ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

রোহিঙ্গা ফেরাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার ॥ সমঝোতা সই

প্রকাশিত: ০৫:৫২, ২৪ নভেম্বর ২০১৭

রোহিঙ্গা ফেরাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার ॥ সমঝোতা সই

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু হবে। এছাড়া আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করবে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার নেপিডোয় উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়েছে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয় বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের পক্ষে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর আউং সান সুচির দফতরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে এই সমঝোতায় সই করেন। সমঝোতা সইয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গণমাধ্যমে বলেন, এটা প্রথম পদক্ষেপ। দুই দেশকে এখন পরের স্টেপে যেতে হবে। তিনি বলেন, এখন কাজটা শুরু করতে হবে। সব ডিটেইল এর (সমঝোতা স্মারক) মধ্যে আছে। আমরা ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত জানাব। তবে কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে, সে বিষয়ে সময়সীমা থাকছে না বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখন যেটা হচ্ছে এই কাজটা শুরু করতে হবে। ওখানে বাড়িঘরগুলো তো জ্বালিয়ে দিয়ে সমান করে দিয়েছে। এই বাড়িঘর তো তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা বিষয়ক দফতরের পার্মান্যান্ট সেক্রেটারি মিন্ট চিং গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশে ফর্ম (রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিবন্ধন ফর্ম) পূরণ করে আমাদের ফেরত পাঠালে যত দ্রুত সম্ভব আমরা তাদের (রোহিঙ্গা) ফিরিয়ে আনতে চাই। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা সই হয়েছে। এতে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু হবে। এছাড়া আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য দ্বিপক্ষীয় ‘ফিজিক্যাল এ্যারেঞ্জমেন্ট’ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। এতে আরও বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর আউং সান সুচির সঙ্গে বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র বাণিজ্য, জ্বালানি, বিসিআইএম কানেকটিভিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর আউং সান সুচির দফতরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ের সঙ্গে মাহমুদ আলী বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তারা ১৯৯৮ সালে নাফ নদীর সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি দলিল বিনিময় করেন। এছাড়া রাখাইন রাজ্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তিনটি এ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী। মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ ও ত্রাণবিষয়ক মন্ত্রী উইন মিয়াট আইয়ের নিকট এই এ্যাম্বুলেন্স তিনটি হস্তান্তর করা হয়। এদিকে রোহিঙ্গা ফেরত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার বিষয়ে বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অফিস থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত মানুষকে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঘটবে তাদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করার পর। ১৯৯২ সালে দুই দেশের তরফে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয় তার মধ্যে এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা এবং নীতিমালা ছিল। রোহিঙ্গা সঙ্কটের আন্তর্জাতিকীকরণের বিরোধিতা করে মিয়ানমারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সমস্যা শান্তিপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করতে হবে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ সমঝোতাকে ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ বা দু’পক্ষের জন্য বিজয় বলে বর্ণনা করেছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমারকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় সকল রোহিঙ্গাদের ফেরাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে দুই দিন অনেক আলোচনা হয়। তবে মিয়ানমার বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এছাড়া ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় এবার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে রাজি নয় বলেও জানিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমার বাংলাদেশের এই প্রস্তাবেও রাজি হয়নি। মিয়ানমার পক্ষ ১৯৯২ সালের চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায়। তবে সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফেরত প্রক্রিয়া আগামী দুই মাসের মধ্যে শুরু হবে বলে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ঢাকায় ফিরে আগামীকাল শনিবার এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সমঝোতার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবেন বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৭৮ সালে দু’দেশ চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির অধীনে দুই লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত গিয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে দু’দেশের মধ্যে আরেকটি সমঝোতা হয়, যার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। নেপিডোয় আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন শেষে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বুধবার থেকে দুই দিনব্যাপী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এই বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ফেরত প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিতে সক্ষম হয়। বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়। এই সমঝোতা অনুযায়ী যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হবে। সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বুধবার থেকে নেপিডোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরু হয়। প্রথমে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক শুরু হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বৃহস্পতিবার সমঝোতা সই হয়। মিয়ানমার সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অফিসের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর আগে বুধবার বাংলাদেশ-মিয়ানমারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের নেতৃত্বে বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন মিয়ানমারে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এম সুফিউর রহমান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আর মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর (সরকারপ্রধান) আউং সান সুচির কার্যালয়ের প্রতিনিধি, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বুধবারের বৈঠক শুরুর আগেই নেপিডোয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি এই বৈঠকের ইতিবাচক ফলের ব্যাপারে আশাবাদী। সবাই এদিকে তাকিয়ে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত পর্যায়ের বৈঠকে বসেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর আউং সান সুচির সঙ্গে। এই বৈঠক শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সই হয়। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মধ্যে মঙ্গলবার নেপিডোয় এশিয়া-ইউরোপ মিটিংয়ে (আসেম) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়ানমারের নেত্রী সুচি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত। অবিলম্বে এ বিষয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি সই হবে। মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচি দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকের বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। আগস্টের শেষদিকে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত ছয় লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ এই অভিযানকে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। পশ্চিমা বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন মিয়ানমারের নেত্রী নোবেলবিজয়ী সুচিরও সমালোচনা করে আসছে। তারা বলছে, সুচির সরকার রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত মাসে আলোচনা শুরু হলেও শর্ত নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। অবশেষে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা সই হয়।