ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত

নৃত্য গীত ও যন্ত্র সঙ্গীতে রঙ্গিন রাত

প্রকাশিত: ০৪:৫৮, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

নৃত্য গীত ও যন্ত্র সঙ্গীতে রঙ্গিন রাত

মনোয়ার হোসেন ॥ সরোদের সুরে সিক্ত হওয়া। খেয়ালের মোহময়তায় ভেসে যাওয়া। মনিপুরি নাচের নান্দনিতায় উৎফুল্ল হলো হৃদয়। চেলোর বাদনে চঞ্চল হলো সুররসিকের অন্তর। সেতারের সুরের নেমে এলো প্রশান্তি। এভাবেই শুক্রবার কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনায় মুগ্ধ হলো শ্রোতা-দর্শক। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহুমুখী ধারায় রঙিন হলো রাত। জমে ওঠা ষষ্ঠতম বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসব চতুর্থ দিনে হয়ে উঠে আরও বেশি প্রাণময়। এদিনের অন্যতম অন্যতম আকর্ষণ ছিল পন্ডিত যশরাজ ও ওস্তাদ রাশিদ খানের খেয়াল পরিবেশনা। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ও স্কয়ার নিবেদিত ষষ্ঠতম উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে। ছুটির দিনের পৌষালি সন্ধ্যায় ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে তিন ঘরানার শাস্ত্রীয় নাচের সম্মিলনে শুরু হয় উৎসব। মনিপুরি. কত্থক ও ভরতনাট্যমের নৃত্যশৈলীতে জুড়ায় দর্র্শনার্থীর নয়ন। দেশের শিল্পীদের পরিবেশিত তিন আঙ্গিকের সম্মিলিত পরিবেশনার শিরোনাম ছিল ‘নৃত্য চিরন্তন : মনিপুরি, ভারতনাট্যম, কত্থক নৃত্যার্ঘ’। মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির অনবদ্য সম্মিলনে যৌথ পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেন নবীন নৃত্যশিল্পী সুইটি দাস, অমিত চৌধুরী, স্নাতা শাহরিন, সুদেষ্ণা স্বয়মপ্রভা, মেহরাজ হক ও জুয়াইরিয়াহ মৌলি। পরিবেশনাটির তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় ছিলেন নৃত্যশিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বৈষ্ণব কবি গোবিন্দ দাসের ভক্তি কবিতা থেকে সৃষ্ট সঙ্গীতে সাজানো নৃত্যের কম্পোজিশনে ছিলেন বিম্বাবতী দেবী, গুরু বিপিন সিং, কীর্তি রাম গোপাল ও শিবলী মহম্মদ । মনিপুরি নৃত্যে রাধার রূপে বর্ণনা উপস্থাপন করেন সুদেষ্ণা স্বয়মপ্রভা। সুইটি দাসের মনিপুরি নাচে উপস্থাপিত হয় সপ্ততালে কালীয় দমন। ভরতনাট্যম অংশে বৃন্দাবনী রাগ ও আদি তালে সুরিয়া কথুরাম পরিবেশন করেন অমিত চৌধুরী। এরপর আভোগী রাগে শিব স্তুতি পরিবেশন করেন জুয়েইরিয়াহ মৌলি। কত্থক নৃত্যের শুরুতে তিনতালে গুরু বন্দনা করেন মেহরাজ হক। এরপর কত্থক ঘরানায় শুদ্ধ নৃত্য পরিবেশন করেন স্নাতা শাহরিন। দ্বিতীয় পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে মনিপুরি, ভরতনাট্যম ও কত্থক সম্মিলনে নটরাজের প্রতি নৃত্যের মালিকা নিবেদন করা হয়। পরিবেশনা শেষে শিল্পীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। নৃত্যের ঝংকার শেষে রাগ ভূপালিতে সরোদের সুর ছড়িয়েছেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরিবেশনায় অংশ নেন ইলহাম ফুলঝুরি খান, ইশরা ফুলঝুরি খান, আম্ববারিশ দাস ও সাদ্দাম হুসেন। এরপর ছিল উৎসবের চতুর্থ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ওস্তাদ রশিদ খানের মনোমুগ্ধকর খেয়ালের পরিবেশনা। পরিবেশনা শুরুর আগেই শ্রোতার করতালি সঙ্গী করে মঞ্চে আসেন রামপুর-সাহাশন ঘরানার ভারতের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। কখনো চড়া আবার কখনো ধীর লয়ে কণ্ঠের খেলায় রাঙিন করে দেন শ্রোতার অন্তর। নিজের সৃষ্ট প্রিয়রঞ্জনী রাগের সঙ্গে পুরিয়া রাগে উপস্থাপন করেন পরিবেশনা। তার পরিবেশনায় কণ্ঠ সহযোগী ছিলেন নাগনাথ আদগাঁওকার, তবলায় সঙ্গত করেন প‍ন্ডিত শুভঙ্কর ব্যানার্জী, হারমোনিয়ামে ছিলেন অজয় যোগলেকর এবং সারেঙ্গিতে ছিলেন ওস্তাদ সাবির খান। রাশিদ খানের খেয়ালের সুর থামতেই সরোদের সুরে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করেছেন মাইহার ঘরানার প‍ন্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। ধ্রুপদ তন্ত্রকারী ও গায়কী ঘরানায় তার সরোদ বাদন মুগ্ধ করে দর্শকদের। তিনি রাগ সিমেন্দ্র মধ্যম রাগ পরিবেশন করেন। এরপর মঞ্চে আসেন ভারতের প্রখ্যাত বেহালা বাদক ড. মাইশুর মঞ্জুনাথ । বেহালায় শাস্ত্রীয় ভারতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খেয়ালে যে ক’জন হাতেগোনা জীবন্ত দিকপাল রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম প-িত যশরাজ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যশস্বী এই শিল্পী শুক্রবার মধ্যরাতে প্রথমবারের মতো এ উৎসব মঞ্চে খেয়াল পরিবেশন করেন। এরপর চেলো নামের বাদ্যযন্ত্রে সুরে শ্রোতার শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে সুখ ছড়িয়েছেন সাসকিয়া রাও দ্য-হাস। তিনি পাশ্চাত্য ঘরানার সঙ্গীত শিল্পী হলেও ১৯৯৩ সালে এক কনসার্টে অংশ নিতে ভারতে আসার পর সঙ্গীতের এক নতুন ভুবন আবিষ্কার করেন তিনি। একই সঙ্গে তিবর দে মাচোলার কাছে চেলো শেখার পাশাপাশি ভারতের কৌস্তভ রায় এবং প‍ন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার কাছে তালিম নেন। কারিগরি সংমিশ্রণের পাশাপাশি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীরতা ঠিক রেখে তার পরিবেশনা শেষ হয়। চতুর্থ দিনের আয়োজন নিয়ে মঞ্চে আসেন প‍ন্ডিত বুদ্ধাদিত্য মুখার্জী। তিনি ইমদাদখানি ঘরানার অন্যতম শিল্পী। বৈচিত্র্য, গতি ও সম্পূর্ণতার কারণে তার পরিবেশনার মুগ্ধতা ছিল আয়োজন শেষেও। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পরিবেশনা ॥ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সরোদে সুর ছড়িয়েছেন শিল্পী আবির হোসেন। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন যোগেশ শামসি এবং তানপুরায় অভিজিৎ দাশ। শিল্পী পরিবেশন করেন রাগ আভোগী। এর পর বাঁশি বাদন নিয়ে মঞ্চে আসেন গাজী আবদুল হাকিম। তিনি দেশ রাগ, পিলু ঠুমরী ও কয়েকটি ধুন পরিবেশন করেন। তার সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী এবং তানপুরায় সঙ্গত করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী সামীন ইয়াসার ও এস এম আশিক আলভি। বাঁশির পর ধ্রুপদ সঙ্গীতে দর্শকশ্রোতাদের মোহিত করেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সনাতন ধারার বিশিষ্ট প‍ন্ডিত উদয় ভাওয়ালকর। তিনি পরিবেশন করেন রাগ মাড়ু ও রাগ তিলং। তার সঙ্গে পাখোয়াজে সঙ্গত করেন সুখাদ মুন্ডে এবং তানপুরায় সঙ্গত করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ কুন্ডু ও টিংকু কুমার শীল। ধ্রুপদ পরিবেশনাটি শেষে গায়কী অঙ্গের বেহালা বাদন নিয়ে মঞ্চে আসেন বিদুষী কলা রামনাথ। তিনি পরিবেশন করেন রাগ নট ভৈরব ও রাগ বসন্ত। শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন যোগেশ শামসি এবং তানপুরাতে সঙ্গত করেন জ্যাতাশ্রী রায় চৌধুরী ও চন্দ্রা সাহা স্মৃতি। তৃতীয় দিনের শেষ পরিবেশনাটি ছিল প‍ন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর খেয়াল। প্রথমে তিনি পরিবেশন করেন রাগ গুনকেলি। এর পর পরিবেশন করেন যোগিয়া রাগে বাংলা গান। শেষে ভজন পরিবেশন করেন। শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন প‍ন্ডিত যোগেশ শামসি, হারমোনিয়ামে গৌরব চ্যাটার্জী এবং তানপুরায় বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল কুমার মালাকার ও অভিজিৎ দাশ। সমাপনী দিনের উৎসব ॥ আজ শনিবার উৎসবের শেষ দিন। সমাপনী আয়োজন শুরু হবে ওড়িশি নৃত্যের আশ্রয়ে। পরিবেশন করবেন বিদুষী সুজাতা মহাপাত্র। এরপর মোহনবীণায় সুর তুলেন প‍ন্ডিত বিশ্বমোহন ভট্ট। খেয়াল পরিবেশন করবেন ব্রজেশ্বর মুখার্জী। যৌথভাবে সেতার বাজাবেন প‍ন্ডিত কুশল দাস ও কল্যাণজিত দাস। এককভাবে সেতারে সুর তুলবেন প‍ন্ডিত কৈবল্যকুমার। বিগত কয়েকটি উৎসবে শ্রোতাকে আলোড়িত করা প‍ন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশির সুরে শেষ হবে ষষ্ঠতম বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসব।