ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

একদিন পৃথিবীতে আর কোন গ্রহণই হবে না!

প্রকাশিত: ০৫:৫০, ২২ আগস্ট ২০১৭

একদিন পৃথিবীতে আর কোন গ্রহণই হবে না!

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ এমন এক দিন আসবে, যখন পৃথিবী থেকে আর দেখা যাবে না সূর্যগ্রহণ। না, পূর্ণগ্রাস, খ-গ্রাস, বলয় গ্রাস বা শংকর গ্রাস; কোনটাই নয়। চাঁদ দিয়ে সূর্যের মুখ ঢাকা-চাপা দেয়া আর সম্ভব হবে না। মুখ লুকোতে পারবে না চাঁদও। তাই সে দিন চন্দ্রগ্রহণও আর দেখা যাবে না আমাদের এই গ্রহ থেকে। কারণ চাঁদ যে আমাদের ছেড়ে উত্তরোত্তর চলে যাচ্ছে দূরে। বছরে হাতের নখ যতটা বাড়ে, ফিবছর আমাদের ছেড়ে ততটাই দূরে চলে যাচ্ছে চাঁদ। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সূর্যের কাছাকাছি। চাঁদ আছে বলেই তো যাবতীয় গ্রহণের আলোআঁধারি। তাই সূর্য আর চন্দ্রগ্রহণ, যা নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি; ৬৫ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে আর সেসব কিছুই দেখা যাবে না। খবর ওয়েবসাইটের। তার ফলে, পৃথিবী যে লাট্টুর মতো নিজের চারদিকে ঘুরছে, তার ওপর চাঁদের ‘খবরদারি’ কমে যাবে। কমে যাবে পৃথিবীর লাট্টুর গতি। আমাদের পার্থিব দিন আরও বড় হয়ে যাবে, ২৪ ঘণ্টার চেয়ে। চাঁদ অনেক, অনেক দূরে চলে যাওয়ার ফলে আজ থেকে ৬৫ কোটি বছর পর পার্থিব দিন হবে ২৭ ঘণ্টার! এখনকার চেয়ে ৩ ঘণ্টা বেশি। বছরে দিনের সংখ্যাও আর ৩৬৫ থাকবে না। ঝুপ্ করে তা কমে যাবে অনেকটাই। সময় যত গড়াবে, যত বেড়ে যাবে দিনের আয়ু, বেলা দ্রুত পড়ে আসছে বলে আর আক্ষেপ করতে হবে না। বেলা যে কাটতেই চায় না বলে চরম অস্বস্তির দিন ঘনিয়ে আসছে! আর কী হবে? জোয়ার-ভাটার জোরও যাবে কমে। রাত ঢেকে যাবে আরও ঘুটঘুটে অন্ধকারে। এগিয়ে যেতে যেতে একদিন সূর্যের ভয়ঙ্কর গ্রাসে চলে যাবে আমাদের আদরের চাঁদ। স্বপ্নের চাঁদ। যেন ৪০০ কোটি বছর ধরে তার মুখ ঢাকার ‘বেয়াদপি’র বদলা নেবে আমাদের নক্ষত্রম-লের ‘রাজা’ সূর্য চাঁদকে গিলে নিয়ে! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখেছেন, সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর। আর তার একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ গড়ে উঠেছিল আরও ৫০ কোটি বছর পর। আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে। সেই সময় চাঁদ অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল পৃথিবীর ‘হৃদয়’র। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ছিল তখন মাত্র সাড়ে ২২ হাজার কিলোমিটার বা ১৪ হাজার মাইল। একেবারে আমাদের নাগালের মধ্যেই! পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব ১২ হাজার ৪৩০ মাইল। তার চেয়ে মেরেকেটে দেড় হাজার মাইল দূরে ছিল চাঁদ, তার জন্মের সময়ে। আর আজ, সরতে সরতে সেই চাঁদ চলে গেছে পৃথিবী থেকে ৪ লাখ ২ হাজার ৩৩৬ কিলোমিটার বা আড়াই আখ মাইল দূরে! মানে, প্রায় ১৮ গুণ বেশি দূরত্বে। আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার এ্যান্ড প্ল্যানেটরি ল্যাবরেটরির এ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বিষ্ণু রেড্ডি বলছেন, বছরে আমাদের হাতের নখ যতটা বাড়ে, প্রত্যেক বছরে চাঁদ ঠিক ততটা দূরত্বেই সরে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। সেই দূরত্বটা বছরে ৩.৭৮ সেন্টিমিটার বা ১.৪৮ ইঞ্চি। তার ফলে, সৃষ্টির পর থেকেই পৃথিবী যতটা জোরে লাট্টুর মতো ঘুরছে নিজের চারদিকে (পৃথিবীর আহ্নিক গতি), তা একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। সহজে মালুম না হলেও, যার জেরে নিজের চারদিকে পাক মারতে ফিবছর ১৪ মাইক্রো সেকেন্ড করে সময় বেশি লাগছে পৃথিবীর। সে জন্যই পৃথিবীর ঘড়িকে আপডেটেড রাখতে ১৮ মাস অন্তর জুড়তে হয় ‘লিপ সেকেন্ড’। অধ্যাপক রেড্ডির বক্তব্য, ৬৫ কোটি বছর পর চাঁদ পৃথিবীর থেকে যে দূরত্বে পৌঁছে যাবে, সেখান থেকে তার পক্ষে আর সূর্যের মুখ ঢাকা সম্ভব হবে না। চাঁদ যে সূর্যের মুখ ঢাকছে, অন্তত পৃথিবী থেকে তা আর দেখা যাবে না। পুরোপুরি বা আংশিক, কোনটাই নয়। জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত চাঁদ আমাদের সঙ্গ ছেড়ে অনেকটাই দূরে চলে যাওয়ার ফলে, ইতোমধ্যেই আমাদের গ্রহে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। চাঁদ যত দূরে চলে যাবে ততই কমতে থাকবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সংখ্যা। সেই সময় খ-গ্রাস আর বলয় গ্রাস সূর্যগ্রহণ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এ্যাস্ট্রোনমি এ্যান্ড এ্যাস্ট্রোফিজিক্সের এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, মোট চার রকমের সূর্যগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীতে। পূর্ণগ্রাস, খ-গ্রাস, বলয় গ্রাস ও শংকর গ্রাস। এই চার রকমের মধ্যে এখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয় মাত্র ২৮ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ হয় খ-গ্রাস, ৩২ শতাংশ বলয় গ্রাস। আর মাত্র ৫ শতাংশ হয় শংকর গ্রাস। অথচ, ৪০০ কোটি বছর আগে যখন চাঁদ জন্মাল তখন পূর্ণগ্রাস হতো মোট সূর্যগ্রহণের ৫০ শতাংশেরও কিছু বেশি। কারণ, চাঁদ সেই সময় খুব কাছে ছিল পৃথিবীর। ফলে চাঁদের পক্ষে সূর্যের মুখ পুরোপুরি ঢেকে দেয়ার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত। তার ছায়াটা অনেক বেশি এলাকাজুড়ে পড়ত পৃথিবীর ওপর। আর ৩০ কোটি বছর পর পূর্ণগ্রাসের হার কমে হবে ১০ শতাংশ। ৫০ কোটি বছর পর তা হবে মাত্র ২ শতাংশ। আর ৬৫ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে আর কোন ধরনের গ্রহণই দেখা সম্ভব হবে না। গ্রহণের ‘সুধা পান’ থেকে বঞ্চিত হবে এই ধরিত্রী এবং এর মানুষ।