ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

আজও অরক্ষিত

নেত্রকোনা

সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ০১:৩০, ৩১ মার্চ ২০২৩

নেত্রকোনা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে নারকীয় এবং বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আর হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য বেছে নিয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থানকে। হাজারও শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ স্থানগুলোই পরে বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা নেত্রকোনাতেও ছড়িয়ে আছে এমন কিছু বধ্যভূমি। কিন্তু বলাবাহুল্য, ন’মাসব্যাপী মুক্তিসংগ্রাম আর অগণিত শহীদের আত্মোৎসর্গের নীরব সাক্ষী হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা এসব বধ্যভূমির বেশিরভাগ আজও অরক্ষিত এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। 
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়ুব জানান, নেত্রকোনা জেলায় মোট বধ্যভূমির সংখ্যা ১৬টি (যেখানে একাধিকবার হত্যাকা- চালানো হয়)। সেগুলো হচ্ছেÑ সদর উপজেলার ত্রিমোহিনী ব্রিজ, মোক্তারপাড়া ব্রিজ, সাতপাইয়ের মগড়া নদীর পাড়, পাটপট্টির মগড়া নদীর পাড়, চল্লিশা রেলব্রিজ, ঠাকুরকোনা রেলব্রিজ, পূর্বধলা উপজেলার পুকুরিয়াকান্দা, পূর্বধলা বাজারের রেলব্রিজ, জারিয়ার কংস নদীর পাড়, দুর্গাপুরের বিরিশিরির সোমেশ^রী নদীর পাড়, কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর বাজারের দই মহাল, কলমাকান্দা থানাঘাট, আটপাড়া উপজেলার মগড়া নদীর পাড়, কেন্দুয়া উপজেলার রাজি নদীর পাড়, মদন উপজেলার থানাঘাট ও মোহনগঞ্জের সাপমারা খাল। এসব বধ্যভূমির বাইরেও গণহত্যাকা- হয়েছে ৩শ’ ২১টি এবং গণকবর দেওয়া হয়েছে ৬টি।
গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়ুব ছাড়াও স্থানীয় কয়েক বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একাধিক শহীদ পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ’৭১-এ নেত্রকোনায় পাকবাহিনী আসার পর প্রথম বধ্যভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিল নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের মাঝামাঝিতে অবস্থিত ত্রিমোহিনী ব্রিজটিকে। ২৯ এপ্রিল সেখানে ঠাকুরাকোনা হাসপাতালের চিকিৎসক  মিহির সেন ও তার শ্যালক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সিদ্ধার্ত সেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এ দু’জনকে হত্যার মধ্য দিয়েই নেত্রকোনায় পাকবাহিনীর গণহত্যা শুরু হয়।

পরবর্তীতে ত্রিমোহিনী বধ্যভূমিতে সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় ২২ সেপ্টেম্বর। ওইদিন রাতে ২৭ জনকে একযোগে ব্রাশফায়ার করা হয়। কিন্তু ২৬জনের প্রাণহানি ঘটলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান প্রফুল্ল সরকার নামের একজন। ত্রিমোহিনী হত্যাকা-ের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রফুল্ল সরকার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বনের দায়ে আমাদের একেকজনকে একেক সময় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

২২ সেপ্টেম্বর ছিল মামলার তারিখ। ওইদিন হাজিরা দিতে গেলে বিচারক আমাদের বেকসুর খালাস দেন। কিন্তু খালাস সত্ত্বেও কাউকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। সন্ধ্যার পর একটি পিকআপে তুলে ত্রিমোহিনী ব্রিজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাত একটু গভীর হলে চালানো হয় গুলি।
প্রফুল্ল সরকার আরও বলেন, ওই সময় টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। আর খুব অন্ধকার ছিল। কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। 
ত্রিমোহিনী বধ্যভূমিতে ওইদিন (২২ সেপ্টেম্বর) যারা শহীদ হয়েছিলেন- তাদের ২৬জনের নাম এখনো মুখস্থ প্রফুল্ল সরকারের। তারা হলেন : জেলা সদরের নিখিলনাথ সড়কের নিশিকান্ত সরকার, সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা রায়, বড়বাজারের কামিনী চক্রবর্ত্তী, কলাইয়ার সুরেন্দ্র চন্দ্র দে, মালনী রোডের কমল চন্দ্র সাহা ও তার ছেলে সুনীল চন্দ্র সাহা, সাখুয়ার সতীশ চন্দ্র সরকার, ব্রজেন্দ্র সরকার, মালনীর মতিলাল সাহা (১), বড়ওয়ারীর মতিলাল সাহা (২), বড়বাজারের সন্তোষ চন্দ্র পাল (১), বিনন্দ চন্দ্র দে সাধু, আটপাড়ার পাহাড়পুরের দুর্গানাথ চক্রবর্তী, বারহাট্টার পীযূষ কান্তি সাহা, দীপক কুমার সাহা, দিলীপ কুমার পাল, বিনয়ভূষণ সরকার, ঈশ^রগঞ্জের রমেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী রনু, কলমাকান্দার গুজাকুইল্যার মনীন্দ্র চন্দ্র সাহা, আশুজিয়ার স্বদেশ দত্ত, সন্তোষ চন্দ্র পাল (২), অজিত কুমার সাহা, সতীশ চন্দ্র সাহা, যোগেন্দ্র সরকার ও দীনেশ চন্দ্র সরকার এবং অজ্ঞাত একজন।

বিরিশিরি বধ্যভূমির শহীদরা হলেন: নেত্রকোনা কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আরজ আলী, এমকেসিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ আউয়াল, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য গৌরাঙ্গ সাহা, শ্রীরামখিলার আকবর হোসেন তালুকদার, আবদুল জব্বার, শাহজাহান, ধীরেন্দ্রনাথ পত্রনবীশ, বড়ুইউন্দের প্রফুল্ল চন্দ্র প-িত, সুধীর ঘোষ, নাগেরগাতির ব্রজেন্দ্র কর্মকার, বাকলজোড়ার ফরিদ উদ্দিন, হাফিজ উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন, আলমপুরের আকবর আলী তালুকদার, গুজিরকোনার মনিন্দ্র চন্দ্র দে, রামনগরের যোগেন্দ্র চন্দ্র পাল, হরিদাস লৌহসহ অন্তত ১শ’ জন।

নেত্রকোনা শহরের প্রাণকেন্দ্র মোক্তারপাড়ার মগড়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুটিকেও বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। মোক্তারপাড়া ব্রিজে যাদের হত্যা করা হয়Ñ তাদের মধ্যে আইনজীবী অখিল চন্দ্র সেন, হেম চন্দ্র সেন, কংগ্রেস নেতা সুধীর দত্ত মজুমদার ও তার ভাই আইনজীবী ধীরেন্দ্র দত্ত মজুমদার, নরেন্দ্রনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জমান মুক্তা, বিরামপুরের আব্দুল মালেক শান্ত, সাতপাইয়ের ফনিন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য, নৃপেন্দ্রকিশোর ভট্টাচার্য, পুকুরিয়ার প্রদীপ চন্দ্র দাস, কামারগাতির সিদ্দিকুর রহমান, ইসলাম উদ্দিন ও সদরের শাহেদ আলীর নাম উল্লেখযোগ্য।

পূর্বধলার পুকুরিয়াকান্দা বধ্যভূমিতে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে হাফানিয়ার কছিম উদ্দিন, মৌদামের চান্দু হাজী, ছোছাউড়ার যতীন্দ্র চন্দ্র সরকার, সুবোধ চন্দ্র সরকার ও ইলাশপুরের ফজর আলী অন্যতম। 
বেশিরভাগ বধ্যভূমি অরক্ষিত : জেলা সদরের মোক্তারপাড়া বধ্যভূমিটিতে মিতালী সংঘ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে, সাতপাই বধ্যভূমিতে পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে, পাটপট্টি বধ্যভূমিতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে, সদর উপজেলার ত্রিমোহিনী বধ্যভূমিতে ‘অমাস’ নামে একটি এনজিওর উদ্যোগে এবং বিরিশিরির বধ্যভূমিতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি করে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। 
ফলে এ বধ্যভূমিগুলো কোনোরকমে টিকে আছে। এছাড়া সম্প্রতি ত্রিমোহিনী বধ্যভূমিতে সরকারিভাবে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কিন্তু জারিয়া, পুকুরিয়াকান্দা, ঠাকুরাকোনা ব্রিজ, চল্লিশা ব্রিজ, আটপাড়ার মগড়া পাড়, নাজিরপুর দইমহাল, কলমাকান্দা থানাঘাট ও মদন থানাঘাটের বধ্যভূমিগুলো আজও সীমাহীন অবহেলিত এবং অরক্ষিত।
সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা

×