সোমবার ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৯ নভেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ আমার মা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

আমার মা আলহাজ মোসাম্মাত জোহরা খাতুন (রহ) ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট মঙ্গলবার প্রায় ৭৬ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর স্মৃতি আজও আমাদের অন্তরকে আন্দোলিত করে। আব্বার বিশাল জমিদারির তিনি ছিলেন এক দক্ষ নাবিক। মাকে মনে পড়লে মনটা আনমনা হয়ে যায়। কবি কাজী কাদের নওয়াজ মা শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন : মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু যেন ভাই/ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।...

মানবজাতির আদি মাতা হযরত হাওয়া আলায়হাস সালাম ও আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস সালামের মধ্যে সাদী সম্পূর্ণ হয়েছিল জান্নাতে। আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু হযরত আদম আলায়হিস সালামকে বলেছিলেন : হে আদম তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস কর পছন্দমতো যেখানে ইচ্ছা যাও, পানাহার কর কিন্তু এই গাছের নিকটবর্তী হয়ো না যদি যাও তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত, লানতগ্রস্ত শয়তান ইবলিস তাঁদের প্ররোচিত করে। ওই গাছের ফল ভক্ষণ করায় আল্লাহ তাদের পৃথিবীতে নামিয়ে দেন। হযরত আদম আলায়হিস সালাম শ্রীলঙ্কার একটি পর্বতচূড়ায় এসে পড়েন এবং মা হাওয়া আলায়হাস সালাম এসে পড়েন লোহিত সাগরের তীরবর্তী জেদ্দায়। বর্তমান লেখক স্ত্রী ও পুত্রসহ জেদ্দায় মা হাওয়ার মাজার শরীফ জিয়ারত করেছেন। মাজারে লেখা আছে মাকবরা উন্মুনা হাওয়া অর্থাৎ আমাদের মাতা হাওয়ার কবর। হযরত আদম ও মা হাওয়া প্রায় ৩৫০ বছর ধরে তাদের ভুলের জন্য তওবা ইস্তিগফার করেন ‘এই বলে : রব্বানা জলামনা আনফুসানা ওইল্লাম তাগফির লানা ওতারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খসিরিন। হে আমাদের রব আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি আপনি যদি ক্ষমা না করেন এবং আপনি যদি রহম না করেন তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। সাড়ে তিন শ’ বছর পর প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (স)-এর উসিলায় তাদের তওবা আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। তারা মক্কা শরীফ থেকে নয় মাইল পূর্বে অবস্থিত আরাফাত ময়দানে এসে একত্রিত হোন। সেখান থেকে মুযদালিফা নামক স্থানে এসে রাত্রিযাপন করেন এবং পরদিন সকালে মিনা হয়ে তদানীন্তন বাক্কা যার পরবর্তী নামকরণ হয়েছে মক্কা, মক্কায় এসে ঘর সংসার বাঁধেন। তাদের অনেক সন্তান সন্ততি হয়। তাদের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মধ্যে আকলিমাকে বিয়ে করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ বেধে যায়। হাবিলকে পাথর মেরে কাবিল হত্যা করে। এটায় মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম মৃত্যু ঘটে। মা হাওয়া সন্তানের মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। মা হাওয়া মানবজাতির মাতাদের ইতিহাসে এক আদর্শমাতা ছিলেন। আমার মা একজন আদর্শ মাতা ছিলেন। তিনি আবেদা মহিলা ছিলেন। তিনি তাহাজ্জদ গোজার ছিলেন। ফজরের ওয়াক্তে তিনি সুমধুর ইলহানে আমাদের ঘুম থেকে ওঠাতেন এই বলে : কুমকুম ইয়া হাবিবী কাম নামু/আদম শফিউল্লাহ লা ইয়ানামু... জাগো জাগো বন্ধু আর ঘুমিও না, আদম শফিউল্লাহ তো ঘুমান না। তিনি আমাদের মূলত শিক্ষক ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা আমরা তার কাছ থেকেই লাভ করেছি। আদব-কায়দা, চাল-চলন, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার সবকিছু তার কাছ থেকে শিখেছি। তিনি ফজরের সালাত আদায়ের পর সুমধুর ইলহানে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। আমরা তার তেলওয়াত শুনতাম। তিনি আমাদের কুরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন। সালাত আদায়ের নিয়ম-কানুন আমরা তার কাছ থেকেই শিখেছি। পাড়ার মহিলারা তার কাছে এসে কুরআনের তালিম নিতেন। আমাদের বাড়িতে কঠোর পর্দার ব্যবস্থা ছিল। পর্দার মধ্য থেকেই তিনি জমিদারির দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি মেহমানদের খাবার-দাবারের ব্যাপারে নজর রাখতেন। আমার মাকে সবাই বলত বাংলার রাবেয়া বসরী। জমিদারির তদারকি তিনি সুচারুভাবে পালন করতেন। আমাদের বাড়িতে ৪ঠা মাঘ প্রতিবছর ইছালে সওয়াব অনুষ্ঠিত হতো যা এখনও নিয়মিত হয়ে আসছে। এই ইছালে সওয়াবে বহু মহিলা অংশ নিতেন তারা আমার মাকে ঘিরে ধরে তার কাছ থেকে ওয়াজ নসিহত শুনতেন। তিনি ছিলেন সবার পীর মা। আজও ইছালে সওয়াবে বহু মহিলার সমাগম ঘটে। বয়স্ক মহিলারা আমার মাকে স্মরণ করে কান্নাকাটি করে আমার মার ওয়াজের তাছির আজও লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে আমার মা ছিলেন রত্নগর্ভা। আমার মা ইন্তেকাল করলে তাকে আমার আব্বার মাজার শরীফের নিকটে দাফন করা হয়। প্রতিবছর আমার মায়ের ওফাত বার্ষিকীতে ইছালে সওয়াব অনুষ্ঠিত হয়। তাতে প্রচুর লোকের সমাগম হয়।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর দরবার শরীফ

শীর্ষ সংবাদ: