ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

বাংলাদেশে নতুন খাতে বিনিয়োগ করুন ॥ প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১০:০৭, ৩০ মে ২০১৯

 বাংলাদেশে নতুন খাতে বিনিয়োগ  করুন ॥ প্রধানমন্ত্রী

বিডিনিউজ ॥ বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা ও বাণিজ্য সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে জাপানের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার সকালে হোটেল টোকিওর নিউ অটানিতে বাংলাদেশ-জাপান বিজনেস ফোরামের (বিজেবিএফ) বৈঠকে তিনি দুই দেশের মধ্যকার সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য সম্পর্ককে উচ্চতর পর্যায়ে নেয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে জাপানের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। জাপানের ব্যবসায়ীরা শেখ হাসিনার নেতত্বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির উচ্চ প্রশংসা করেন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে নেয়া বিভিন্ন নীতির প্রশংসা করেন। তিন বছর আগে ২০১৬ সালে জাপান সফরের সময় জাপানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এরপর থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে এবং জাপানের অনেক ব্যবসায়ী বাংলাদেশে ব্যবসায় আগ্রহী হয়েছে। ‘এসব কোম্পানি বাণিজ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নেও যুক্ত হয়েছে। এশিয়ার মধ্যে জাপান এখন বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, কাক্সিক্ষত সেই লক্ষ্যে স্থিতিশীলভাবেই আমরা এগিয়ে চলেছি আমরা। ২০১২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণে সঠিক পথেই রয়েছি আমরা।’ শেখ হাসিনা জানান, তার সরকারের নেয়া সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাপনা, বেসরকারী খাতের জন্য স্থিতিশীল নীতি সহায়তা এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বাংলাদেশের সফলতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ‘এসব কারণেই নমিনাল জিডিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় এবং বিশ্বের ৪১তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর এভাবে যদি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শিগগিরই দুই অংকের ঘরে পৌঁছবে বলে আমাদের আত্মবিশ্বাসী।’ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ নিরীক্ষা সংস্থা প্রাইসওয়াটারহাউজকুপারসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের ৩২টি বৃহত্তম ও শক্তিশালী দেশের কাতারে থাকবে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা বলেন, ব্যাপক শিল্প বিস্তারের ফলে পাঁচ বছরের মধ্যে রফতানি দ্বিগুণ হয়ে ৩৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দ্য ম্যাকেঞ্জি এ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশকে দ্রুত বর্ধনশীল সোর্সিং কান্ট্রি, পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ হাব এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি হওয়া অর্থনীতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাপান এক্সাটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জাপানি কোম্পানিগুলো যেসব অঞ্চলে ব্যবসার সম্প্রসারণ করবে তার মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর বাংলাদেশে জাপান টোবাকোর ১৪০ কোটি ডলারের বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে শেখ হাসিনা জাপানের ব্যবসায়ীদের বলেন, ‘আমরা এ ধরনের আরও বিনিয়োগ দেখতে আগ্রহী।’ বেসরকারী খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি উল্লেখ প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দেশী, বিদেশী বেসরকারী বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানী বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। মহেশখালী-মাতারবাড়িতে বিদ্যুত ও জ্বালানি হাব তৈরির লক্ষ্যে ‘ইনটিগ্রেটেড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর লজিস্টিক হাব’ এ জাপান হয়তো সহায়তা করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। দুটি সফটওয়্যার পার্কে কাজ শুরু হয়েছে এবং ২৬টি হাইটেক পার্ক তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার আমাদের রয়েছে অন্যতম উদার বিদেশী বিনিয়োগের ব্যবস্থা।’ আইন করে বিদেশী বিনিয়োগের সুরক্ষার ব্যবস্থা, কর সুবিধা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধা, শতভাগ বিদেশী ইক্যুইটির সুবিধা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের সুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ব্যবসার খরচ, মানবসম্পদ, অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার, বিশ্ব বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিচারে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগী বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। ‘তৈরি পোশাক খাতে আমাদের সফলতা বিশ্ববাসীর জানা আছে। আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। বাংলাদেশ থেকে জাপানে রফতানি পণ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক। আমরা রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করছি। এজন্য বাংলাদেশ থেকে রফতানিযোগ্য নতুন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি।’ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ শতাধিক দেশে ওষুধ রফতানির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণশিল্পও বিশ্বের নজর কেড়েছে। ইউরোপের দেশসহ বিশ্বের ১৪টি দেশে বাংলাদেশ থেকে পণ্য ও যাত্রীবাহী জাহাজ রফতানি হচ্ছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের আরেকটি প্রতিশ্রুতিশীল খাত হলো সফটওয়্যার। দেশের ৮০০ আইটি ও সফটওয়্যার কোম্পানির মধ্যে ১৫০টির বেশি কোম্পানি বিদেশী গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে। ২০ হাজারে বেশি বাংলাদেশী আইটি পেশাদার বিশ্বের নামকরা কোম্পানি যেমন- মাইক্রোসফট, ইনটেল, আইবিএমে কাজ করছে।’ এ ছাড়া বাংলাদেশের তৈরি চামড়াজাত পণ্য, কৃষিভিত্তিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং ইলেকট্রনিক গ্যাজেটও বিশ্ব বাজারের নজরে রয়েছে। পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন। অনুষ্ঠানে জাপানের নয়জন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী বক্তব্য দেন। এদের মধ্যে ছিলেন- জাপান বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল এ্যান্ড কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান টেরাও আসাদা, জাইকার এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, জেত্রোর প্রেসিডেন্ট, সুমিহিতো কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও, মিৎসুই এ্যান্ড কোং লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, সোজিৎস কর্পোরেশনের সিনিয়র ম্যানেজিং এক্সিকিউটিভ অফিসার, মিৎসুবিসি মটরসের ভাইস প্রেসিডেন্ট, হোন্ডা মটরসের ম্যানেজিং অফিসার এবং মারুহিসা কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক, এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাদ কবির। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল, প্রধানমন্ত্রী বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। জাপানের বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ জাপানী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনূদিত বই অনুষ্ঠানে বিতরণ করা হয়। সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি ॥ বাংলাদেশের সামিট গ্রুপ এবং জাপানস এনার্জি ফর নিউ এরার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বুধবার টোকিওতে হোটেল নিউ অটানিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এ সমঝোতা স্মারক সই হয়। সামিট গ্রুপের ফয়সাল করিম খান এবং নিউ এরার পক্ষে তোশিরো কোডোমা সমঝোতা স্মারকে সই করেন। জাপান-বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তার সংগঠন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মধ্যে সই হওয়া চুক্তিপত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন। শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিকে সহায়তার বিষয়ে এই চুক্তি সই হয়েছিল।