ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ঝিনাইদহ-১

আওয়ামী লীগ চায় জয় বিএনপি পুনরুদ্ধার

এম রায়হান, ঝিনাইদহ

প্রকাশিত: ০০:০০, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

আওয়ামী লীগ চায় জয় বিএনপি পুনরুদ্ধার

নির্বাচনের এক বছরের কাছাকাছি সময় বাকি থাকলেও সারাদেশেই বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া

নির্বাচনের এক বছরের কাছাকাছি সময় বাকি থাকলেও সারাদেশেই বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহ জেলার প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা। 
শৈলকুপা উপজেলা, ১টি পৌরসভা, ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে ঝিনাইদহ-১ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৮ জন।
এ আসনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে চলছে জোর হিসাব নিকাশ। নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পৃথক পৃথকভাবে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠ পর্যায়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। তবে আগামী নির্বাচনেও পঞ্চমবারের মতো নৌকার বিজয়কে নিশ্চিত করতে ভোটারদের কাছে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপির টার্গেট আসনটি পুনরুদ্ধার।
দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-১ আসনে অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান (আওয়ামী লীগ), ’৯১ সালে আব্দুল ওহাব (বিএনপি), ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনে আব্দুল ওহাব (বিএনপি), ’৯৬ সালের ২ জুনের নির্বাচনে আব্দুল ওহাব (বিএনপি)। এরপর ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত গত চারটি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই। তিনি বর্তমানেও এ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই। তিনি গত ১৩ নবেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আবারও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দলের উচ্চ পর্যায়ে তার যোগাযোগ ভাল। তিনি পঞ্চমবারের মতো আসনটি থেকে নির্বাচিত হতে মনোনয়ন চাইবেন তা নিশ্চিত। ২০০১ সাল থেকে তিনি এ আসনে ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। কিছুদিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। দলের তৃণ্যমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। 
সংসদ সদস্য আবদুল হাই ছাড়াও বিশ্বাস বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি নজরুল ইসলাম দুলাল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নের চেষ্টা করছেন। তিনি কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন। বিভিন্ন স্থানে লোকজনের কাছে তিনি প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা জানান দিচ্ছেন। প্রায়ই তিনি ঢাকা থেকে শৈলকুপায় আসেন, বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেন। ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার  ব্যাপারে তিনি আশাবাদী বলে জানান দিচ্ছেন। 
এ ব্যাপারে শিল্পপতি নজরুল ইসলাম দুলাল জানান, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনায়ন পেলে আমি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। আমি সব সময় শৈলকুপার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে আসছি। সুখে দুঃখে তাদের পাশে থাকি। 
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাবেক সদস্য পারভীন জামান কল্পনাও মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে। তার বাবা আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবার ইমেজ সামনে রেখে তিনিও মাঠে নেমে ব্যাপকভাবে গণসংযোগ করছেন। 
এ ব্যাপারে পারভীন জামান কল্পনা বলেন, নেত্রী যদি আমাকে ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে মনোনয়ন দেন তাহলে আমি নির্বাচন করব। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতিও নিয়েছি। তিনি বলেন, আমার নিজের জন্য কিছুই চাওয়া পাওয়ার নেই। বাকি জীবনটা জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করে যাব। 
ঢাকা মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী আজাদুল কবির আজাদও এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি ঢাকা থেকে প্রায়ই শৈলকুপায় আসছেন। ভোটারদের কাছে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। দল মনোনয়ন দিলে তিনি এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। 
জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নায়েব আলি জোয়ার্দ্দার মনোনয়ন চাইবেন। তিনি শৈলকুপা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে আবদুল হাইয়ের কাছে পরাজিত হন। তিনিও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। 
মনোনয়নপ্রত্যাশী অ্যাডভোকেট কাজী আজাদুল কবির আজাদ বলেন, দল মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করব। আমি নির্বাচিত হলে সরকারের সকল প্রকার কর্মকা- বাস্তবায়িত করব। এলাকার উন্নয়নে কাজ করব। জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করব। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করব। 
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীও একাধিক ॥ বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি আব্দুল ওহাব এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলের তৃণমূলে তার একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ আসন থেকে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার সহযোগিতায় এলাকায় অনেক উন্নয়ন কর্মকা- হয়েছে। যেগুলো তুলে ধরে তিনি মানুষকে কাছে টানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি মনোনয়নের জন্য দলের কাছে জোর লবিং করে যাচ্ছেন।
আব্দুল ওহাব বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। যদি ফেয়ার নির্বাচন হয়, দল যদি নির্বাচনে যায় এবং আমাকে যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি নির্বাচন করব। নির্বাচনের জন্য আমি গণসংযোগ করে যাচ্ছি। তিনি দাবি করেন, শৈলকুপায় যত উন্নয়ন হয়েছে তার সবই আমি করেছি। এলাকার রাস্তা, ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছি। আমি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হলে এলাকার বাকি কাজগুলো করব। এলাকার নাগিরাট ব্রিজ, বগুড়া ব্রিজ, বড়দা ঘাটে ব্রিজ নির্মাণ করব। এলাকার মানুষের উন্নয়নে সব সময় কাজ করে যাব।
বিএনপিতে হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ মনোনয়ন চাইবেন। তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস, চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মানবাধিকার বিষয়ক উপদেষ্টা ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক। এ ছাড়াও তিনি বিএনপি সমর্থক জি-৯ গ্রুপের সভাপতি। তিনি শৈলকুপা এসে বিএনপির সকল কর্মকা-ে অংশ নিচ্ছেন। গণসংযোগও করে যাচ্ছেন। বিএনপির তৃণমূলে তার কর্মী সমর্থক রয়েছে ভাল। 
অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, দল যদি নির্বাচনে যায় এবং আমাকে এ আসন থেকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি নির্বাচন করব। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি আমার আছে। আমি তৃণমূলের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সবসময়ই যোগাযোগ রেখে চলেছি। নির্বাচনে এ আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার ব্যপারে আমি আশাবাদী। আমি বিজয়ী হলে শৈলকুপাকে দুর্নীতিমুক্ত করব। কোনো দুর্নীতি থাকবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করব। সমাজের সকল স্তরের মানুষ যাতে সুবিচার পায় সে ব্যবস্থা করব। শৈলকুপার সামাজিক বিভেদ দূর করব। সবাইকে নিয়ে সামাজিক বন্ধন তৈরি করব। এছাড়া শৈলকুপার উন্নয়নে সব সময় নিজেকে নিয়োজিত রাখব। 
এ আসনে বিএনপি’র খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কু-ু মনোনয়ন চাইবেন। তারও একটি গ্রুপ আছে। তিনিও দলের নেতা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এ আসনে বিএনপির আরও একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট শিল্পপতি ওসমান আলি। তিনিও দলের মনোনয়নের জন্য লবিং করে যাচ্ছেন। এ আসনে বিএনপিতে তীব্র গ্রুপিং রয়েছে। 
এ আসনে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী রয়েছেন। প্রার্থী হতে পারেন মনিকা আলম (এরশাদ)। তিনি গতবারও নির্বাচনে অংগ্রহণ করেছিলেন। এ ব্যাপারে মনিকা আলম বলেন, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি নির্বাচন করব। আমি বিজয়ী হলে এখানকার সকল প্রকার অনিয়ম নিয়মের মধ্যে আনব। পৌরসভায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। কোনো উন্নয়ন নেই। আমি সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শৈলকুপার উন্নয়নে কাজ করব। আমি একজন নারী হিসাবে নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করব। 
এ আসনে জামায়াতের অবস্থান খুবই দুর্বল তাই তাদের কোনো প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। এসব দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

×