শনিবার ৮ মাঘ ১৪২৮, ২২ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

উল্টোরথ যাত্রা

  • স্বামী অবিচলানন্দ

রথযাত্রা ও উল্টোরথ সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দুদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। পুরাণ মতে, প্রায় দু’হাজার বছর পূর্ব থেকেই রথযাত্রা-উৎসব প্রচলিত। কথায় বলে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দুদের অর্থাৎ হিন্দুধর্মের অনুসারীদের বারো মাসে তেরো পার্বণ। এগুলোর মধ্যে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রা ও উল্টোরথ মানে পুনর্যাত্রাও সামাজিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

ভক্তদের বিশ্বাস, রথোপরি আসীন দেবমূর্তি দর্শন ও রথ টেনে নেয়ার সুযোগ তাদের জন্য দেবতার আশীর্বাদ লাভের সহায়ক। ঋতুবৈচিত্র্যের এ দেশে ষড়ঋতুর দ্বিতীয় ঋতু মানে আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়। এর এক সপ্তাহ পর উল্টোরথ উৎসব হয়ে থাকে। রথোপরি ডানে প্রভু জগন্নাথ, মাঝখানে তাঁর বোন সুভদ্রা এবং বামে বলভদ্র। অর্থাৎ কৃষ্ণ, সুভদ্রা ও বলরাম রথে আসীন থাকেন।

কঠোপনিষদে দেখা যায়, আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ ॥ (কঠ. উপ-১.৩.৩)

অর্থাৎ আত্মা হলেন রথী বা রথের মধ্যে অবস্থানকারী। রথ হলো শরীর বা দেহ যন্ত্র। বুদ্ধি হলো সারথি বা চালক। মনকে লাগামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পৃথিবীর যত রকম ভোগ করার বিষয় আছে- সে বিষয়গুলো হলো রথের গমন পথ বা সড়ক। অশ্ব বা ঘোড়াগুলো ভাল হলে অর্থাৎ সুনিয়ন্ত্রিত হলে রথটিকে সারথি সঠিকভাবে লক্ষ্যপথে পৌঁছে দিতে পারবে। আর যদি দুষ্ট হয় অর্থাৎ অসংযত হয় তাহলে রথকে তারা কোথায় নিয়ে ফেলবে কে জানে?

আসলে, মানুষের জীবন রথের প্রতীকমাত্র। ভোগের পথ ছেড়ে মুক্তির পথে যে যেতে চায় তার জীবন সুনিয়ন্ত্রিত হতে হবে। শান্ত হতে হবে, সমাহিত হতে হবে। রথের রথী অর্থাৎ অন্তর্যামী, তিনি নির্লিপ্ত। তাঁর যথার্থ স্বরূপ এই নির্লিপ্ততা। সেই স্বরূপকে এই দেহরথের মধ্যে উপলব্ধি করতে হবে। অতি সূক্ষ্ম সে অন্তরাত্মা পুরুষ মানুষের হৃদয়ে সর্বদা অবস্থান করেন। তিনিই রথী। এ রথীর দর্শন বা সাক্ষাতকার হলে মুক্তি লাভ সম্ভব হয়।

পৌরাণিক মতে, ‘রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে অর্থাৎ আমাদের দেহ ও শরীররূপ রথে আত্মারূপ বামন মানে পরমব্রহ্ম শ্রীভগবানকে দর্শন করতে পারলে দুঃখ-সুখ, রোগ-ব্যাধি, কাম-কীট পূর্ণ এ শরীর আর পুনরায় ধারণ করতে হয় না। এই সংসাররূপ পৃথিবীতে আর গমনাগমন করতে হয় না। এ পুণ্য তিথীতে স্নানদানে সহস্রগুণফললাভ হয়ে থাকে। এভাবে তাঁকে দর্শন পুণ্য কাজও বটে।

লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বকর্মা নিমকাঠের টুকরো থেকে জগন্নাথ দেবের মূর্তি তৈরি করেন। আর স্বয়ং ব্রহ্মা বিষ্ণুর আরেক মূর্তিরূপে পূজা করেন। দার ব্রহ্ম নামেও জগন্নাথদেবকে ডাকা হয়।

জগন্নাথ দেবের এ অসমাপ্ত রূপের কারণ সন্ধান করতে গিয়ে পৌরাণিক কাহিনীতে জানা যায়। সেকালে মালব দেশের অন্তর্গত অবন্তিনগরের পুণ্যবান রাজা ছিলেন ইন্দ্রদ্যুম্ন। ইনি ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত ছিলেন এবং প্রথম পুরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ভাগ্যবান রাজা স্বপ্নাদেশে জানলেন প্রভাতে পুরীর সমুদ্রতটে চক্রতীর্থে সমুদ্রের স্রোতে ভেসে আসা শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম শোভিত দারুব্রহ্ম পাওয়া যাবে। রাজা যেন ভক্তিসহকারে সে দারুব্রহ্মকে মন্দিরে নিয়ে আসেন। এতে তাঁর মনোবাসনা পূর্ণ হবে। যথাসময়ে রাজা দারুব্রহ্মের সাক্ষাত পেয়ে তা মন্দিরে নিয়ে আসেন। হঠাৎ এক বৃদ্ধ শিল্পী রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে স্বেচ্ছায় মূর্তি তৈরির দায়িত্ব নিতে চান। রাজা বুঝতেই পারলেন না এ বৃদ্ধ শিল্পীই যে ছদ্মবেশী বিশ্বকর্মা বা স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু। শিল্পীর শর্ত ছিল মূর্তি তৈরির ১০০ দিন অতিক্রান্তের পূর্বে রাজা দরজা খুলতে পারবেন না এবং শিল্পী নিজের মনে সে সময় বন্ধ ঘরে কাজ করবেন। অপরিচিত এ বৃদ্ধ শিল্পীর হাতে রাজা মূর্তি তৈরির দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন।

গভীর আগ্রহে রাজার বাইরে অপেক্ষায় ১৫ দিন পার হয়ে গেল। বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে আর কোন শব্দ আসছে না দেখে তিনি অধৈর্য হয়ে গেলেন। মন্ত্রীদের শত অনুরোধ উপেক্ষা করেও রাজা জোর করে দরজা খুলে মন্দিরে ঢুকলেন। রাজা দেখতে পেলেন, মন্দিরে তিনটি অসমাপ্ত মূর্তি রয়েছে- সে শিল্পীও অদৃশ্য। শিল্পী যে স্বয়ং দেবতা ছিলেন এটা রাজা বুঝতে পারলেন। রাজা অনুতাপে ভেঙ্গে পড়লেন নিজ কৃতকর্মের জন্য। অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আত্মবিসর্জনের সংকল্প নিলেন। আবার স্বপ্নাদেশ হলো সে রাতে- ‘আত্মহত্যা মহাপাপ, তোমায় এটা মানায় না। অসমাপ্ত বিগ্রহেই যথানিয়মে পূজা কর।’ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা অসমাপ্ত রূপে পুরীতে সে থেকে পূজিত হয়ে আসছেন।

উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রথযাত্রা ও উল্টোরথ উৎসব পালন করা হয়। ভারতবর্ষে উড়িষ্যার পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরে এ উৎসব সবচেয়ে বৃহৎ ও জাঁকজমকপূর্ণ এবং এ উৎসবে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্ত উপস্থিত থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশে রথযাত্রা-উৎসব উদ্যাপিত হয়। বাংলাদেশের ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের রথযাত্রার ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই রথ-উৎসব উদযাপিত হয়। এ উৎসব উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায়ও ব্যাপক লোক সমাগম হয়। স্নানযাত্রার দিন থেকে শুরু হয়ে পুনর্যাত্রা অর্থাৎ উল্টোরথ যাত্রার মাধ্যমে এ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

শ্রীশ্রী জগন্নাথাষ্ঠকম্ েদেখা যায়, সুরেন্দ্রৈরারাধ্য : শ্রুতিগণশিখা-গীতচরিতো জগন্নাথ : স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে- যিনি সমস্ত দেবগণের আরাধ্য-ধন এবং বেদ, পুরাণ তন্ত্রাদি সমস্ত শাস্ত্রসমূহ যাঁর পূত চরিত্র গান করছেন, সেই জগন্নাথ দেব আমার নয়ন-পথের পথিক হোন। রথোৎসব ও উল্টোরথোৎসব চলমান-মন্দিরে বিগ্রহের পূজানুষ্ঠান। সাধারণত মন্দিরে দেব বিগ্রহের পূজানুষ্ঠান হয়ে থাকে। মন্দির অভ্যন্তরে পূজায় ব্যাপক লোকের অংশগ্রহণ সম্ভবপর নয়। এ উৎসবের এত বেশি জনপ্রিয়তার কারণ হচ্ছে এ রথোৎসবে জাতি ধর্ম, বর্ণ, মত ও ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণের এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। রথে আসীন জগন্নাথ দেবের দার বিগ্রহ চলমান রথে জীবন্ত বিগ্রহের প্রতীক।

বর্ষা ঋতুর এ উল্টোরথ উৎসবের পুণ্যলগ্নে জগন্নাথদেবের কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন সমগ্র বিশ্বের আপামর জনসাধারণকে সুখে শান্তিতে ও আনন্দে রাখেন।

লেখক : সন্ন্যাসী মহারাজ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা

শীর্ষ সংবাদ:
সাকিবের হাসিতে শুরু বিপিএল         ফের বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ॥ করোনার লাগাম টানতে পাঁচ জরুরী নির্দেশনা         বাবার সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার পাবেন হিন্দু নারীরা ॥ ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট         উচ্চারণ বিভ্রাটে...         বাণিজ্যমেলার ভাগ্য নির্ধারণে জরুরী সিদ্ধান্ত কাল         আলোচনায় এলেও আন্দোলনে অনড় শিক্ষার্থীরা         ‘আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই’         করোনা ভাইরাসে আরও ১২ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১১৪৩৪         ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু’         ঢাবির হল খোলা, ক্লাস চলবে অনলাইনে         করোনারোধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৫ জরুরি নির্দেশনা         আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ স্কুল-কলেজ         ভরা মৌসুমে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজি         মাদারীপুরে সেতুর পিলারে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, ২ শিক্ষার্থী নিহত         বিপিএম-পিপিএম পাচ্ছেন পুলিশের ২৩০ সদস্য         অভিনেত্রী শিমু হত্যা : ফরহাদ আসার পরেই খুন করা হয়         দিনাজপুরে মাদক মামলায় নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য গ্রেফতার         শাবিপ্রবিতে গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল         ঘানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৫শ’ ভবন ধস, নিহত ১৭         করোনায় রেকর্ড সাড়ে ৩৫ লাখ শনাক্ত, মৃত্যু ৯ হাজার