায় তাদের বিরুদ্ধে সকল সন্দেহের উর্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদ-ে দ-িত করেন। বিচারকের মতে, এই নৃশংস হত্যাকা-ের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে স্বজ্ঞানে জ্ঞাত থেকে পরস্পরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ও পরিকল্পিতভাবে তারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। বিচারকের রায়ে দ্বিধাহীনভাবে বলা হয়েছে যে, সেজন্য তাদের প্রতি কোন সহানুভূতি ও অনুকম্পা প্রদর্শনের যুক্তি নেই। এদের বাইরে, আসামি (১) তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, (২) অনারারী ক্যাপ্টেন আবদুল ওহাব জোয়াদার, (৩) দফাদার মারফত আলী ও (৪) এল ডি আবদুল হাশেম মৃধার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বিধায় বিচারক তাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ থেকে অব্যাহতি দেন। বিচারক বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার পরিজন ও অন্যদের হত্যার প্রক্রিয়ায় তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের কোন স্পষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টতার সাক্ষ্য প্রমাণ পাননি। হত্যার ঘটনার পর রেডিও স্টেশনে গমনসহ ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সে জড়িত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও অন্যদের হত্যার ঘটনাত্তোর পর্যায়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিচরণের ভিত্তিতে তাকে হত্যা কিংবা হত্যার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করা যায় না বলে বিচারক সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। আনারারি ক্যাপ্টেন আবদুল ওহাব জোয়ারদার, দফাদার মারফত আলী ও এল ডি আবদুল হাশেম মৃধার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণগুলো পরস্পরকে সমর্থন করে না বলে বিচারক তাদেরকে সন্দেহের উপযোগ বা সুবিধা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, আবদুল ওহাব জোয়ারদারের বিরুদ্ধে হত্যাকা-ের পর রাষ্ট্রপতির বাসভবন থেকে মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী তছরুপ বা লুট করার সাক্ষ্য হাবিলদার মোঃ কুদ্দুস (সাক্ষী ৪) দিয়েছিলেন। এছাড়া আবদুল ওহাব জোয়ারদার কর্তৃক রাষ্ট্রপতি ভবনের নিরাপত্তায় প্রযুক্ত সেনাদের কাছ থেকে গোলাবারুদ মিথ্যা কথা বলে সরিয়ে নিয়ে ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে ঐ ভবনে বিপথগামী ষড়যন্ত্রকারী সেনাদের আক্রমণের প্রতিকূলে নিষ্ক্রিয়তা আনয়নের সাক্ষ্য (সাক্ষী ৫ নায়েক সুবেদার গণির সাক্ষ্য) বিচারক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যত বিবেচনায় আনেননি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ’৭৭ এর ২৭ এপ্রিল সেনাবাহিনীর তখনকার এডজুটান্ট জেনারেল ব্রিগেডিয়ার নুরুল ইসলাম সেনাবাহিনী থেকে ওহাব জোয়াদারের অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে তার কর্তব্যপরায়নতা, একনিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের প্রশংসা করে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছিলেন (সেনাসদর, আধা-সরকারী নং ৩০১৯/১৪ এজি এপ্রিল ২৭, ১৯৭৭)। এই বিচারের প্রক্রিয়ায় কতিপয় তাৎপর্যমূলক ও কৌতুহলউদ্দীপক তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। এক, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ৪টি ঘটনা বা অপরাধের যথার্থ বিচার এখনও হয়নি। ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের সেই রাতে মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে সপরিবারে বিপথগামী সেনাদের দিয়ে হত্যার বিষয়ে দেয়া এজাহারের ভিত্তিতে ও পরবর্তীকালে এই বিষয়ে সমাপ্ত তদন্তের আলোকে এখনও তাদের হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি। একই সময়ে শেখ ফজলুল হক মনি ও আরজু মনির হত্যার বিষয়ে এজাহার দেয়া কিংবা নেয়া এবং তার ভিত্তিতে তদন্ত হয়েছিল কিনা, এখনও জানা যায়নি। এদের হত্যাকা-ের জন্য দায়ী কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর হত্যার দায়ে শাস্তি পেলেও সকল হত্যা ও সহায়তাকারীর বিচার হয়েছে বলা যায় না। ’৭৫ সালের সেই কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রক্রিয়ায় ট্যাঙ্ক থেকে ছোড়া কামানের গুলিতে মোহাম্মদপুরে জনৈক রিক্সাচালক ও বিয়ের গায়ে হলুদ নেয়া এক যুবকের নিহত হওয়া, আরও ১২ পথচারী ও বাসায় অবস্থানরত সাধারণ নাগরিকদের গুরুতরভাবে আহত এবং বাংলাদেশ টিভির সদর অফিসে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিয়ে খুন বা গুম হওয়া দু’জন কর্মকর্তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কোন তদন্ত হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। চার জাতীয় নেতাকে ’৭৫-এর ৩ নবেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলে হত্যাকরণের বিচার ২০০১ এর অক্টোবরে সরকার পরিবর্তনের পর সুষ্ঠুভাবে হাতে নেয়া এবং আসামিদের যথার্থ শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ঐ সরকারের তরফ হতে ঈপ্সিত প্রচেষ্টা প্রযুক্ত হয়নি। এই প্রক্রিয়ার যারা প্রতিরোধী ছিলেন তাদের এখনও শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা যায়নি। তেমনি ’৭৫-এর নবেম্বরের তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ ও ১জন মহিলা ডাক্তারসহ ১৩ জন অফিসার খুন করার কোন তদন্ত ও বিচার এখনও হাতে নেয়া হয়নি। বলা প্রয়োজন হত্যার বিচার সমাজে শক্তির মদমত্ততায় বাধা দেয়া বা অস্বীকার করার এরূপ ঘটনা সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের হানি করে। দুই, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের বিচারে প্রদত্ত সাক্ষ্য ও উত্থাপিত কাগজপত্রে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নাম বার বার এসেছে। ’৯৬ সালের ১২ নবেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আফজালুর রহমানের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লেঃ কর্নেল রশীদের স্ত্রী জোবায়দা রশীদ কর্তৃক প্রদত্ত স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ও নায়ক মেজর রশীদ, মেজর ফারুক ও অন্যদের সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যোগাযোগ রাখত। তার বিবৃতি অনুযায়ী ঐ সময়ে ষড়যন্ত্র করার একরাতে মেজর ফারুক মেজর জেনারেল জিয়ার বাসা থেকে ফিরে মেজর রশীদকে জানায় যে, সরকার পরির্বতন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। জেনারেল জিয়া নাকি এই প্রসঙ্গে তাদের বলেছিল, যদি এ (ষড়যন্ত্র) সফল হয় আমার কাছে এসো, না হলে আমাকে সংশ্লিষ্ট করো না। এর ক’দিন পর মেজর ফারুক জেনারেল জিয়ার বরাত দিয়ে মেজর রশীদকে বলে যে, জিয়া ষড়যন্ত্র অনুযায়ী কাজ করার লক্ষ্যে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজতে বলেছে যে দায়িত্ব নিতে পারবে। এরপর মেজর রশীদ তার আত্মীয় খন্দকার মোশতাককে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই ষড়যন্ত্রে সংশ্লিষ্ট করে। জোবায়দা রশীদ আরও বলে যে, (১৯৭৫ সালের) ১৫ আগস্ট বিকালেই বঙ্গবভনে জেনারেল জিয়াউর রহমান মেজর রশীদের কাছে সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য ঘুর ঘুর করছিল। পরে ১৬ বা ১৭ আগস্ট ‘প্রাক্তন মন্ত্রী’ সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, রশীদ ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে সেনাপ্রধান করার বিষয় ঠিক হয়। পরিবর্তিত পটে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবে, সাইফুর রহমান ও রশীদ মন্ত্রী হবে- এই উদ্দেশ্যে জিয়াকে সেনাপ্রধান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে কর্নেল ফারুক তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে উপরোক্তভাবে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য সাইফুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা অতিরিক্ত তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় সমর্পিত হয়নি। মামলায় উপস্থাপিত এক্সিভিট (এক্সিভিট নং ১০ (৫) এ) এ দেখা যায় যে, ’৭৬-এর ১৬ আগস্ট সেনাপ্রধান (জেনারেল জিয়াউর রহমান) এই মামলার আসামি-খুনী ১২ জন সেনা অফিসারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বিদেশী মিশনে ৩য় থেকে ১ম সচিব হিসেবে নিযুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিক অথচ গোপনীয় নির্দেশপত্র জারি করে (সেনাসদর নং ৫৩০৪/৪৯/এমএস ৫ তারিখ-১৬/৮/১৯৭৬)। জোবায়দা রশীদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায় যে, মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক বিদেশী মিশনে জেনারেল জিয়ার পক্ষ থেকে দেয়া চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ’৭৫ এর ১৭ নবেম্বরে অতিরিক্ত মুখ্যনগর হাকিম মোঃ হাবিবুর রহমানের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিতে আসামি-খুনী লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলে যে, জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব অনুযায়ী মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক বিদেশী মিশনে চাকরি না নিয়ে ’৭৬ সালে গোপনে বাংলাদেশে ফিরে এসে সেনা অভ্যুত্থানের অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এতদসত্ত্বেও জেনারেল জিয়া তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে তাদেরকে বিদেশে ফেরত পাঠায়। লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলে যে, এতে তার মনে হয়েছিল যে, ১৫ আগস্টের ঘটনায় জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেই এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। উল্লেখ্য, ’৯২ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উত্তরবঙ্গের ঘোড়াঘাট এলাকায় সেনাবাহিনীর শীতকালীন মহড়া উপলক্ষে গিয়ে খুনের আসামি লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একান্তে দেখা করেন। খুনের আসামি লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিনকে তখন আবক্ষলম্বিত দাড়ি সমৃদ্ধ ছদ্মবেশে দেখা যায়। এই বছর ১১ এপ্রিল খুনী ক্যাপ্টেন মাজেদকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে সে অকপটে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে জেনারেল জিয়ার ভূমিকা তুলে ধরেছে। জাতির বিক্ষত বিবেকের পটে জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার করে তার প্রকৃত স্বরূপ আইনানুগভাবে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য উন্মোচিত করা প্রয়োজন। চলবে... লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য
×