বগুড়া
রিয়া নামের মেয়েটি চোখে কথা বলে। ইশারায় শোনে। বয়স ১৬ বছর। জন্মের পর মা বাবা মনে করেছিলেন ফুটফুটে মেয়েটি বড় হয়ে সুনাম বয়ে আনবে। রিয়া মা বাবার আশা পূরণ করছে ঠিকই। তবে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে। যুদ্ধ তার শিশুবেলা থেকেই। প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি। জেএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখে জেপিএ-৫ পেয়েছে। তবু যুদ্ধ। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির নিয়মাবলীতে এবার প্রতিবন্ধীদের কোন কোটা নেই। রিয়াকেও এগিয়ে যেতে হবে স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এতে মোটেও বিচলিত নয় সে। প্রতিবন্ধী রিয়া করুণা নিতে চায় না। তার ইচ্ছে সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হবে। তবে সরকারী সিদ্ধান্তে পছন্দের তালিকার কোন কলেজে সুযোগ পাবে, তা সে জানে না। এ বিষয়ে সরকারি আজিজুল হক কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানায়, ভর্তি নির্দেশনায় এবার প্রতিবন্ধীদের কোন কোটা রাখা হয়নি। গত বছর পর্যন্ত এই কোটা ছিল। এই অবস্থায় এবার যে প্রতিবন্ধী মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়েছে তার সাধারণের মতো যে কলেজে পড়ার সুযোগ দেয়া হবে সেই কলেজেই পড়তে হবে। রিয়া জানাল, যেভাবেই হোক সে উচ্চশিক্ষা নেবে। আত্মপ্রত্যয়ী রিয়ার ইচ্ছা উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ভাল চাকরি করবে।
অনেকেই বলাবলি করে প্রতিবন্ধীরা চারুকলায় ভাল করে। রিয়া তা মানতে রাজি নয়। সে চারুকলায় পড়বে না। বিভেদের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠবে, যতটা পারা যায়। রিয়া কম্পিউটারে পারদর্শী। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখে। কি কাজ করতে হবে তা লিখে দিলে কম্পিউটারের কমান্ডে গিয়ে তার সবই করে। রিয়ার বাড়ি বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি এলাকায়। বাবা জাহেদুর রহমান রেজা তালুকদার মার্কেটে স্টেশনারী দ্রব্যাদির ব্যবসা করেন। মা মাসুমা রহমান ফেন্সি গৃহিণী। দুই বোন এক ভাইয়ের ছোট রিয়ার ইচ্ছাশক্তি এতটাই বেশি যে কোন কাজেই অসফল হয় না। স্কুলের শিক্ষকরা তার মেধা বুঝে অবাক হয়েছেন। শিক্ষক ও সহপাঠীরা ইশারায় পড়া বুঝতে সহযোগিতা করেছে।
সুমাইয়া রহমান রিয়ার স্বাভাবিক জন্ম হয়েছিল। দু’বছর পর্যন্ত বাবা মা কেউ বুঝতে পারেনি তাদের মেয়ে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হতে চলেছে। দিনে দিনে বয়স বাড়ার পরও যখন মুখে কথা ফোটে না এবং ইশারায় বুঝতে চায় কি বলা হচ্ছে, তখন বাবা মা বুঝে নেয় কি হলো। শিশু বেলাতেই বাবা মা বুঝতে পারে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হলেও তাদের মেয়ে প্রচ- মেধাবী।
প্রথমে বগুড়া মুক ও বধির বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে কিছুই শিখতে পারেনি। মাস ছয়েক পর ফুলবাড়ির একটি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয়। সেই স্কুলের শিক্ষক প্রেমা রিয়ার মেধায় বিস্মিত হয়ে বাড়িতে গিয়ে পড়াতে থাকেন। রিয়াকে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি করা হয়। এরপর রিয়ার লেখাপড়ার গতি বাড়তে থাকে। শিক্ষকরা যখন পড়াতেন রিয়া শুধু চেয়ে থেকে লিপিং দেখে বোঝার চেষ্টা করত। রিয়া সহপাঠীদের সঙ্গে চোখে ও ইশারায় কথা বলে ক্লাসের পড়া বুঝে নিত। পরে পয়েন্ট লিখে দেয়ার অনুরোধ জানালে সহপাঠীরা তাকে লিখে দিয়ে সহযোগিতা করত। বাড়িতে গিয়ে সেই পয়েন্ট দেখে ও বই পড়ে সে পড়া আত্মস্থ করত। ক্লাসরুমের পড়া ও সহপাঠীদের সঙ্গে ইশারায় কথা বলে পড়া বুঝে নিয়ে রিয়া যেভাবে পরীক্ষা দিত, তাতে শিক্ষকরাই অবাক হয়ে যেতেন। রিয়া যখন কোন কিছু করতে চায় তা মাকে ইশারায় বলে। কখনও কাগজে লিখে। রিয়ার স্বপ্ন সে অনেক বড় হয়ে প্রমাণ করবে প্রতিবন্ধীরা কখনই বোঝা নয়। যত বাধাই আসুক রিয়ারা তা অতিক্রম করার ক্ষমতা রাখে।
-সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে



