ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

চায়ের চাওয়া

প্রকাশিত: ০৩:৫০, ১৯ আগস্ট ২০১৬

চায়ের চাওয়া

পানীয় হিসেবে চায়ের কদর বিশ্বজুড়ে। চায়ের নেশায়, বাণিজ্যের আশায়, চা উৎপাদন; বাণিজ্য এবং চা-শিল্প সংশ্লিষ্ট পেশায় নিয়োজিত রয়েছে বর্তমান বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অর্থকরী ফসল এখন চা। চা উৎপাদন কৃষি হতে শিল্প, শিল্প থেকে বাণিজ্যে উত্তরণ ঘটেছে। তাই চা স্পৃহচঞ্চল চাতক হয়ে বিশ্বের তৃষ্ণার্ত মানুষগুলো ঘুরছে শুধু ঘুরছে। পানীয় হিসেবে চা জনপ্রিয় করতে ব্রতী হয়েছিলেন শতবর্ষেরও আগে স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। জাপানীদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে কবি স্বয়ং সুৎসিমো চা-চক্র নামে এক চক্রের উদ্বোধন উপলক্ষে লিখেছিলেন গান- ‘চা স্পৃহ চঞ্চল চাতকদল চল/চল চলহে/টগবগ উচ্ছল/টগবগ উচ্ছল কেতলীতল জল/কল কল হে।’ ব্রিটিশ রাজের আনুকূল্যেও চা কোম্পানির বদান্যতায় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগণ চায়ের স্বাদ উপভোগ করতে পারত এ দেশে বিনামূল্যে। সেই চা এখন যথেষ্ট মূল্য দিয়ে পান করতে হয় এ দেশে। চায়ের আবিষ্কার চীন দেশে হলেও তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অসমে প্রথম চা চাষের সূত্রপাত ঘটায় ১৯৩৫ সালে। তারও আগে ১৮৫৪ সালে অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে সিলেটের মালিনীছড়ায় প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে পাটের পরেই ছিল চায়ের স্থান। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের ত্রিশটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম অর্থকরী পণ্য হিসেবে বিস্তার লাভ করেছে চা। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে চা উৎপাদনে একাদশ স্থানে রয়েছে, দেশে প্রায় ০ দশমিক ৮১ ভাগ জিডিপি অর্জিত হয় চা শিল্প থেকে। দেশে ১৬৩টি চা বাগান রয়েছে। যা থেকে প্রতিবছর প্রায় ষাট মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় উৎপাদিত চায়ের ৯৬ শতাংশই দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক দশক আগেও এ দেশের চা রফতানি হতো। অর্জিত হতো বৈদেশিক মুদ্রা। সেই চা আমদানির খাতে এখন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। চায়ের উৎপাদন প্রবৃদ্ধির চেয়ে ভোগ চাহিদার প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। ফলে একদা ৮০ শতাংশ চা রফতানিকারক দেশটি হয়ে গেছে আমদানিকারক। বিশ শতকের সত্তর ও আশির দশকে জাতীয় অর্থনীতিতে চায়ের যে শক্তিশালী অবস্থান ছিল, এখন আর তা নেই। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পেরে চা শিল্পে হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা তৈরি হয়েছে অনেক দিন ধরে। রফতানি কমে আমদানি বাড়ায় আয় কমেছে। তদুপরি বাড়ছে চায়ের উৎপাদন খরচ। পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে চা শিল্পের সম্প্রসারণও। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ লোক চা শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। যার মধ্যে দেড় লাখ শ্রমিকই আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। শ্রম ঘাম অনুযায়ী এরা যথাযথ মূল্য পায় এমনটা নয়। তবু তারা নিরন্তর শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চায়ের বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। ক্রমান্বয়ে দেশ হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার। বিপুল পরিমাণ চা আমদানি হলেও চায়ের গুণগত মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। চায়ের নিলামেও দাম কমে গেছে। এরূপ নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়। ১৬২ বছরের ইতিহাসে এবার দেশে সর্বোচ্চ চা উৎপাদন হতে যাচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ না থাকায় এবার ফলন অধিক হয়েছে। বাগানের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ‘রেড স্পাইডার’-এর আক্রমণ ছিল না। পাতার মানও ভাল তাই। অধিক উৎপাদনের জন্য সবকিছু ছিল এবার অত্যন্ত অনুকূলে। ২০১৫ সালে চা উৎপাদন হয়েছিল ৬ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার কেজি, যা ছিল এ যাবতকালের সর্বোচ্চ চা উৎপাদন। তবে চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে এই রেকর্ড অতিক্রম হচ্ছে। এবার ৭০ মিলিয়ন বা ৭ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এবারের বৃষ্টি ও সূর্যালোক ছিল চায়ের জন্য সুষম। ফলে চায়ের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মানও বাড়বে। এমনিতে দেশে চা উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দেশীয় এ শিল্পকে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করা সঙ্গত। তা না হলে উৎপাদন হ্রাস পাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগ। চা শিল্পের হারানো অতীত ফিরিয়ে আনার জন্য এক্ষেত্রে দৃষ্টিদান জরুরী।