ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

বস্তিগুলো করোনা ছড়ানোর মারাত্মক ঝুঁকিতে

প্রকাশিত: ১১:৩৬, ২৫ মার্চ ২০২০

বস্তিগুলো করোনা ছড়ানোর মারাত্মক ঝুঁকিতে

গাফফার খান চৌধুরী ॥ মহান আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলেই টিকে থাকা সম্ভব। অন্যথায় কোন রাস্তা নেই। কারণ যেভাবে দেশে-বিদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে তাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছি আমরা বস্তিবাসীরা। কারণ করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে যেসব নিয়ম কানুন মানার কথা বলা হচ্ছে, বস্তিবাসীদের মধ্যে তার কোন বালাই নেই। ছোট্ট একটি কক্ষে অন্তত চার থেকে পাঁচজন বসবাস করছে। দু’চারজন ছাড়া কেউ কোন ধরনের মাস্ক ব্যবহার করছেন না। বস্তিবাসীরা হরদম বাইরে যাতায়াত করছে। বাইর থেকে আসার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কোন বালাই নেই। করোনাভাইরাস বস্তিতে না ছড়িয়ে পড়লেও দিন দিন অভাব ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ রাস্তায় লোকজন নেই, বস্তিতে থাকা রিক্সা চালকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। বাসা বাড়িতে কাজ করা নারীদের অধিকাংশই বস্তিতে থাকেন। তাদের ইতোমধ্যেই যারা কাজ করান, তারা কাজ না করতে নিষেধ করেছেন। তারাও বস্তিতেই থাকছেন। ফলে বস্তিতে মানুষের চাপ বাড়ছে। ঘনবসতি, নোংরা পরিবেশ, নানা শ্রেণীর পেশার মানুষের বসবাসের কারণে বস্তিগুলো করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। বস্তিতে একবার ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে তা মহামারী আকার ধারণ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক নাগাড়ে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার কল্যাণপুরের পোড়া বস্তির বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জহির (৫৫)। তিনি বলছিলেন, আমার আসল বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানা এলাকায়। পরিবার নিয়ে ২১ বছর ধরে বস্তিটিতে বসবাস করছি। আগে ছোটখাটো কাজ করতাম। পরে রিক্সা চালাতাম। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ঢাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়েছে। গত তিনদিন ধরে এক প্রকার বেকার হয়ে পড়েছি। আমাদের একদিন রিক্সা না চালালে চলে না। কারণ আমরা দিন আনি দিন খাই। সারাদেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে মনে হচ্ছে সামনে আরও কঠিন দিন আসছে। তখন পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়তে হবে। আমার মতো বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই প্রতিদিন রোজগার করে প্রতিদিন চলে। দেখেন, বস্তির সামনে সারি সারি রিক্সা পড়ে আছে। চালক বস্তির ঘরে ঘুমাচ্ছে। কারণ রাস্তায় মানুষ নেই। পেসেঞ্জার না থাকলে টাকা আসবে কোথা থেকে। ঘরে ঘরে অভাব। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এমন অভাব আরও বেড়ে যাবে। দেশে যদি আরও খারাপ অবস্থা হয়, তবে বস্তিতে দুর্ভিক্ষ হবে। তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ আমার মতো প্রায় সবাই। এখানে বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই অভাবী। তাদের একত্রে সাতদিনের খাবার কিনে রাখার সামর্থ্য নেই। সরকার যদি আমাদের না দেখে আমাদের আর কোন উপায় থাকবে না। কারণ আমাদের বাড়ি ঘর নেই। যাদের আছে, তারা বাস, ট্রেন, লঞ্চ না চলার কারণে যেতে পারছে না। বস্তিতে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এছাড়া করোনাভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে যে ধরনের নিয়ম-কানুন পালন করার কথা টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে বা বলা হচ্ছে, বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে তার কোন বালাই নেই। এ বিষয়টিকে কোন ধরনের আমলেই নিচ্ছে না বস্তিবাসীরা। হরদম বাইরে যাচ্ছে। অথচ বাইর থেকে এসে হাত মুখ ধুচ্ছে না। এছাড়া বস্তিতে শিশু কিশোরের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। এজন্য এই ভাইরাস একবার বস্তিতে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। তাই বস্তিবাসীদের কথা, আল্লাহ যদি বাঁচান বেঁচে থাকব। না হলে বাঁচার কোন উপায় নেই। এমন কথাই বলছিলেন বস্তিটির বাসিন্দা লাবণী বেগম (৩৫)। তিনি বলছিলেন, আমার স্বামী তুলনামূলক বয়স্ক। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। আমাদের চার ছেলে এক মেয়ে। এরমধ্যে দুই ছেলেসহ আমরা চারজন একটি ছোট্ট বস্তির ঘরে থাকি। আমি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতাম। ভাইরাস আসার পর আমাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ভাইরাস না যাওয়া পর্যন্ত কাজে যেতে নিষেধ করেছে। আমি যেহেতু দিন হাজিরাভিত্তিতে কাজ করি, তাই আমার রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। বড় অভাবে আছি। নতুন করে অনেক বাড়িতে কাজ খুঁজেছি, তারা ভাইরাস যাওয়ার পর কাজে নিবেন বলে জানিয়েছেন। কাজ দেননি। এমন পরিস্থিতিতে আমরা দিশেহারা। শুধু আমি না, আমার মতো অধিকাংশ গৃহকর্মীই বেকার হয়ে পড়েছে। তারা ঘরেই থাকে। কিছুই করার নেই। আমার তিন দিনের খাবার কিনে ঘরে রাখার মতো অবস্থা নেই। তাই যা হবার হবে। এ নিয়ে আর ভেবে কোন লাভ নেই। তবে বুঝতে পারছি, সামনে কঠিন দিন আসছে। একমাত্র আল্লাহ আর সরকারই ভরসা। এছাড়া আর কোন উপায় নেই। ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে যে ধরনের নিময়-কানুন পালন করতে হয়, তা তারা পালন করতে পারছেন না। সোমবার সকালে একজন এনজিও কর্মী এসে কিছু বোতল দিয়ে গেছেন। বোতলে পানির মতো ওষুধ আছে। তাই দিয়ে হাত ধুঁতে বলেছেন। তিনি বস্তির ভেতরেও যাননি। বস্তির বাইরে যাকে পেয়েছেন, তাদের দিয়েছেন। ভেতরে যারা ওই সময় ছিল, তারা পাননি। ছোট ছোট বোতল। তাতে আমাদের চারজনের পরিবার দুই দিনের মতো ব্যবহার করতে পারবে। তাও যদি দিনে দুইবার ব্যবহার করে। ভাইরাসটি সম্পর্কে বস্তিবাসীদের মধ্যে কোন ধারণা না থাকলেও, বস্তির ঘরে ঘরে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর ও মোহাম্মদ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ হাসান নুর ইসলাম (রাষ্টন) জনকণ্ঠকে জানান, সরকারী ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনার পর পরিচ্ছন্নতা অভিযান আরও জোরালো করা হয়েছে। বিশেষ করে উর্দুভাষী অবাঙালীদের বসবাসের ভেনেভা ক্যাম্পগুলোর ভেতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ভেতরে মশার ওষুধ ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়েছে। ভেতরের সব ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে। হ্যান্ডমাইক দিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের অলিতে গলিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে করণীয় সম্পর্কে ক্যাম্পবাসীদের সচেতন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাইর থেকে ঘরে আাসার পর ভাল করে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সবাইকে এই নিয়ম মানতে বার বার অনুরোধ করা হচ্ছে। শুধু ক্যাম্পের ভেতরে নয়, আশপাশের এলাকাগুলোও পরিষ্কার করা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের জনবল না থাকায় আওয়ামী ও অঙ্গসংগঠনের দলীয় লোকজনকে নিয়ে এমন পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচী চালানো হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতামূলক লিফলেট প্রচার করা হচ্ছে।