মঙ্গলবার ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৮ জুন ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

দেখার কেউ নেই তবুও ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া

দেখার কেউ নেই তবুও ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া
  • বাঁচিয়ে রেখেছে রঙিন জীবনের স্বপ্ন

মোরসালিন মিজান ॥ যারপর নাই বৈরী সময়। সবাই ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়েছে। বাইরের পৃথিবী দেখা আজ বারণ। এমনকি মানুষ মানুষের মুখ দেখতে পারছে না। প্রতিটি মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা। এ অবস্থায় কৃষ্ণচূড়া দেখার সুযোগ কই? জনমানবহীন ফাঁকা রাস্তা। শূন্য উদ্যান। দেখার কেউ নেই। তবুও, কী আশ্চর্য, ঠিক ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া!

রাজধানীতে অনেক গাছ। পরিকল্পনা করেই লাগানো হয়েছিল। সংখ্যায় কত তা চট করে গুনে ফেলা যাবে না। তবে শহরজুড়েই আছে। সারাবছর গাছগুলো খুব চোখে পড়ে এমন নয়। লাল টুকটুকে ফুল ফুটতেই বদলে যায় ছবিটা। উঁচু এবং ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গাছের পুরোটা ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। দেখে সে আপনার যতই মন খারাপ থাকুক, ভাল হয়ে যাবেই যাবে।

বছর ঘুরে আবারও এসেছে কৃষ্ণচূড়ার দিন। আজ এমন এক সময়ে প্রিয় ফুল ফুটতে শুরু করেছে যখন ঘরবন্দী মানুষ। করেনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে স্বেচ্ছায় গৃহে আশ্রয় নিয়েছে। গোটা দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সাধারণ ছুটি। তারও আগে থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে রাজধানীবাসী। কিন্তু কে জানত দুঃসময় এত লম্বা হবে? এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং সামনের দিনগুলোতে বিপদ বাড়ার আশঙ্কা আছে। মন তাই বিষণœ। চার দেয়ালের ভেতরে থাকতে থাকতে জীবনের রং কেমন যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। বিবর্ণ ম্যারমেরে ঠেকছে সবকিছু। ঠিক তখনই রঙিন, আরও রঙিন হয়ে ধরা দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়া।

Sheikh Rasel

বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্রীষ্মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফুলটির নাম কৃষ্ণচূড়া। প্রতিবারের মতো বৈশাখের শুরুতেই ফুটতে শুরু করেছিল। ক্রমে গাঢ় লাল রংয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ সড়কের দুই ধারে, পার্কে-উদ্যানে, পুরনো ভবনের কার্নিশে দৃশ্যমান হচ্ছে কৃষ্ণচূড়া।

গত কয়েকদিন রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস, হাতির ঝিলসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে মনে হয়েছে, এ শহর কৃষ্ণচূড়ার। অন্যান্য সময় দূরন্ত পথশিশুদের ডাল ভাংতে দেখা যায়, ফুল ছিঁড়তে দেখা যায়। এবার তেমন কোন ছবি চোখে পড়ছে না। জাতীয় সংসদ ভবনের পেছনের রাস্তার দুই ধারে কৃষ্ণচূড়ার সারি। দেখতে কী যে ভাল লাগছে! বৃহস্পতি ও শুক্রবার কয়েক দফা বৃষ্টি হয়েছে। দমকা হাওয়াও ছিল। হয়তো তাই কিছু ফুল নিচে পড়েছিল। কিন্তু হায় কুড়োনোর লোক নেই!

উদ্ভিদবিদদের দেয়া তথ্য মতে, কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। এটি ফাবাসিয়ি পরিবারের অন্তর্গত। গুলমোহর নামেও ডাকা হয়। আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ১৮২৪ সালে সেখান থেকে প্রথম মুরিটাস, পরে ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার ঘটে। এখন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, কৃষ্ণচূড়া ভারত উপমহাদেশে এসেছে তিন থেকে চার শ’ বছর আগে। বাংলাদেশেও আছে বহুকাল ধরে।

তবে ফুলের নাম কী করে কৃষ্ণচূড়া হলো সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায় না। কারও কারও মতে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অবতার কৃষ্ণের নামে ফুলটির নামকরণ করা হয়েছে। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে, কৃষ্ণের মাথায় চুলের চূড়া বাঁধার ধরনের সঙ্গে ফুলটির বেশ মিল। সেখান থেকেই কৃষ্ণচূড়া নামকরণ।

উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মার গবেষণা থেকে জানা যায়, এই ফুল বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে ফুটে থাকে। বাংলাদেশে ফোটে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত। প্রথম মুকুল ধরার কিছু দিনের মধ্যেই পুরো গাছ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। ফুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল রং। তরুরাজ্যে এত উজ্জ্বল রং দুর্লভ। ফুলের পাপড়ির রং গাঢ় লাল, কমলা, হলুদ, হালকা হলুদ হয়ে থাকে। প্রস্ফুটিত ফুলের ব্যাস ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। বৃত্তির বহিরাংশ সবুজ। ভেতরের অংশ রক্তিম।

দ্বিজেন শর্মার বর্ণনা মতে, কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো বড় চারটি পাপড়িযুক্ত। পাপড়ি প্রায় ৮ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হয়ে থাকে। জটিল পত্রবিশিষ্ট। প্রতিটি পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। উপপত্র হয় ২০ থেকে ৪০টি। তথ্যগুলো, না, মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই এবার। সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন না সবাই। নাকি পারবেন? যদি সহসাই দূর হয় করোনা, বিদায় নেয়, কৃষ্ণচূড়ার রঙে নিজেকে সাজাবে মানুষ। নিশ্চয় সাজাবে।

শীর্ষ সংবাদ: