ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ফ্লাইওভার ও দুর্ভোগ ২ ।। খলমুক্তের ঘোষণা দিয়েও পদক্ষেপ নেয়নি সিটি করপোরেশন

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ পার্কিং, দোকান

ফজলুর রহমান

প্রকাশিত: ২৩:৩২, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ পার্কিং, দোকান

রাজধানীর মৌচাক মোড়ে ফ্লাইওভারের নিচে এভাবেই নানা জিনিসপত্র রাখা হয়েছে

ভাতের হোটেল, চা, ফল ও সবজির দোকান, ডাবের দোকান, পুরনো মোবাইল-চার্জার-ব্যাটারির দোকান, ময়লার ভাগাড়, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, কাভার্ডভ্যানের সারি সারি পার্কিং। আরও রয়েছে ভাঙাড়ি মালামাল, কার্টনের স্তূপ, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, ইটের খোয়া বোঝাই বস্তা, চায়ের প্লাস্টিক কাপের স্তূপ, জমে থাকা পানিতে পলিথিনসহ অন্যান্য ময়লা-আবর্জনার স্তূপ- এগুলোর সবকিছুরই দেখা মিলবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নিচে। এতে এই পথ ধরে যাওয়া সাধারণ মানুষের যাতায়াতে এবং যানবাহন চলাচলে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, আবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি সৌন্দর্য্যও নষ্ট হচ্ছে। এসব অবৈধ পার্কিং, দোকান বসিয়ে ও বিভিন্ন মালামাল রেখে পরিবেশ নষ্ট করার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহল।

দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশন, পুলিশ এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নিচ্ছেই না উল্টো উৎকোচ নিয়ে প্রভাবশালী মহলকে আরও সুযোগ করে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে চাঁদা নিচ্ছে লাইনম্যান, থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, বিদ্যুৎ অফিসের স্টাফ। সিটি করপোরেশন ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখলমুক্তের ঘোষণা দিয়েও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরং অভিভাবকহীন সড়কটি যে যেভাবে পারছে সেভাবেই ব্যবহার করছে। 
মগবাজার সিগন্যাল থেকে রাজারবাগ পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচে যতটুকু ফাঁকা জায়গা রয়েছে, এর সবটুকু বিভিন্নভাবে বেদখলে রয়েছে। এই দূরত্বের মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের দুটি বক্স। ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে এক পাশ থেকে আরেক পাশের সড়কে যাওয়ার জন্য যে কয়টি ইউটার্ন কিংবা পথ রয়েছে, এর সব কয়টিতে বসানো হয়েছে ভাসমান দোকান, পার্কিং করে রাখা হয় ব্যক্তিগত গাড়ি, পাঠাও। এতে যানবাহন ইউটার্ন নিতে, সাধারণ মানুষের রাস্তা পারাপারে ব্যাঘাত ঘটছে। প্রতিটি ইউটার্নে এমন জটলায় প্রভাব পড়ে মূল সড়কে। 
গত মঙ্গলবার মগবাজার সিগন্যাল থেকে মৌচাক সিগন্যাল পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচ বরাবর সড়কে ৩০টি ব্যক্তিগত গাড়ি, ছয়টি কাভার্ড ভ্যান ও ৪০টি মোটরসাইকেল পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে। প্রতিদিনই এভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। মগবাজার অংশে পাঠাও, রিক্সা ও আশপাশের বাণিজ্যিক ভবনের গাড়ি পার্কিং করার ফলে সব সময় যানজটের সঙ্গে জনজটের সৃষ্টি হয় এই সিগন্যাল পয়েন্টে। মৌচাকের আগে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিপরীত পাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পার্কিং বানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেখানে প্রতিদিন ৮-১০টি প্রাইভেটকার রাখা হয়। হাসপাতাল থেকে মৌচাক সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি রয়েছে পরিত্যক্ত গাড়িও। পরিত্যক্ত গাড়ি দেখেই বুঝা যায়, মাসের পর মাস সেখানে পার্কিং করে রাখা হয়েছে। তবে গাড়িটি কার সে সম্পর্কে জানা যায়নি। 
সড়কে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয় কিনা, সড়কের ওপর নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন মালামাল রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় কিনা, এসব দেখার এবং সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিটি সড়কে অংশবিশেষ একজন করে টিআই (ট্রাফিক ইন্সপেক্টর) থাকেন। কিন্তু বাস্তবে টিআইরা তার দায়িত্বের কিছুই করেন না। ফুটপাত কিংবা ব্রিজ/ফ্লাইওভারের নিচের অংশ নয়; তাদের দায়িত্ব শুধু মূল সড়ক- এমনটি বলে দাঁড় এড়িয়ে যান টিআইরা। অথচ ফুটপাত, ফ্লাইওভারের নিচে দোকান বসানো, গাড়ি পার্কিং বাবদ দৈনিক, সাপ্তাহিক হারে লাইনম্যান দিয়ে টাকা তোলেন তারা। 
ওয়্যারলেস গেট থেকে রাজারবাগ পর্যন্ত সড়কটি ট্রাফিক মতিঝিল বিভাগের সবুজবাগ জোনের মধ্যে পড়েছে। এই সড়কের টিআই হলেন মো. শফিকুল ইসলাম। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি উল্টো জানতে চান কোথায় গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়! পরে বলেন, আমরা শুধু পিচ ঢালা রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করলে ব্যবস্থা নিতে পারি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ফ্লাইওভারের নিচে ভাসমান দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার, অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। 
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, মালিবাগ সিগন্যাল থেকে রাজারবাগের যে অংশে ফ্লাইওভার শেষ হয়েছে, সামান্য এই জায়গাটুকু রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, সিআইডি ও এসবি অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-স্টাফদের ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলের পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেখানেও নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ফ্লাইওভারের নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মালিবাগ সিগন্যাল পয়েন্টের পূর্ব পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড়। ভাগাড়ের সামনে মূল সড়কে গাড়ি পার্কিং করে বোঝাই করা হয় ময়লা। বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা নেওয়ার ছোট ছোট গাড়িও পার্কিং করে রাখা হয় সড়কে। অথচ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখলমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে অন্যদের সঙ্গে তারাও বিভিন্নভাবে দখল করে রেখেছে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা। 
বিষয়টি দৃষ্টিতে এনে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, ময়লার ভাগাড়গুলো এখান থেকে সরানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা কিংবা পরিকল্পনা নেই। এখান থেকে নিয়ে কোথায় রাখব? জায়গা তো নেই। সবাই তদবির করেন তাদের বাসার সামনে থেকে ভাগাড় সরিয়ে নিতে। কিন্তু কোথাও না কোথাও তো ময়লা রাখতে হবে। যতটুকু সম্ভব ভাগাড়গুলো পরিষ্কার করে রাখা হয়। 
ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ দোকান, জমজমাট চাঁদাবাজি ॥ মগবাজার থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচের অংশে দৈনিক শতাধিক ভাসমান দোকান বসানো হয়। ফাঁকা জায়গায় আবার পিলার ঘেঁষে মূল সড়কেও বসছে এসব দোকান। এসব দোকানের ফলে যেমন ফ্লাইওভার ও পিলারের সৌন্দর্য্য নষ্ট হচ্ছে তেমনি এর প্রভাব পড়ছে মূল সড়কে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে এসব দোকান বসালেও এর বাবদ চাঁদা দিতে হয় প্রভাবশালী মহল, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মগবাজার সিগন্যাল থেকে ওয়্যারলেস গেট পর্যন্ত বসানো দোকান থেকে লাইনম্যান ইউসুফ আর নাসের স্থানীয় নেতা, হাতিরঝিল ও রমনা থানা পুলিশ, সিদ্ধেশ^রী ও মধুবাগ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও টিআইর নামে দোকান প্রতি বিভিন্ন হারে চাঁদা তোলে। থানা পুলিশের টহল গাড়ির জন্য চা দোকান থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা, টিআই এবং ফাঁড়ির ইনচার্জের জন্য সপ্তাহে ৫০০ আর থানার ওসির জন্য ৫০০ টাকা। দোকানের ধরন অনুযায়ী চাঁদার পরিমাণ বাড়তে থাকে। ফলের দোকান, ভাতের হোটেল, ডাবের দোকানের চাঁদার হার বেশি। 
মগবাজার থেকে ওয়্যারলেস গেট পর্যন্ত (রমনা অংশে) টিআই জয়নুলকে দোকানপ্রতি সপ্তাহে ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। লাইনম্যানদের মাধ্যমে এই টাকা নেন জয়নুল। তার দায়িত্বাধীন এলাকায় অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং, দোকান থেকে চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জয়নুল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে রেগে যান এবং সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন। 
পরে জানতে চাওয়া হয় ট্রাফিক রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সোহেল রানার কাছে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ফ্লাইওভারের নিচে দোকান বসালে তা দেখার দায়িত্ব থানা পুলিশের। শুধু মূল সড়কে দোকান বসে কিনা, সেটি দেখার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা গাড়ির বিরুদ্ধে তারা সব সময় ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন বলে দাবি করেন তিনি। 
দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওয়্যারলেস গেট থেকে মৌচাক সিগন্যাল পর্যন্ত দোকান থেকে চাঁদা তোলে হাতিরঝিল থানা পুলিশের সোর্স ফারুক। ফারুক নয়াটোলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মিজানুর রহমানকে, হাতিরঝিল থানা পুলিশের টহল গাড়ির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং নিজে চাঁদার টাকা ভাগ করে নেন। একটি দোকান বসাতে চাই, এতে কি করতে হবে- পরিচয় গোপন রেখে এমনটি জানতে চাইলে ফারুক জানায়, থানা, ফাঁড়ির জন্য দৈনিক ১৫০ টাকা করে দিতে হবে। আর টিআইর জন্য সপ্তাহে ৫০০ টাকা দিতে হবে। বাকি সব কিছু তিনি নিজে দেখবেন। 
নয়াটোলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মিজানুর রহমান চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি তো ওই এলাকাই যাই না। কে টাকা নিচ্ছে তা তো জানি না। যারা টাকা তুলে তারা এরকম বলেই।
শুধু তাই নয়; ভাসমান দোকানিরা সড়কের খাম্বা থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে থাকেন। মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে স্বয়ং বিদ্যুৎ অফিসের স্টাফরা দোকানিদের সহায়তা করেন। এতে দোকান প্রতি দৈনিক ৩০ টাকা করে দিতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই সড়কের শতাধিকের বেশি দোকান থেকে দৈনিক টাকা নেন বিদ্যুৎ অফিসের স্টাফ বিদ্যুৎ আক্তারসহ তিনজন। তারা মাসে লক্ষাধিক টাকার চাঁদা নেন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে। 
ফ্লাইওভারটির দক্ষিণের অংশ পড়েছে রমনা থানাধীন। ওই অংশে দোকান বসান ১৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আতিকুর রহমান আক্তার। শুধু ফ্লাইওভারের নিচে নয়; রমনাজুড়ে ফুটপাতে শত শত দোকান বসিয়েছেন তিনি। লাইনম্যান দিয়ে দৈনিক হাজার হাজার টাকা তুলেন এই নেতা। দলীয় পদ চেয়ে ব্যানার টাঙিয়েছেন রমনা এলাকায়। ওখানে দোকান বসানোর নাম নিলেই উঠে আসে শেখ আতিকুর রহমান আক্তারের নাম। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত এক এসপির সঙ্গে সম্পর্ককে পুঁজি করে এ কাজ করছেন তিনি। কাকরাইল অফিসে গিয়ে তাকে না পেয়ে কথা হয় মানিক নামের তার এক অনুসারীর সঙ্গে। মানিক বলেন, ‘আপনি আইসেন, দোকান বসিয়ে দিবো, যেখানে বসাতে চান সমস্যা হবে না। আক্তার ভাই সব ঠিক করে দিবে।’ 
আক্তারকে সশরীরে না পেয়ে ফোনে তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রশ্ন শুনেই তিনি অন্য আক্তার বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তীতে একাধিকবার কল করলেও আর রিসিভ করেননি। 
ওয়্যারলেস গেট থেকে মৌচাক সিগন্যাল পর্যন্ত জায়গার চিত্র আরও করুণ। এই পথে ভাসমান দোকানের পাশাপাশি বসানো হয়েছে স্থায়ী অবৈধ দোকান। বোঝাই করে রাখা হয়েছে কার্টন, ইটের খোয়া ভর্তি ব্যাগ, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। মৌচাক সিগন্যাল পয়েন্টে গাড়ি পার্কিং করে রাখার ফলে প্রতিনিয়তই যানজটের সৃষ্টি হয়। অথচ পাশেই রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ বক্স। 
বিষয়টি নজরে এনে জানতে চাইলে সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি, ট্রাফিক) নাহিদ ফেরদৌস জনকণ্ঠকে বলেন, ওই সড়কে কিছু গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। আমরা বিভিন্ন সময় ব্যবস্থাও নিয়ে থাকি। কিন্তু সরে আসলে ফের গাড়ি পার্কিং করা হয়। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। আর কোনো টিআই এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্তপূর্বক তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×